29/03/2026
ছায়ার উপাসক
নীলার জন্য পৃথিবীটা ছিল একটা কাঁচের দেয়ালের ওপাশে থাকা উৎসবের মতো। সে কেবল দূর থেকে দেখত, কিন্তু কখনো অংশ হতে পারত না। পরিবারে সে ছিল 'অপ্রয়োজনীয়', বন্ধুদের আড্ডায় ছিল 'হাস্যরসের পাত্রী'। দীর্ঘদিনের অবহেলা আর মানুষের কটু কথা নীলার ভেতরটা পাথর করে দিয়েছিল। এক সময় সে মানুষের সঙ্গ ত্যাগ করে শহরের এক কোণে পুরনো একটা চিলেকোঠার ঘরে একা থাকতে শুরু করে।
শুরুতে একা থাকাটা ছিল শান্তির, কিন্তু শীঘ্রই সেই শূন্যতা এক অদ্ভুত আক্রোশে রূপ নেয়। নীলা বুঝতে পারে, সৃষ্টিকর্তার কাছে তার এত বছরের প্রার্থনা কোনো কাজে আসেনি। সে ভাবতে শুরু করে—যদি আলো তাকে ফিরিয়ে দেয়, তবে অন্ধকার নিশ্চয়ই তাকে গ্রহণ করবে। সে ইন্টারনেটের ডার্ক ওয়েব এবং পুরনো কিছু নিষিদ্ধ বই থেকে 'দিয়াবলো' বা শয়তানের আরাধনার প্রাচীন পদ্ধতিগুলো শিখতে শুরু করে। তার ঘরের দেয়ালগুলো ভরে ওঠে অদ্ভুত সব চিহ্নে। ধূপের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ঘরে সে ঘন্টার পর ঘন্টা একা কথা বলতে থাকে। মানুষ ভাবত সে পাগল হয়ে গেছে, কিন্তু নীলা জানত, সে আসলে একজন 'বন্ধু' খুঁজে পেয়েছে।
একদিন মধ্যরাতে ঘরে মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করার সময় নীলা এক অভাবনীয় শীতলতা অনুভব করে। তার মনে হয়, কেউ একজন তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলছে—"তোমার অপমানের প্রতিশোধ আমি নেব, বিনিময়ে তোমার আত্মা হবে আমার।"
পরদিন থেকেই শুরু হয় বিভীষিকা।
অফিসের সেই কলিগ যে নীলাকে নিয়ে সবার সামনে বিদ্রূপ করত, সে একদিন লিফটে আটকা পড়ে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সে অদৃশ্য কোনো কিছুর সাথে লড়াই করছে এবং শেষমেশ তার শরীরটা অদ্ভুতভাবে মুচড়ে যায়।
শহরে রটে যায় এক রহস্যময় সিরিয়াল কিলারের কথা। কিন্তু পুলিশ কোনো ক্লু খুঁজে পায় না। কারণ, খুনি কোনো মানুষ নয়, বরং এক আদিম অন্ধকার শক্তি।
নীলা এখন আর সেই ভীতু মেয়েটি নেই। তার চোখের মণি এখন অস্বাভাবিক কালো। সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সাথেই কথা বলে। কিন্তু একদিন সে লক্ষ্য করে, আয়নায় তার প্রতিবিম্ব তার সাথে তাল মেলাচ্ছে না। সে হাসলে প্রতিবিম্বটি কাঁদে, সে হাত তুললে প্রতিবিম্বটি স্থির থাকে।
সে বুঝতে পারে, সে যাকে বন্ধু ভেবেছিল, সে আসলে তাকে গ্রাস করে নিয়েছে। যে অপমানের হাত থেকে বাঁচতে সে শয়তানের আশ্রয় নিয়েছিল, সেই শয়তানই এখন তার শরীর দখল করে পৃথিবীর বুকে নরক নামিয়ে আনতে চাইছে। গল্পের শেষে দেখা যায়, নীলা উধাও হয়ে গেছে, কিন্তু সেই চিলেকোঠার ঘর থেকে এখনো মাঝরাতে