27/08/2026
অস্ট্রেলিয়াতে আসার প্রথম দিনগুলোর কথা।
তখনো আমি পুরোদস্তুর বাঙালি খাবার-
মানে অতিরিক্ত তেল, মশলা আর ঝালেই অভ্যস্ত। সিডনির লাকেম্বায় থাকার সুবাদে দেশীয় কোনো খাবার পেতেও একদম কষ্ট হতো না।
যেকোনো ভর্তা করলেই তাতে শুকনো লাল মরিচ থাকা চাই ই চাই। কারণ একটু লাল লাল আর ঝাল না হলে কি আর খাবার জমে?
আমি যে খুব বেশি ঝালপ্রেমী ছিলাম তা নয়, কিন্তু শুকনো মরিচের ফ্লেভারটা খুব ভালো লাগতো।
তার ওপর মাংস ভুনায় কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়োর নতুন সংযোজন, রান্নায় কী চমৎকার রং হতো!
আর মাছ-মাংসের ঝোলে একটু তেল ভেসে না উঠলে যেন তৃপ্তিই আসতো না।
এইভাবেই কাটলো টানা ছয়-সাত মাস।
তবে এর সঙ্গেই চলতো আরেকটা রুটিন- দিনে দুবার গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খাওয়া।
দেশ থেকে আসার সময় প্রচুর ওষুধ নিয়ে এসেছিলাম, কারণ ভাবতাম এগুলো ছাড়া বেঁচে থাকাই অসম্ভব।
তারপর একদিন হঠাৎ রাতে পেটে তীব্র ব্যথা শুরু হলো।
খেয়াল হলো, সেদিন কোনো গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খাওয়া হয়নি।
ব্যথার তীব্রতা এত বেশি ছিল যে সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ছিল।
এদিকে আমার হাজব্যান্ড খেয়াল করলো, সেদিন রাতেও আমি শুকনো মরিচ দিয়ে ঝাল ভর্তা খেয়েছি।
তারও দুদিন আগে বিভিন্ন মশলাদার খাবার ও ভাজাপোড়া খেয়েছি!
ব্যথায় কাতর আমাকে সেদিন সেও রাগ করলো।
পরের সপ্তাহেই বাধ্য হয়ে জিপির (General Practitioner) কাছে গেলাম।
ভেবেছিলাম আমার হয়তো এবার অনেক বড় কোনো সমস্যা হয়ে গেছে, অথবা গ্যাস্ট্রিকের পাওয়ার বাড়িয়ে ২০ থেকে আরও বেশি করতে হবে।
জিপি সব শুনে কিছু প্যাথলজিক্যাল টেস্ট দিলেন।
কয়েকদিন পর টেস্টের রেজাল্ট দেখে আমি রীতিমতো অবাক!
আমার নাকি কোনো ধরনের গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা নেই।
মূল সমস্যা আমার পরিপাকতন্ত্রের অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা (Stomach Sensitivity) এবং ভুল খাদ্যাভ্যাস।
তিনি আরও বললেন, "নিজের শরীরকে বুঝতে চেষ্টা করুন, খাবারের অভ্যাসে পরিবর্তন আনুন—এমনিতেই ভালো থাকবেন।
বয়স এখনো কম, এই বয়সে যদি নিজের যত্ন না নেন, তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে ভোগান্তি কিন্তু আরও বাড়বে।"
সেদিন জিপির কাছ থেকে বাসায় ফিরে রান্নাঘরে গিয়ে সত্যি কান্না ধরে রাখতে পারিনি। আমার খুব অসহায় লাগছিলো।
ভাবছিলাম, এরপর আমি কীভাবে খাব? রান্না কীভাবে সুস্বাদু করব?
পরে পাকিস্থলীর সেনসিটিভিটি বিষয় নিয়ে একটু খোঁজ নিয়ে জানলাম - পৃথিবীর সব মানুষের হজম ক্ষমতা একরকম নয়। সব খাবার সবার সহ্যও হয় না।
জোর করে ভুল খাদ্যাভ্যাস চালিয়ে গেলে একটা সময় শরীর তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবেই।
তারপর থেকে আমি আস্তে আস্তে খাদ্যাভ্যাস ও রান্নায় পরিবর্তন আনলাম।
সত্যি বলতে খাদ্যাভ্যাস পাল্টানো প্রথম প্রথম খুব কঠিন লেগেছিল, মন বলতো-
এমন খাবার খেয়ে কি তৃপ্তি পাওয়া যায়?
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে যখন দেখলাম পেটব্যথা হচ্ছে না ও শরীর ঝরঝরে লাগছে। তখন বুঝলাম জিপির সেই কথাটা কত গভীর ছিল।
যদিও এখনও মাঝেমধ্যে রুটিনের বাইরে চলে যাই, তখন একটু সমস্যা হয়- কিন্তু সেখানেও ওষুধ ছাড়া সার্ভাইব করতে শিখেছি।
বাংলাদেশে আমরা ভেজাল ও ফরমালিনে ভরা খাবারে অভ্যস্ত হয়ে যাই।
সামান্য পেটের অস্বস্তি নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলেই শুরুতেই গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ প্রেসক্রাইব করে দেওয়া হয়, আর আমরাও কোনো কিছু না ভেবে তা মুড়ির মতো গিলতে থাকি।
অথচ আমাদের রান্নার ধরন বদলানো কিংবা খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের গুরুত্ব নিয়ে কেউ সেভাবে কথাই বলে না। কারও বিশেষ কোনো খাবারে হজমপ্রক্রিয়ায় সমস্যা বা অসহনশীলতা থাকলেও ,অনেক সময় তা পরিবারের কেউ তা সহজে বুঝতে চায় না- এমনকি ভুক্তভোগী মানুষটি নিজেও নিজের শরীরের এই সংকেতটুকু বুঝে উঠতে পারেন না।
আমি মনে করি, আমাদের এই মানবদেহ সৃষ্টিকর্তার এক অমূল্য নিয়ামত।
একে অযত্নে ফেলা অথবা কষ্ট দেওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। শরীরে ব্যাধি ও নানা শারীরিক জটিলতা তিনিই পরীক্ষা হিসেবে দেন, আবার এর বিপরীতে সুস্থতা পাওয়ার চেষ্টা করার ক্ষমতাও তিনিই আমাদের দিয়েছেন। তাই নিজের সাধ্য আর আয়ত্তের মধ্যে থেকে যতটুকু ভালো থাকা সম্ভব-
সেই চেষ্টাটুকু আমাদের অবশ্যই করে যাওয়া উচিত।