12/09/2026
আমার স্ত্রী আমাকে কোনোদিন বলেনি যে সে আমার উপর রাগ করেছে। এই একটা ব্যাপারই আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়। মানুষ রাগ করলে অন্তত বোঝা যায়, কোথাও একটা ভুল হয়েছে। আমার স্ত্রী রাগ করতো না। সে শুধু চুপ হয়ে যেতো।
প্রথম দিকে আমি ব্যাপারটা বুঝিনি। বিয়ের পর প্রথম বছর সে আমার জন্য দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতো।
আমি অফিস থেকে ফিরলে বলতো,
"এত দেরি হলো কেন?"
আমি বলতাম,
"অফিসে কাজ ছিল।"
সে মুখ বাঁকিয়ে বলতো,
"প্রতিদিনই কাজ থাকে তোমার।"
আমি হাসতাম। সে রাগ করে ঘরে চলে যেত। সেই রাগের মধ্যে সংসার ছিল।
দ্বিতীয় বছরে দরজায় দাঁড়ানো বন্ধ হলো। আমি চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঢুকতাম। সে রান্নাঘর থেকে বলতো,
"হাত-মুখ ধুয়ে নাও। খাবার দিচ্ছি।"
তৃতীয় বছরে রান্নাঘর থেকেও আর ডাক আসতো না। টেবিলে খাবার ঢাকা থাকতো। আমি খেতাম। সে হয়তো অন্য ঘরে বসে ফোন দেখতো।
আমি মাঝে মাঝে বলতাম,
"তুমি খাবে না?"
সে বলতো,
"খেয়েছি।"
আমি জিজ্ঞেস করতাম না, সত্যিই খেয়েছে কি না। মানুষ সংসারে কিছু প্রশ্ন করতে করতে একসময় এমন জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে প্রশ্ন করাটাই অস্বস্তিকর লাগে।
আমাদের একটা ছেলে ছিল। আরিয়ান। ছেলেটা ছোটবেলায় আমাকে ছাড়া কিছু বুঝতো না। আমি অফিস থেকে ফিরলেই দৌড়ে এসে আমার পায়ে ঝুলে পড়তো। একদিন আমার স্ত্রী বলেছিল,
"ওকে একটু সময় দাও।"
আমি বলেছিলাম,
"সারাদিন তো তোমার সঙ্গেই থাকে।"
সে কিছু বলেনি। কয়েক বছর পর আরিয়ান আমার কাছে আসা বন্ধ করে দিলো। আমি অফিস থেকে ফিরলে সে পড়ার টেবিলে বসে থাকতো।
আমি বলতাম,
"কী করছিস?"
"পড়ছি।"
"কী পড়ছিস?"
"ইংরেজি।"
তারপর আবার বইয়ে চোখ। আমি ভাবতাম, বড় হচ্ছে। বড় হলে ছেলেরা এমনই হয়।
এক রাতে আমার স্ত্রী বললো,
"কাল আমার সঙ্গে একটু বাজারে যাবে?"
আমি ল্যাপটপে কাজ করছিলাম।
বললাম,
"কাল পারবো না।"
"পরশু?"
"দেখি।"
"কবে পারবে?"
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,
"জানি না তো!"
সে আর কিছু বলেনি। পরদিন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে দেখি রান্নাঘরের সিঙ্কের নিচে একটা পুরোনো প্লাস্টিকের বালতি রাখা। বালতিটা ভেঙে গিয়েছিল।
আমি বললাম,
"এটা ফেলে দাও।"
সে বললো,
"এখনো তো চলে।"
আমি বললাম,
"ভাঙা জিনিস রেখে কী লাভ?"
সে বললো,
"সব ভাঙা জিনিস ফেলে দেওয়া যায় না।"
আমি তখন কথাটার মানে বুঝিনি। আমাদের সংসারে বড় কোনো ঝগড়া হয়নি। কেউ কাউকে মারেনি। কেউ অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক করেনি। কেউ বাড়ি ছেড়ে যায়নি। তবু একদিন বুঝলাম, আমরা স্বামী-স্ত্রী নই। আমরা একই বাসায় থাকা দুজন মানুষ। একজন বাজার করে। আরেকজন বিল দেয়। একজন রান্না করে। আরেকজন অফিস করে। একজন সন্তানের স্কুল দেখে। আরেকজন ফি দেয়। একজন অসুস্থ হলে অন্যজন ওষুধ এনে দেয়। কিন্তু কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করে না, “তুমি কেমন আছ?” কারণ আমরা দুজনেই ধরে নিয়েছিলাম, ও ভালো আছে।
আমার স্ত্রী একদিন খুব অসুস্থ হয়ে পড়লো। সকাল থেকে মাথা ধরেছিল।
আমি বললাম,
"ডাক্তারের কাছে যাও।"
সে বললো,
"তুমি নিয়ে যাবে?"
আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম। সেদিন আমার একটা মিটিং ছিল।
বললাম,
"তুমি রিকশায় চলে যাও। আমি পরে আসছি।"
সে কিছু বললো না।
দুপুরে অফিস থেকে ফোন এলো। হাসপাতাল থেকে। সে রাস্তায় অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। আমি হাসপাতালে গিয়ে দেখলাম, সে বিছানায় শুয়ে আছে।
ডাক্তার বললেন,
"আপনার স্ত্রী অনেকদিন ধরে শারীরিকভাবে দুর্বল।'
আমি অবাক হয়ে বললাম,
"অনেকদিন ধরে?"
ডাক্তার আমার দিকে তাকালেন।
"আপনি জানতেন না?"
আমি মাথা নাড়লাম। ডাক্তার আর কিছু বলেননি। সেই নীরবতাটা আজও মনে আছে। মানুষের জীবনে কিছু নীরবতা থাকে, যেগুলো আসলে প্রশ্ন। সেদিন রাতে হাসপাতালের করিডরে বসে আমি প্রথমবার আমাদের বিয়ের দিনটার কথা মনে করার চেষ্টা করলাম-
আমি তাকে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম? মনে পড়লো না। কী বলেছিলাম? মনে পড়লো না। শুধু মনে পড়লো, সেদিন সে আমার হাত শক্ত করে ধরেছিল।
আমি বলেছিলাম,
"ভয় পাচ্ছো?"
সে বলেছিল,
"না।"
আমি বলেছিলাম,
"তাহলে?"
সে হেসে বলেছিল,
"তুমি আছো তো।"
আমি চোখ বন্ধ করলাম। কী অদ্ভুত। একটা মানুষ একসময় আমার উপর এতটা নির্ভর করতো। আর আমি এত বছর ধরে ভাবতাম, সে খুব শক্ত মেয়ে।
হাসপাতাল থেকে ফেরার পর সে বদলে গেল। আগের মতোই কাজ করতো। আগের মতোই রান্না করতো। আগের মতোই ছেলের খোঁজ নিতো। কিন্তু আমার সঙ্গে কথা বলা প্রায় বন্ধ করে দিল।
আমি একদিন বললাম,
"তুমি আমার উপর রাগ করেছো?"
সে বললো,
"না।"
"তাহলে কথা বলছো না কেন?"
সে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
"কথা বলার মতো কিছু আছে?"
আমি বললাম,
"অবশ্যই আছে।"
সে একটু হাসলো।
তারপর বলল,
"আছে?"
আমি উত্তর দিতে পারলাম না।
কয়েক মাস পর আরিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো। ছেলেটা অন্য শহরে চলে যাবে। আমি ভাবলাম, যাওয়ার আগে অন্তত সবাই মিলে একটা দিন কোথাও ঘুরতে যাই।
শনিবার সকালে বললাম,
"চলো, কোথাও যাই।"
আরিয়ান অবাক হয়ে বললো,
"কোথায়?"
আমি বললাম,
"যেখানে যেতে চাস।"
সে মায়ের দিকে তাকালো।
তারপর বললো,
"মা যাবে?"
আমার স্ত্রী রান্নাঘর থেকে বললো,
"তোমরা যাও।"
আমি বললাম,
"তুমিও যাবে।"
সে বললো,
"আমার কাজ আছে।"
আরিয়ান বললো,
"মায়ের কাজ সবসময় থাকে।"
তারপর নিজের ঘরে চলে গেল।
আমি স্ত্রীর দিকে তাকালাম। সে চুপচাপ সবজি কাটছিল।
আমি বললাম,
"তুমি কি সত্যিই যেতে চাও না?'
সে বললো,
"না।"
আমি বুঝলাম, সে শুধু ঘুরতে যেতে চাইছে না, তা-না, সে আমাদের সঙ্গে যেতে চাইছে না। এই পার্থক্যটা বুঝতে আমার প্রায় দশ বছর লেগে গেল।
সেদিন রাতে আমি তার পাশে বসে বললাম,
"তুমি আমাকে একটা কথা বলবে?"
সে বললো,
"বলো।"
"আমি কী করেছি?"
সে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
"তুমি কিছু করোনি।"
আমি বললাম,
"তাহলে?"
সে ধীরে ধীরে বললো,
"তুমি কিছু করোনি।"
আমি চুপ।
সে বললো,
"এইটাই তো সমস্যা।"
আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
সে বললো,
"তুমি কোনোদিন আমাকে কষ্ট দেওয়ার মতো কিছু করোনি। কিন্তু সুখী করার মতো কিছু করেছো?"
আমি উত্তর দিতে পারলাম না।
সে বললো,
"তুমি কখনো খারাপ স্বামী ছিলে না। তুমি শুধু কোনোদিন স্বামী হওয়ার সময় পাওনি।"
কথাটা খুব সহজ ছিল। কিন্তু আমার বুকের মধ্যে কোথায় যেন গিয়ে লাগলো।
আমি বললাম,
"আমি তো সংসারের জন্য এত কিছু করেছি।"
সে বললো,
"জানি।"
"তাহলে?"
"সংসার চালিয়েছ।"
তারপর একটু থেমে বললো,
"আমাকে চালাওনি।"
আমি মাথা নিচু করলাম।
সে বললো,
"তুমি আমাকে কখনো মারোনি। গালি দাওনি। খেতে দাওনি এমনও হয়নি। আমার প্রয়োজনের জিনিস কিনে দিয়েছ। অসুস্থ হলে ডাক্তার দেখিয়েছ।"
তারপর সে খুব শান্ত গলায় বললো,
"কিন্তু তুমি কোনোদিন খেয়াল করোনি, আমি কোন জিনিসটা কিনতে গিয়ে দোকানে দাঁড়িয়ে আবার রেখে দিয়েছি।''
আমি তাকালাম।
সে বললো,
- কোন শাড়িটা আমার পছন্দ হয়েছে, তুমি জানো না।
- কোন গান শুনলে আমার মন ভালো হয়, জানো না।
- কোন কথায় আমি কষ্ট পাই, জানো না।
- আর সবচেয়ে বড় কথা...
সে থেমে গেল।
আমি বললাম,
"কী?"
সে বললো,
"তুমি জানো না, আমি তোমাকে কতবার ডাকতে চেয়েছি।"
আমার গলা শুকিয়ে গেল।
পরদিন সকালে আমি অফিসে ফোন করে ছুটি নিলাম। আমার স্ত্রী অবাক হয়ে বললো,
"কেন?"
আমি বললাম,
"আজ তোমার সঙ্গে মার্কেটে যাবো।
সে বললো,
"কী দরকার?"
আমি বললাম,
"কিছু কিনবো।"
"কী?"
আমি বললাম,
"জানি না।"
সে মৃদু হেসে বললো,
"তুমি তো কখনো জানো না।"
আমি প্রথমবার তার পাশে দাঁড়িয়ে মার্কেটে গেলাম। সে একটা শাড়ির দোকানের সামনে থামলো। একটা নীল শাড়ি হাতে নিল। তারপর দাম দেখে রেখে দিল। আমি বললাম,
"নাও।"
সে বললো,
"দরকার নেই।"
আমি বললাম,
"তোমার ভালো লেগেছে।'
সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর বললো,
"তুমি বুঝলে কীভাবে?"
আমি বললাম,
"শিখছি।"
সে আর কিছু বললো না। শাড়িটা নিল। বাড়ি ফেরার পথে সে হঠাৎ বললো,
"জানো, তোমার সঙ্গে আমার সবচেয়ে বেশি ঝগড়া হয়েছে কোন বিষয় নিয়ে?"
আমি বললাম,
"কোনটা?"
সে বললো,
"তুমি সবসময় বলেছ, সময় নেই।”
আমি মাথা নিচু করলাম।
অনেকক্ষণ পর সে আমার হাতের উপর নিজের হাত রাখলো। খুব স্বাভাবিকভাবে। যেন বহু বছর আগে যেখানে আমাদের হাত দুটো ছিল, সেখানে ফিরে এসেছে। আমি হাতটা সরালাম না।
আরিয়ান চলে যাওয়ার দিন স্টেশনে আমরা তিনজন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ট্রেন ছাড়ার আগে আরিয়ান আমাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
"বাবা, একটা কথা বলবো?"
"বল।"
"মাকে একা রেখো না।"
আমি হেসে বললাম,
"রাখবো না।"
আরিয়ান মায়ের দিকে তাকালো।
তারপর বলল,
"মা, বাবাকে একটু সময় দিও।"
আমার স্ত্রী হেসে ফেললো।
ট্রেন চলে গেল। আমরা দুজন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে রইলাম।
ফেরার সময় আমি বললাম,
"চলো, আজ বাইরে খাই।"
সে বলল,
"কোথায়?"
আমি বললাম,
"তুমি ঠিক করো।"
সে বললো,
"তুমি কি সত্যিই আমার পছন্দের জায়গায় যাবে?"
আমি বললাম,
"হ্যাঁ।"
সে একটু হেসে বললো,
"তাহলে একটা পুরোনো রেস্টুরেন্ট আছে। বিয়ের আগে একবার গিয়েছিলাম।"
আমি বললাম,
"আমার মনে নেই।"
সে বললো,
"জানি।"
তারপর আমার হাত ধরলো।
সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে আমি ঘড়িটা খুলে টেবিলে রেখে দিলাম। পরদিনও।
তার পরদিনও। আমি সময় দেখা বন্ধ করে দিলাম।
কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা ভয়ংকর সত্য বুঝেছি, মানুষ একদিনে সংসার ভাঙে না। একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখে, সংসারটা অনেক বছর আগেই ভেঙে গেছে।
আমাদের সংসারটা সেদিন বেঁচে গিয়েছিল কি না, আমি জানি না। কিন্তু এখন অন্তত প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে আমি আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করি,
“আজ তোমার দিনটা কেমন গেল?”
প্রশ্নটা খুব সাধারণ।
কিন্তু কখনো কখনো একটা সংসার বাঁচানোর জন্য
অসাধারণ কিছু করার দরকার হয় না।
শুধু যার পাশে সারাজীবন থাকার কথা,
তার দিকে তাকিয়ে একদিন সত্যি করে জিজ্ঞেস করতে হয়,
“তুমি কেমন আছো?”