18/05/2026
বছরের শ্রেষ্ঠ ১০টি রাত হলো রমজানের শেষ দশক, আর বছরের শ্রেষ্ঠ ১০টি দিন হলো জিলহজ্বের প্রথম দশক। আল্লাহর কাছে এই ১০ দিনের আমল অনেক প্রিয়। জিলহজ্ব মাসের প্রথম ১০ দিনে আমরা যে আমলগুলো করতে পারি—
১। জিলহজ্বের প্রথম ৯ দিন নফল রোজা রাখা; বিশেষ করে আরাফার দিন :
জিলহজ্বের প্রথম দশকে রোজার বিষয়ে উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, ❝চারটি আমল রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কখনো ছাড়তেন না। আশুরার রোজা, জিলহজ্বের প্রথম দশকের (অর্থাৎ প্রথম নয় দিনের) রোজা, প্রত্যেক মাসের তিন দিনের রোজা, ফজরের আগে দুই রাকাত সুন্নত নামাজ।❞
— সুনানে নাসায়ী : ২৩৭৪; সহীহ ইবনে হিব্বান : ৬৪২২; মুসনাদে আহমাদ : ২৬৩৩৯।
রাসূল (ﷺ) বলেন, ❝আরাফার দিনের রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর নিকট আশা করি যে, তিনি এর দ্বারা বিগত বছর ও আগামী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।❞
— সহীহ মুসলিম : ১১৬২
২। সামর্থ্য থাকলে হজ্জ ও উমরাহ করা :
আল্লাহ তা'আলা বলেন, ❝তাতে রয়েছে স্পষ্ট নির্দশনসমূহ, মাকামে ইবরাহীম। আর যে তাতে প্রবেশ করবে, সে নিরাপদ হয়ে যাবে এবং সামর্থ্যবান মানুষের উপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ্জ করা ফরজ। আর যে কু*ফরী করে, তবে আল্লাহ তো নিশ্চয় সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী।❞
— সূরা আল-ইমরান : ৯৭
৩। সামর্থ্য থাকলে কুরবানি করা :
❝কাজেই তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামায আদায় কর এবং কুরবানী কর।❞
— সূরা আল-কাউসার : ২
৪। চুল ও নখ না কাটা :
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, ❝যখন তোমরা জিলহজ্ব মাসের (নতুন চাঁদ দেখতে পাও) আর তোমাদের কেউ কুরবানি করার ইচ্ছা করে, তবে সে যেন তার চুল না ছাটে ও নখ না কাটে।❞
— সহীহ মুসলিম : ১৯৭৭
৫। আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তাওবাহ করা :
এ দিন গুলোতে তাওবাহ করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার একটি সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
❝হে মোমিনগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবাহ কর—বিশুদ্ধ তাওবাহ; সম্ভবত তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কাজগুলো মোচন করে দেবেন এবং তোমাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সে দিন আল্লাহ লজ্জা দেবেন না নবীকে এবং তার মোমিন সঙ্গীদেরকে, তাদের জ্যোতি তাদের সম্মুখে ও দক্ষিণ পার্শ্বে ধাবিত হবে। তারা বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জ্যোতিকে পূর্ণতা দান কর এবং আমাদেরকে ক্ষমা কর, নিশ্চয় তুমি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।❞
— সূরা আত-তাহরীম : ৮
৬। অধিক পরিমাণে আল্লাহর যিকির করা :
আল্লাহ ত'আলা বলেন, ❝যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যা রিজিক হিসেবে দান করেছেন তার উপর নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে।❞
— সূরা আল-হাজ্জ : ২৮
অধিকাংশ আলেম বলেছেন : এ আয়াতে নির্দিষ্ট দিন বলতে জিলহজ্বের প্রথম দশ দিনকে নির্দেশ করা হয়েছে। এ সময়ে আল্লাহর বান্দাগণ বেশি বেশি করে আল্লাহর প্রশংসা করেন, তার পবিত্রতা বর্ণনা করেন, তার নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করেন, কুরবানির পশু য*বেহ করার সময় আল্লাহর নাম ও তাকবীর উচ্চারণ করে থাকেন।
হাদিসে আছে চারটি বাক্য আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়।
ক. সুবহানাল্লাহ, খ. আলহামদুলিল্লাহ, গ. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ঘ. আল্লাহু আকবর। এ দিনগুলোতে এ যিকিরগুলো করা যেতে পারে।
৭। বেশি বেশি তাকবীর, তাহলীল ও তাহমীদ পাঠ করা :
রাসুল (ﷺ) বলেন, ❝আল্লাহ তা‘আলার নিকট জিলহজ্বের দশ দিনের আমলের চেয়ে মহান এবং প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সুতরাং, তোমরা সেই দিনগুলোতে অধিক পরিমাণে
তাসবিহ ( سُبْحَانَ اللّٰهِ ), সুবহানাল্লাহ
তাহমিদ ( ٱلْحَمْدُ لِلَّٰهِ ), আলহামদুলিল্লাহ
তাহলিল ( لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ ) লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ
ও তাকবির ( اللّٰهُ أَكْبَر ) আল্লাহ আকবার, পড়ো।❞
— মুসনাদে আহমাদ : ৫৪৪৬; (হাদিসটির সনদ সহীহ)
এবং আরাফার দিন অর্থাৎ জিলহজ্বের ৯ তারিখ ফজর থেকে শুরু করে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর একাকী বা জামাতে নামাজ আদায়কারী, নারী অথবা পুরুষ— প্রত্যেকের জন্য একবার তাকবিরে তাশরিক —
(اَللهُ أَكْبَرُ، اَللهُ أَكْبَرُ، لَاإِلَهَ إِلاَّ اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ، اللهُ أَكْبَرُ وَلِلهِ الحَمْدُ)
পাঠ করা ওয়াজিব। পুরুষরা উচ্চ আওয়াজে বলবে, আর নারীরা নিচু আওয়াজে।
— ইবনু তাইমিয়্যাহ, মাজমু‘উ ফাতাওয়া : ২৪/২২০; ইবনুল কায়্যিম, যাদুল মা‘আদ : ২/৩৬০; ইবনু আবিদিন, রাদ্দুল মুহতার : ৩/৬১।
৮। সকল প্রকার গুনাহ থেকে বিরত থাকা :
চারটি সম্মানিত মাসের একটি হলো জিলহজ্ব; তাই এই মাসের সম্মানে যথাসম্ভব সকল গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ❝নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট সংরক্ষিত ফলকে (বছরে) মাসের সংখ্যা বারোটি—আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তার মধ্যে চারটি (মাস) সম্মানিত। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান; সুতরাং এর মধ্যে তোমরা (গুনাহ করার মাধ্যমে) নিজেদের প্রতি অত্যাচার করো না।❞
— সূরা আত-তাওবা : ৩৬
৯। বেশি বেশি নফল ইবাদত করা :
এই দিনগুলো বছরের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ, তাই অধিক পরিমাণে নেক আমল করা।
রাসূল (ﷺ) বলেছেন, ❝আল্লাহ তা‘আলার নিকট জিলহজ্বের (প্রথম) দশ দিনের আমলের চেয়ে অধিক মর্যাদাপূর্ণ ও প্রিয় অন্য কোনো আমল নেই। সাহাবিগণ বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আল্লাহ রাস্তায় জি*হা/দও কি এর চেয়ে উত্তম নয়?’ তিনি বললেন, না। আল্লাহর রাস্তায় জি*হা/দও নয়। তবে যে ব্যক্তি তার জান ও মাল নিয়ে (জি*হা/দে) ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং এর কোনো কিছু নিয়েই আর ফিরে এলো না (অর্থাৎ, শহীদ হয়ে গেলো, তার কথা ভিন্ন)।❞
— সহীহ বুখারী : ৯৬৯; মুসনাদে আহমাদ : ৬৫০৫; আবু দাউদ : ২৪৩৮।
❝জিলহজ্ব মাসের ১ম ১০ দিনের ফরজ ইবাদত অন্যান্য মাসের ফরজ ইবাদতের তুলনায় অধিক মর্যাদার। এই দশদিনের নফল ইবাদত অন্যান্য মাসের নফল ইবাদতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।❞
— ইবনু রজব, ফাতহুল বারি : ৯/১৫
১০। বেশি বেশি দান-সাদাকাহ করা :
দান-সাদাকাহ এমনিতেই গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল। বিশেষ দিনে এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। তাই জিলহজ্ব মাসে দান-সাদাকাহ করা বিশেষ সওয়াবের কাজ ও ফজিলতপূর্ণ আমল। অন্যের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার মর্যাদা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ❝যারা নিজের সম্পদ দিনে বা রাতে প্রকাশ্যে অথবা গোপনে আল্লাহর পথে খরচ করে তাদের পুরস্কার তাদের প্রতিপালকের কাছে আছে। তাদের কোনো ভয় নেই। তাদের কোনো চিন্তাও নেই।❞ — সূরা বাকারা : ২৭৪
আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে এই আমলগুলো সহীহ নিয়তে আমল করার তাওফিক দান করুন আমিন।