27/07/2025
জীবন কলমের কালি দিয়ে লেখা এক আত্মত্যাগের ইতিহাসের নাম __ সাইয়েদ কুতুব
✍️ তথ্য সংগ্রহ
আশফাকুর রহমান
আসিউত, মিশর। ১৯০৬ সালের এক বসন্তের দিনে, একটি গ্রামে জন্ম নিল একটি শিশু। বাবা-মা নাম রাখলেন—সাইয়েদ কুতুব। সে জন্মেছিল নীরব নিঃসঙ্গ গ্রামে, কিন্তু তার চিন্তা পৌঁছে গিয়েছিল বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে। ইতিহাস তাকে মনে রাখে—একজন শহীদ চিন্তাবিদ হিসেবে, যার কলমে ছিল বিদ্রোহ, হৃদয়ে ছিল ঈমান, আর জীবন ছিল কুরআনের ব্যাখ্যা।
🧒 শৈশব ও প্রাথমিক শিক্ষা: একটি কুরআনপ্রেমী পরিবার
সাইয়েদ কুতুবের পরিবার ছিল ধর্মপ্রাণ এবং শিক্ষানুরাগী। বাবা ছিলেন কৃষক ও সমাজসেবক, মা ছিলেন শিক্ষিত ও প্রেরণাদাত্রী। মাত্র ১০ বছর বয়সে কুতুব কুরআন হিফজ করেন। তার কণ্ঠে ছিল কুরআনের গুঞ্জন, আর মনে ছিল শব্দের প্রতি অসম্ভব ভালোবাসা।
শৈশবেই গ্রামীণ সমাজে অন্যায়, শোষণ ও দারিদ্র্য দেখে তার ভেতরে এক নতুন চিন্তার বীজ রোপিত হয়—এই পৃথিবী কি এমনই থাকবে? নাকি বদলাতে হবে?
📖 তারুণ্যে আত্মপ্রকাশ: সাহিত্য, জাতীয়তাবাদ ও নতুন পথের সন্ধান
তিনি কায়রোর ‘Dar al-ʿUlum’ কলেজে পড়ালেখা করেন এবং শিক্ষক হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন। এ সময় তিনি সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। কবিতা লিখতেন, প্রবন্ধ লিখতেন, আর লিখতেন সমাজের অসঙ্গতির বিরুদ্ধে।
প্রথম জীবনে তিনি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। মিশরের স্বাধীনতা, সংস্কৃতি, শিক্ষা—এসব নিয়েই লিখতেন। তিনি ছিলেন তৎকালীন মিশরের প্রধান লেখক ও সমালোচকদের একজন।
তবে তার চিন্তার মৌলিক পরিবর্তন ঘটে আমেরিকা সফরে।
🌎 আমেরিকা সফর: বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া
১৯৪৮ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বৃত্তি নিয়ে কুতুব যান আমেরিকায়। প্রথমে বিস্মিত হন প্রযুক্তি ও আধুনিকতায়, পরে ধাক্কা খান এর পেছনের আত্মিক শূন্যতায়।
নিউ ইয়র্ক, কলোরাডো, ওয়াশিংটন ডিসিতে দেখেন—
• নারী-পুরুষের অনিয়ন্ত্রিত সম্পর্ক
• চার্চে অশ্লীলতা
• বস্তুবাদে আচ্ছন্ন মানুষ
• ইসলাম সম্পর্কে কটুক্তি
এই অভিজ্ঞতা তার ভেতরে আঘাত হানে। তিনি বুঝলেন—পশ্চিমা সভ্যতা প্রযুক্তিতে উন্নত হলেও, মূল্যবোধে শূন্য। তিনি ফিরলেন মিশরে, কিন্তু বদলে গিয়েছিলেন। ফিরলেন এক নতুন কুতুব হয়ে।
🕌 মুসলিম ব্রাদারহুডে যোগদান: কলম থেকে আন্দোলনে উত্তরণ
মিশরে ফিরে কুতুব যুক্ত হন আল ইখওয়ানুল মুসলিমুন বা মুসলিম ব্রাদারহুড-এর সঙ্গে। তার চিন্তা, কলম ও বক্তৃতা সংগঠনটিকে আরও আদর্শিক ও গভীর দার্শনিক ভিত্তি দেয়।
তিনি মনে করতেন—ইসলামের মূল শিক্ষা শুধু মসজিদে নয়, সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতি-তেও বাস্তবায়ন জরুরি। তার দৃষ্টিতে, একটি রাষ্ট্র তখনই ইসলামী হবে, যখন শাসন, আইন, অর্থনীতি—সবকিছু কুরআনের আলোকে পরিচালিত হবে।
📚 সাহিত্য ও দর্শন: জাহিলি সমাজে কুরআনের আলো
সাইয়েদ কুতুবের সবচেয়ে বিখ্যাত রচনা—“ফি জিলালিল কুরআন” (কুরআনের ছায়ায়)। এটি একটি তাফসীর, কিন্তু সাধারণ তাফসীর নয়। এটি ছিল তার হৃদয় থেকে লেখা, কুরআনের আয়াতের সঙ্গে মানুষের বাস্তব জীবনের সংযোগ স্থাপনকারী ব্যাখ্যা।
তিনি লিখেছিলেন—
“কুরআন কেবল পঠনের জন্য নয়—এটি একটি জীবন ব্যবস্থা। এটি বিপ্লবের নির্দেশনা। এটি সমাজের গাইডলাইন।”
তার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ:
• “ফি জিলালিল কুরআন” – কুরআনের ভাবনাভিত্তিক বিশ্লেষণ
• “মা আল ইসলাম” – ইসলামের সামাজিক ব্যাখ্যা
• “আল-আদালাহ আল-ইজতিমাইয়্যাহ ফিল ইসলাম” – ইসলামে সামাজিক ন্যায়বিচার
• “মা আলা তরীক” – ইসলামী আন্দোলনের পথ
• “আল-ইসলাম ওয়াল হাদারাহ” – ইসলাম ও সভ্যতা নিয়ে বিশ্লেষণ
🔥 সংগ্রাম ও কারাবরণ: সত্য বলার শাস্তি
জামাল আবদুল নাসেরের শাসনামলে কুতুবকে প্রথম গ্রেফতার করা হয় ১৯৫৪ সালে। তাকে বন্দি করে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। তবু তিনি লিখতে থাকেন, চিন্তা ছড়াতে থাকেন। কারাগারের ভেতর থেকেই লেখেন তাঁর অনেক বিখ্যাত বই।
তাকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—
“তুমি কীভাবে এত দৃঢ়?”
তিনি বলেছিলেন,
“আমার হাতে যদি কেবল একটি খেজুর থাকে, তবুও আমি তা রোপণ করব।”
⚖️ মৃত্যুদণ্ড ও শহীদ হওয়া
১৯৬৬ সালে সাইয়েদ কুতুবের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধিতার অভিযোগ আনা হয়। যদিও তার অপরাধ ছিল—একটি বই লেখা (মা আলা তরীক) এবং কিছু আদর্শ প্রচার।
তিনি জানতেন, তিনি বাঁচবেন না। তবু তার মুখে ছিল প্রশান্তি। তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল মৃত্যুর আগে শেষ কথা কী?
তিনি বলেছিলেন:
“আমার আঙ্গুল যেটি আল্লাহর একত্বের সাক্ষ্য দেয়, সেই আঙ্গুল দিয়ে অন্যায় শাসকের শাসনকে স্বীকৃতি দিতে পারি না।”
১৯৬৬ সালের ২৯ আগস্ট, তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
🌱 উত্তরাধিকার: একটি জীবন্ত দর্শনের নাম সাইয়েদ কুতুব
কুতুবের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু তার চিন্তা এখনো জীবিত। বিশ্বজুড়ে দাওয়াহ আন্দোলন, ইসলামী রাজনীতি, যুবকদের আত্মশুদ্ধি কার্যক্রম—সবখানে কুতুবের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
তার চিন্তার মূল কথাগুলি হলো:
• ইসলামের পূর্ণাঙ্গতা
• শাসনব্যবস্থার কুরআনভিত্তিক রূপ
• পশ্চিমা বস্তুবাদ ও জাহিলি সভ্যতার সমালোচনা
• আত্মশুদ্ধি, তাওহীদ ও তাকওয়ার উপর জোর
উপসংহার: শহীদের রক্তে লেখা দিকনির্দেশনা
সাইয়েদ কুতুব ছিলেন না কোনো অস্ত্রধারী বিদ্রোহী। তিনি ছিলেন একজন চিন্তাবিদ, একজন দার্শনিক, একজন আল্লাহভীরু লেখক—যিনি কলম দিয়ে সমাজ বদলাতে চেয়েছিলেন।
তার জীবন আমাদের শেখায়—সত্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করা সম্ভব, যদি হৃদয়ে থাকে ঈমান।
তিনি ছিলেন এক নিঃসঙ্গ ভাবুক, এক অধ্যয়নরত কারাবন্দী, এক দৃঢ়দর্শী শহীদ। কিন্তু তার কলম জাগিয়েছে প্রজন্মকে—তার চিন্তা আলো দিয়েছে অন্ধকারে।