30/08/2026
পরবাসের আকাশটা অন্যরকম সুন্দর হতে পারে, কিন্তু সেই আকাশে নিজের ছাদ থাকে না।
আরিফ যখন এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে মায়ের শেষ জড়িয়ে ধরা আর কাঁদো কাঁদো গলায় বলা, "ঠিকমতো খাইস বাবা" কথাটা মনে করছিল, তখন বাইরে প্রখর রোদ। সৌদি আরবের মরুভূমির সেই বাতাসে প্রথম পা রাখতেই গলার ভেতরটা কেমন শুকনো কাঠ হয়ে গিয়েছিল।
গত চার বছর ধরে আরিফের দিন শুরু হয় সূর্য ওঠার আগে। ১০ বাই ১২ ফুটের একটা ছোট রুমে ছ'জন মানুষ থাকে। সবাই আলাদা আলাদা দেশ থেকে এসেছে, সবার ভাষাও এক নয়, কিন্তু সবার চোখের কোণে জমে থাকা ক্লান্তি আর একাকীত্বের গল্পটা একদম একই।
দিনের বেলা কনস্ট্রাকশনের কাজে ৫০ ডিগ্রি গরমে লোহার রডগুলো যখন আরিফের হাতে ছ্যাঁকা দেয়, সে হাত সরিয়ে নেয় না। প্রতিবার আগুনের মতো গরম রড ছুঁলেই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ছোট বোনের হাসিমুখটা। সামনেই বোনটার বিয়ে, বাবা ডায়াবেটিসের রোগী, আর প্রতি মাসের ২০ তারিখেই বাড়ির থেকে পাঠানো ফোনকল—"টাকাটা কি পাঠানো হয়েছে?"
প্রবাসীদের কোন অসুখ হতে নেই। একদিন প্রচণ্ড জ্বরে আরিফ যখন কাঁপছিল, পাশের বেডের রহিম ভাই এক কাপ গরম পানি আর একটা প্যারাসিটামল এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, "শুয়ে থাকলে চলবে না ভাই, আজ না গেলে হাজিরা কাটা যাবে।" বাধ্য হয়ে আরিফ উঠে দাঁড়িয়েছিল। কাজের জায়গায় এক কোণে দাঁড়িয়ে যখন চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছিল, তখন সহকর্মী বুঝেছিল সেটা জ্বরের জন্য, কিন্তু আরিফ জানত সেটা দেশের বাড়ি যাওয়ার তীব্র যন্ত্রণায়।
সবচেয়ে কঠিন সময় আসে ইদের দিনগুলোতে। যখন দেশে সবাই নতুন জামা পরে আড্ডা দেয়, তখন প্রবাসীদের ইদ কাটে ভিডিও কলে কৃত্রিম হাসি হেসে। স্ক্রিনের ওপাশে মাকে বলতে হয়, "আমি খুব ভালো আছি গো মা! এখানে কত পদের খাবার রান্না হয়েছে!" অথচ কলটা কেটে দিয়ে হয়তো শুকনো একটা পরোটা আর ডিম ভাজি দিয়ে সকালের খাবার শেষ করতে হয়।
প্রবাসী জীবন মানে নিজের যৌবন, সব সুখ আর ইচ্ছেগুলোকে বিসর্জন দিয়ে অন্য কারও মুখে হাসি ফোটানোর এক নীরব যুদ্ধ। তারা প্রতিটা টাকা পাঠায় রক্তের ফোঁটা নিংড়ে, আর নিজেরা বাঁচে শুধু আগামী মাসে বাড়ি ফেরার একটা কাল্পনিক স্বপ্ন বুকে