01/09/2026
আজ ১ সেপ্টেম্বর। ৫৭ বছর আগের এই দিনে লিবিয়াতে একটা রাজতন্ত্র উল্টে গিয়েছিল, আর তার পেছনে ছিলেন মাত্র ২৭ বছর বয়সী এক ক্যাপ্টেন — যিনি পরে ৪২ বছর ধরে দেশ শাসন করেছেন।
সময়টা ১৯৬৯ সাল। লিবিয়া তখন রাজতন্ত্র, শাসক রাজা ইদ্রিস। দেশটা তখন তেলসমৃদ্ধ হয়ে উঠছে, কিন্তু রাজনীতিতে অসন্তোষও বাড়ছিল সমানতালে। তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের একটা অংশ মনে করত রাজতন্ত্র দুর্নীতিগ্রস্ত ও পশ্চিমা শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল আর আরব জাতীয়তাবাদের ঢেউ থেকে তারা অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। লিবিয়ার মাটিতে ব্রিটিশ-মার্কিন সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতিটাও তাদের কাছে ছিল বড় একটা আপত্তির জায়গা। মার্কিন নথিতেও পরে লেখা হয়েছিল, নতুন বিপ্লবী নেতৃত্ব রাজতন্ত্রকে দেখত দুর্নীতি, বিদেশি ঘাঁটি আর অতিরিক্ত পশ্চিমাপন্থী অবস্থানের প্রতীক হিসেবে। এই অসন্তোষ থেকেই জন্ম নেয় Free Officers Movement নামে একটা গোপন সামরিক সংগঠন। যার সদস্যদের একজন ছিলেন ক্যাপ্টেন মুয়াম্মার গাদ্দাফি।
১ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৯। রাজা ইদ্রিস তখন দেশের বাইরে, তুরস্কে চিকিৎসাধীন। তরুণ সেনা কর্মকর্তারা যেন এই সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিলেন। ভোরবেলা সেনাবাহিনীর একটা অংশ ত্রিপোলি আর বেনগাজির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে, যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেয়, রাজপ্রাসাদ ও সামরিক স্থাপনা ঘিরে ফেলে। রাজতন্ত্রের পক্ষ থেকে বড় কোনো প্রতিরোধ গড়েই ওঠেনি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সব শেষ। প্রায় ৭০ জন তরুণ অফিসার এই অভিযানে যুক্ত ছিলেন বলে ঐতিহাসিক সূত্র বলে, আর পুরো ঘটনাটা ছিল কার্যত রক্তপাতহীন।
মজার ব্যাপার হলো, ক্ষমতা যে আসলে কাদের হাতে গেল, সেটা প্রথম দিকে স্পষ্ট ছিল না। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও নিশ্চিত ছিল না। মার্কিন গোয়েন্দা নথিতে coup-এর কয়েকদিন পরও লেখা ছিল, নতুন শাসকদের পরিচয় আর রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে তখনও অনিশ্চয়তা কাটেনি। এই অস্পষ্টতার মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে সামনে চলে আসেন সেই তরুণ ক্যাপ্টেন। গাদ্দাফি হয়ে ওঠেন Revolutionary Command Council-এর চেয়ারম্যান, পরে কর্নেল পদে উন্নীত হয়ে সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ। রাজতন্ত্র উৎখাতের পেছনে তাদের যুক্তি ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, সামাজিক সংস্কার আর বিদেশি প্রভাব থেকে মুক্তি। আরব জাতীয়তাবাদও তাদের বড় একটা প্রেরণা ছিল — মিশরের নাসের ছিলেন গাদ্দাফির আদর্শ। তাদের কাছে স্বাধীনতা মানে শুধু পতাকা বদল না, বিদেশি ঘাঁটি থেকে মুক্তি আর দেশের সম্পদের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
কিন্তু রাজতন্ত্র সরে যাওয়ার পর কি গণতন্ত্র এলো? আসেনি। বরং ক্ষমতা ধীরে ধীরে আরও বেশি করে গাদ্দাফির একার হাতে কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। ১৯৭০ সালে মার্কিন-ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে দেয়া হয়, বিদেশি তেল কোম্পানির ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বাড়ে, তেলের আয় দিয়ে ব্যাপক সামাজিক-অবকাঠামোগত কর্মসূচি নেয়া হয়। অন্যদিকে রাজনৈতিক বিরোধিতা দমন করা হয় কঠোরভাবে। যে তরুণ সেনারা রাজতন্ত্র উৎখাত করেছিলেন, তারাই শেষমেশ এমন একটা শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলেন যেখানে সবকিছুর কেন্দ্রে থেকে যান একজন মানুষ।
এরপরের গল্পটা মোটামুটি সবারই জানা। আশির দশকে পশ্চিমাদের সাথে সংঘাত তীব্র হয়, ১৯৮৬তে যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা চালায়, ১৯৮৮-র Lockerbie bombing-এর পর আসে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। পরে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টাও হয়। কিন্তু ২০১১ তে আরব বসন্তের ঢেউ লিবিয়াতেও পৌঁছায়, বিদ্রোহ ও গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। আর NATO সমর্থিত অভিযানের মধ্যে পতন ঘটে তার ৪২ বছরের শাসনের। ২০ অক্টোবর ২০১১, সির্তের কাছে ধরা পড়ার পর গা/দ্দা/ফি নিহত হন।
একজন ২৭ বছরের তরুণ যেভাবে একটা রাজতন্ত্র ফেলে দিয়েছিলেন, ৪২ বছর পর সেই একই মানুষের গড়া কাঠামোও একইভাবে ভেঙে পড়ল। তবে একজন স্বৈরশাসককে উৎখাত করলেই কি একটা দেশ আসলেই স্থিতিশীল হয়ে যায়, না-কি তাকে স্থিতিশীল থাকতে দেয়া হয়?
—আওলাদ হোসেন মিশকাত
(Mishkat-Books & Facts)
#ইতিহাসে_আজকের_দিন #লিবিয়া #গাদ্দাফি #বিপ্লব