21/06/2026
#গল্পের নাম: ঝরে যাওয়া বকুল
শহরের এক কোণে ছোট একটা বুকস্টল চালাতো নিয়াজ। সারাদিন বইয়ের গন্ধ আর পাতা ওল্টানোর শব্দের মাঝেই কেটে যেত তার জীবন। একা মানুষ, তাই বইগুলোই ছিল তার একমাত্র সঙ্গী। কিন্তু এক চিলতে রোদ যেমন অন্ধকার ঘরকে আলোয় ভরিয়ে দেয়, নিয়াজের জীবনেও তেমনি এসেছিলেন সুমি।
সুমি প্রায়ই নিয়াজের দোকানে আসতো পুরনো উপন্যাসের খোঁজে। কখনো নীল রঙের শাড়ি পরে, কখনো বা সাধারণ একটা কামিজ জড়িয়ে। সুমির একজোড়া মায়াবী চোখ আর সহজ সরল হাসি নিয়াজের একঘেয়ে জীবনে এক নতুন সুর তৈরি করেছিল। নিয়াজ কোনোদিন মুখে কিছু বলতে পারেনি, কিন্তু প্রতিবার সুমি আসার আগে তার প্রিয় বকুল ফুল কুড়িয়ে এনে টেবিলের এক কোণে জমিয়ে রাখতো। সুমি দোকানে ঢুকলেই বলতো, "বাহ নিয়াজ ভাই, আজকেও বকুলের সুবাস!"
নিয়াজ শুধু হাসতো। মনের গভীরে হাজারো শব্দ জমা হয়ে থাকতো, কিন্তু প্রকাশের সাহসটুকু ছিল না। সে ভাবতো, একটা ছোট দোকানের সামান্য আয়ে নিজের জীবনটাই যেখানে অনিশ্চিত, সেখানে সুমিকে কোনো স্বপ্নের কথা বলা স্রেফ বোকামি।
দিন কাটছিল এভাবেই। নিয়াজ অপেক্ষায় থাকতো আর সুমি আসতো। কিন্তু হঠাৎ করেই একদিন সুমির আসা বন্ধ হয়ে গেল। এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ, দেখতে দেখতে এক মাস কেটে গেল। নিয়াজের বুকস্টলের টেবিলের বকুল ফুলগুলো রোজ শুকিয়ে কালো হয়ে যেত, আর নিয়াজ সেগুলো ফেলে দিয়ে পরদিন আবার নতুন ফুল রাখতো। কিন্তু সেই চেনা হাসিমুখের আর দেখা নেই।
প্রায় দুই মাস পর, একদিন বিকেলে নিয়াজের দোকানে একজন মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা এলেন। সুমির মা। নিয়াজকে চিনতে উনার একটুও সময় লাগেনি। নিয়াজের হাতে একটা ডায়েরি আর একটা ছোট নীল খাম তুলে দিয়ে উনি কেঁদে ফেললেন।
উনি জানালেন, সুমি দীর্ঘদিন ধরে একটা মরণব্যাধিতে আক্রান্ত ছিল। ও জানতো ওর সময় ফুরিয়ে আসছে, তাই শেষ দিনগুলো ও নিজের মতো করে কাটাতে চেয়েছিল। নিয়াজের দোকানে এসে বই পড়ার বাহানায় ও আসলে একটু শান্তি খুঁজতো।
ভদ্রমহিলা চলে যাওয়ার পর নিয়াজ কাঁপতে কাঁপতে নীল খামটা খুলল। ভেতরে সুমির হাতের লেখায় ছোট্ট একটা চিঠি:
"নিয়াজ ভাই,
আমি জানতাম আপনি রোজ আমার জন্য বকুল ফুল জমিয়ে রাখতেন। বলতে পারেননি, কিন্তু আপনার নীরবতা সব বলে দিত। আপনার ওই ছোট দোকানটা আর বকুল ফুলের সুবাস আমাকে বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছে জাগাতো। আমার সময় শেষ, তাই চলে যেতে হলো না বলেই। যদি কখনো মনে পড়ে, একমুঠো শুকনো বকুল বাতাসে উড়িয়ে দিয়েন। ভালো থাকবেন।"
বিকেলের ম্লান আলোয় নিয়াজ স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। চোখের পানি টপ টপ করে চিঠিটার ওপর পড়তে লাগল। দোকানের টেবিলের ওপর তখনো পড়ে আছে একমুঠো তাজা বকুল, কিন্তু সেই সুবাস নেওয়ার মানুষটি আজ আর এই পৃথিবীতে নেই। নিয়াজ বুঝল, কিছু গল্প শেষ হয়েও শেষ হয় না, শুধু বুকের ভেতর আজীবন এক নীরব দীর্ঘশ্বাস হয়ে থেকে যায়।