14/05/2025
মাগো,
তুমি জানো আমি একটু একটু করে রোজ তুমি হয়ে যাচ্ছি? এই দেখো না, আমি এখন সবকিছু তোমার মতোই ভুলে যাই। কাঁদতে ভুলে যাই, দুঃখ ভুলে যাই, ভুলে যাই পছন্দের রং কিংবা খাবার। এখন আমার ‘একটা হলেই হলো’ তে চলে যায়।
তুমি শুনে অবাক হবে, কড়াইয়ের গরম তেল হাতে কিংবা মুখে ছিটে উঠলেও আমি এখন আর চিৎকার দিয়ে উঠি না। হাত কেটে র'ক্ত ঝরলেও পাত্তা দেই না, পেঁয়াজের রসটা চোখে গেলে সারা ঘর মাথায় তুলি না। গরম পাতিলটা খালি হাতেই ধরতে পারি, হাত পুড়ে গেল কিনা বুঝতে পারি না।
তোমার মতোই এখন ব্যস্ততাকে ব্যস্ত বলতে সুযোগ পাই না। সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার টিফিনে গুছিয়ে, টেবিলের এঁটো মুছে নিয়ে আমিও এখন হন্তদন্ত হয়ে কাজের দিকে ছুটতে পারি। পা দুটোও যে তোমার মতো হয়ে গিয়েছে। জিরোতে ওরা ভুলে যায় এক্কেবারে। ঘরে ফিরতে ফিরতে একটু জিরিয়ে নেয় এই যাহ্! ঘরে ফিরে আবার কোমড় বেধে নেমে পড়ি ঘরের কাজে। তোমার মতোই “ক্লান্ত লাগে না সত্যি” এই মিথ্যেটা রপ্ত করে নিয়েছি নিখুঁতভাবে।
জানো মা, এখন আর আমার গা থেকে পারফিউমের সেই মিষ্টি গন্ধটা আসে না। পরিবর্তে আসে তোমার গায়ের মতো তেল চিটচিটে, মাছের আঁশটে, মজে যাওয়া ঘামের গন্ধটা।
আমিও এখন পেছনে ফেলে আসা দিনের গল্প করি। কেমন দাপিয়ে বেড়াতাম, বিচ্ছু ছিলাম কেমন, চাঁদটা কেমন হা করে দেখতাম, কতো বই ছিল আমার, কী খেতে পছন্দ করতাম, কী রঙটায় চোখ আটকে যেত ইত্যাদি ইত্যাদির। যেভাবে তুমিও বলতে কোনো এক ছুটির বিকেল বেলাতে। আচ্ছা মা, তোমারও কী তখন মনে হতো সেই ইতিহাসের পাতায় ফিরে যেতে যেখানে সত্যিকার অর্থেই ‘তুমি’ আছো?
জানো, সকাল সকাল এই বিচ্ছিরি এলার্মের শব্দে ঘুম ভাঙলে ভীষণ অসহায় লাগে। তাকিয়ে থাকি ফোনের স্ক্রিনের দিকে বিষণ্ণতায়। মন চায় তোমার ডাকে প্রতিদিন জেগে উঠি। আচ্ছা! এই অসম্ভবকে কীভাবে সম্ভব করতে হয় তোমার কী জানা আছে, মা? আমায় বলে দেবে?
তুমি ওই যে যখন জায়নামাজে বসে দুরুদ জপতে, আমি তখন তোমার কোলে মাথা রেখে একটু শুতাম। তুমি মাথায় হাত বুলিয়ে পিঠ চাপড়ে দিতে। ওই সময়ে চেয়ে সুখীমানুষ আমি কখনো হই নি। আমার বড্ড ইচ্ছে করে আবার তোমার কোলে শুই, সুখের সাগরে গা এলিয়ে দেই। আমার যে খুব বেশি দরকার ওই সুখটুকু।
জানো মা, তুমি যখন ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চোখে কাজল দিতে। আমি তখন সব কাজ ফেলে তোমার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এটা যে আমার এতো প্রিয়! বলতে ইচ্ছে করতো তোমায়, “মা তুুমি সব সময় কাজল দাও না কেন?” এখন বুঝি, তুমি কেন তোমার প্রিয় কাজল দিতে ভুলে যেতে।
মা গো, তোমায় কত্তো কিছু বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আমি যে কিছু বলতে পারি না তোমায়। এত্তো এত্তো লেখা লেখি অথচ তোমায় লিখতে গেলেই সাহসে আটকে যায়। আমার শব্দ ভান্ডার যে ওতটা ভারি নয়, যতটা ভারি থাকলে তোমায় নামে তাদেরকে উৎসর্গ করা যায়। তবুও বলবো, তুমি আমার আস্ত একটা সূর্য, মা। যার আলোতে ওই সাদামাটা রঙচটা ঘরটা আলোকিত হয়। যার দিকে তাকালে সকল দুঃখ ভুলে হয়ে উঠি ভীষণ সাহসী। যার উত্তাপে দুমড়েমুচড়ে যাওয়া আমিটা আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠি। তুমি আছো বলেই ভুলে যাই অবেলার যাতনা, ঘুম না আসা রাত্তিরের শোক, মাথার ব্যামো, অস্থিরতা সঅঅঅব। শুধু তুমি আছো বলেই, এখনো বেঁচে আছি মা। এখনো বেঁচে আছি.....
_ নাবিলা তাসনিম