15/02/2022
বাংলার অন্যতম সেরা লেখক সৈয়দ মুজতবা আলি সম্পর্কে একটু রসিকতা।
পিএইচডি করতে তিনি পাড়ি দিয়েছিলেন জার্মানি। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতেন সেই সময়ে আইনস্টাইন ছিলেন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক। একবার সেই শহরে এক কৌতুক প্রতিযোগিতার আয়োজন হল স্থানীয় জার্মান ভাষায়। আর কী আশ্চর্য! সেই প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান পেলেন কী না এক রসিক বাঙালি যুবক! ভাবা যায় ! ছাত্রটি আর কেউ নন, তিনি বাংলার অন্যতম সেরা লেখক সৈয়দ মুজতবা আলি। অন্যতম সেরা রসিক ও বটে।
একবার একজন রাষ্ট্রদূত তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জমিয়ে আলাপ করলেন। পরে সেই রাষ্ট্রদূত বলেছিলেন, “আমি জীবনে এত অল্প সময়ের মধ্যে পৃথিবীর এতরকম বিষয়ে আলাপ এর আগে কখনও শুনিনি, যেটা উনি আমাকে শুনিয়েছিলেন মাত্র কয়েক ঘন্টার মধ্যেই।"
দেশের এবং বিদেশের মিলিয়ে মোট ১৭টি ভাষা ছিল তাঁর অনায়াস দখলে। ১৭টি ভাষাতেই তিনি কথা বলা থেকে শুরু করে লিখতে পর্যন্ত পারতেন। 'গীতা' ছিল তাঁর কণ্ঠ্যস্থ। কবিগুরুর "গীতবিতান" শুরু থেকে শেষ পাতা পর্যন্ত ছিল তাঁর সম্পূর্ণ মুখস্থ। একবার এক অনুষ্ঠানে এক পুরোহিত সংস্কৃত ভাষায় 'গীতা' সম্বন্ধে বক্তব্য রাখছিলেন। উনি ধরে ফেললেন কিছু জায়গায় ভুল বলেছেন ওই পুরোহিত। দাঁড়িয়ে সমস্ত বক্তব্য মূল সংস্কৃত ভাষায় কী হবে তা মুখস্থ বলে গেলেন। সেখানে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা তো হতবাক!
এ হেন আদ্যপান্ত 'বাঙালি' মানুষটি আর কেউ নন। তিনি সৈয়দ মুজতবা আলি!
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় 'বংগীয় শব্দকোষ' রচনা করেছিলেন। শোনা যায়, সেই হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় মারা যাবার আগে বলে গিয়েছিলেন, “আমার অভিধান যদি কোনও সময় সংশোধন করার প্রয়োজন হয় তাহলে যেন সেই কাজটা করে সৈয়দ মুজতবা আলি।” এসবের মধ্যে দিয়েই বোঝা যায় সাহিত্যিক ও ভাষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মুজতবা আলির বাংলা ভাষার ব্যুৎপত্তি জ্ঞান এবং দখল কত গভীর ছিল।
আদ্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতীতে শিক্ষলাভ করা এই সৈয়দ মুজতবা আলি। জাত বা ধর্ম নয়, মনুষ্যত্বের শিক্ষাই ছিল এই মানুষটির আদর্শ। এজন্য কোথাও কখনও বা কটাক্ষের শিকারও হতেন। অনেকেই আড়ালে এমন মন্তব্যও করতেন, "মুজতবা আলির ধর্মনিরপেক্ষ উদার দৃষ্টিভঙ্গি আসলে একটা আইওয়াশ। আসলে মুজতবা একজন ধুরন্ধর পাকিস্তানি এজেন্ট।" এতে আঘাত পেয়ে বড় আক্ষেপ করে মুজতবা তাই লেখক শংকরকে একদিন বলেছিলেন, "এক-একজন মানুষ থাকে, যে সব জায়গায় ছন্দপতন ঘটায়। আমিই বোধহয় সেই রকম লোক!’
লেখক-অধ্যাপক মুজতবা আলির 'রসবোধ' ছিল অত্যন্ত বেশি এবং অসাধারণ! তাঁর মৃত্যুর আগে অবধিও তা বজায় ছিল। রসিকতা করে বন্ধুদের বলেছিলেন, "আমার মৃত্যুর পর সবাইকে বলবে, আলি সাহেব তাঁর বেস্ট বইটা লেখার কথা ভাবছিলেন। কিন্তু কী করবেন, ওঁর তো প্যারালাইসিস হয়ে ডান হাতটাই অবশ হয়ে গেল! হাতটা ভালো থাকলে উনি দেখিয়ে দিতেন সৈয়দ মুজতবা আলির বেস্ট বই কাকে বলে!"
তাঁর লেখা পড়লে অনুধাবন করা যায় তাঁর লেখনীর গভীরতা কতটা! লেখনীতে ফুটে উঠেছে জীবনতৃষ্ণার প্রতি তাঁর গভীর ভালবাসা। সৈয়দ মুজতবা আলির মতো শক্তিশালী সাহিত্যিক বাংলা সাহিত্যে সত্যিই বিরল। কিংবদন্তী সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলিকে তাঁর প্রয়াণ দিবসে জানাই অন্তরের শ্রদ্ধা। চিরশান্তিতে শায়িত থাকুন চুটকি ও রসিকতার সাগর...! আপনি চির জাগরুক হয়ে থাকবেন বাঙালির, বিশেষ করে সাহিত্যপ্রেমীদের হৃদয়ের গভীরে।
তথ্যসূত্র : সৈয়দ মুজতবা আলী: প্রসঙ্গ অপ্রসঙ্গ, নাজমুল হাসান সজীব-এর লেখা।
সংগৃহীত।