04/08/2026
আমাদের বিদ্যানন্দ- ১
তাঁহার নাম দিলাম বিদ্যানন্দ-১। নামটির মর্মার্থ বিশ্লেষণ না করিলে বোধহয় বুকের ভাষাকে মুখে আনিয়া বলা হইয়া উঠিবে না। কালির অক্ষরে লিখা বিদ্যা যখন বিদ্যার্থীর মানসপটে হর্ষ উৎপাদন করিয়া বিদ্যা অর্জনের প্রতি অতিব উৎসুক করিয়া তোলে তখন ঐ বিদ্যার্থীকে বিদ্যানন্দ বলা যাইতে পারে বৈকি!
বিদ্যানন্দ-১ এর সাথে আমার বয়সের কিছুটা পার্থক্য হইলেও সে ছিলো আমার সকল কাজের সঙ্গী। যে বাটীতে আমার আশৈশব কেটেছে সেখানে বিদ্যানন্দ-১ ছিলো আমার সকল কাজের সঙ্গী।
আমাদের কিছু দৈনন্দিন ও কিছু ছুটির দিনের রুটিন কাজ করিতে হইতো। যেমন- প্রত্যুষে উঠিয়া গবাদিপশু গুলির পরিচর্যা করিয়া হুক্কার জল দ্বারা মুখ কুলকুচি করিয়া কিছুটা বিদ্যা বন্দনা করিয়া বা না করিয়া গো-খাদ্যান্বেশনে বেড়িয়ে পড়িতে হইতো। ইহার পর উহাদিগের স্নানাদি নিষ্পন্ন করিয়া নিজদিগের স্নানাদি সম্পন্ন করিয়া পাঠশালার দিকে বাষ্পশকট বেগে ধাবিত হইতে হইতো! যেদিন মাঠে কামলা হইতো সেদিন পাঠশালার দিকাভিমুখী হইতে হইতো না। সেদিন কামলাদিগের দেখভালের দ্বায়িত্ব কাঁধে লইয়া দুজনকেই শশব্যস্ত থাকিতে হইতো। সে অনেক কথা আর কষ্ট বিলাস লইয়াই অতিবাহিত হইতেছিল।
একদিনের কথা। সবে শীতকাল তাহার উপস্তিতির জানান দিয়াছে। এমন এক সন্ধ্যায় গো-কার্যাদি সম্পন্ন করিয়া গাত্রে স্বল্পবসন জড়াইয়া তাহার উপর একখানা চাদর প্যাচাইয়া চট পাতিয়া লন্ঠনের আভায় বিদ্যার্জনের নিমিত্তে দুইজনই বসিয়াছিলাম। আমার তখন বাল্যশিক্ষা শেষ হইলেও বিদ্যানন্দ- ১ তখনও বাল্যশিক্ষার অক্ষর পরিচয়ের মধ্যেই ঘুরপাক খাইতেছিলো! যদিও বিদ্যানন্দ-১ বয়সে বড় ছিলো!
সে সন্ধ্যায় চটাসনে বসিয়া বাড়ির মালিক মাস্টারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হইলেন। আমি সাবলীল পাঠোদ্ধার করিতেছিলাম কিন্তু মাস্টার মহোদয় বিদ্যানন্দ-১ কে চাদরের মধ্য হইতে হস্ত বাহির করিয়া আঙুল দিয়া স্পর্শ করিয়া পড়িবার নির্দেশনা দিতেছিলেন কিন্তু বিদ্যানন্দ-১ কোনমতেই হস্ত বাহির করিতেছিল না।
মাস্টার মহাশয় নিদারুণ ক্ষিপ্ত হইয়া হালুয়া পান্টি দ্বারা বেত্রাঘাত করিতে লাগিলেন। বিদ্যানন্দ-১ একটা উপায় বাহির করিলো। সে উচ্চস্বরে কাঁদিতে কাঁদিতে মাস্টার কাম গৃহস্বামীর বাড়ি সবেগে ত্যাগ করিতে করিতে বলিতে লাগিলো তোর বাড়িতে আর থাকিব না!
বিদ্যানন্দ-১ সেই রাত্রিতেই আমার সংগ ছাড়া হইয়াছিল! তাহাকে রাত্রিকাল পরে প্রত্যুষে ডাকিতে এবং সমবেদনা জ্ঞাপন করিতে গিয়া খুঁজিয়া না পাইয়া ব্যাথাতুর হৃদয়ে গৃহস্বামীর গৃহে প্রত্যাবর্তন করিয়াছিলাম।
বিদ্যানন্দ-১ বিদ্যার্জনের ভয়ে ভীত হইয়া সেইরাত্রেই তাঁর প্রিয় গ্রাম ত্যাগ করিয়াছিল। পৃথিবীর সকল পরা-অপরা বিদ্যা তাঁকে মুক্তি দিয়াছিল। আমি ভগ্নহৃদয় নিয়া বিদ্যার প্রতি অবিচল ভক্তি লইয় গৃহস্বামীর গৃহে পড়িয়া রহিলাম।
আমাদের প্রাথমিক পাঠশালাগুলোতে বিদ্যানন্দ-১ এর মতো বিদ্যার্থী নিতান্তই কম নহে। তাহাদিগের মানসপটে বিদ্যাশিক্ষার বিমল আনন্দ পাইয়ে দিবার যে মহান ব্রত আমাদের শিক্ষাগুরুগণ নিয়াছেন তাহাতে এই অনুমান হইতেছে যে তাঁহারে পাথরে ফুল ফোটাইবার গুরুদায়িত্ব লইয়া কোনও কূল-কিনারা পাইতেছেন না! ইহা ভাবিয়া ভাবিয়া কেশাগ্র পর্যন্ত শুভ্র হইবার উপক্রম হইয়া উঠিয়াছে। বারংবার একটি আওয়াজ ভাসিয়া আসিতেছে। "একটি গাঁধাকে জলের ধারে নেওয়া যায় বটে তাহাকে জল পান করানো যায়না।"