12/10/2025
✨ হারিয়ে যাওয়া পালকি – একসময়ের ঢাকা ও বাংলার যাতায়াত ঐতিহ্য ||
এক সময় ঢাকার রাস্তায় যখন রিকশা, বাস, কিংবা গাড়ির নামগন্ধও ছিল না—
তখন বাঙালির সম্মান, ভালোবাসা, আর আভিজাত্যের প্রতীক ছিল একটিমাত্র বাহন — “পালকি”।
পালকির দুলুনিতে বেজে উঠত রাজকীয় ছন্দ,
যেখানে বসে থাকতেন নবাব পরিবারের বেগম, জমিদারবাড়ির কন্যা কিংবা কোনো নববধূ।
ঢাকার সরু গলি, নবাবপুর, লালবাগ কিংবা চৌকবাজারে প্রতিদিনই দেখা যেত পালকির চলাচল।
---
🕌 মুঘল আমলে পালকি
বাংলায় পালকির প্রচলন শুরু হয় প্রায় ১৫শ শতকে।
মুঘল আমলে ঢাকার অভিজাত পরিবারগুলোর নারীরা বাইরে যেতেন কেবল পালকিতে চড়ে।
তখন পালকি ছিল নারীর পর্দার আড়ালে থেকেও সমাজে চলাফেরার একমাত্র উপায়।
নবাব পরিবারের বেগমেরা বাজার, আত্মীয়ের বাড়ি কিংবা ঈদের নামাজে যাওয়ার সময়ও চড়তেন সেই রেশম-মখমল মোড়ানো পালকিতে।
রবীন্দ্রনাথও লিখেছিলেন —
---
👑 নবাবি আমলে পালকি
ঢাকা যখন নবাবদের রাজত্বকেন্দ্র, তখন পালকি হয়ে ওঠে সম্মান ও শ্রেণির প্রতীক।
নবাবদের পালকিগুলো বিশেষভাবে তৈরি হতো—
কখনও মখমলে মোড়ানো, কখনও রেশমে সেলাই করা।
চারজন বলিষ্ঠ বাহক কাঁধে তুলে যাত্রা শুরু করতেন,
আর পথজুড়ে মানুষ তাকিয়ে থাকত বিস্ময়ে।
---
🇬🇧 ব্রিটিশ আমলে পালকি
ব্রিটিশ আমলেও পালকি ছিল বাঙালির জীবনের অংশ।
তবে ধীরে ধীরে ঘোড়ার গাড়ি, ট্রলি ও রিকশা শহরে জায়গা নিতে শুরু করে।
তবু অভিজাত পরিবার, জমিদার বাড়ি কিংবা বিয়ের শোভাযাত্রায় পালকি ছিল অপরিহার্য।
---
🇵🇰 পাকিস্তান আমল থেকে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়
১৯৪৭ সালের পরও বাংলার গ্রামে কনের গৃহে প্রবেশ মানেই ছিল পালকির যাত্রা।
চার-পাঁচজন পালকীবাহক কাঁধে তুলে গান গাইতে গাইতে নিয়ে যেত নববধূকে।
এমনকি স্বাধীনতার পরও বাংলার গ্রামাঞ্চলে দেখা যেত এই পালকি। বাংলার গ্রামাঞ্চলে পালকি ছাড়া বিয়ে বাড়ি যেন অসম্পূর্ণ রয়ে যেত ||
এ দৃশ্য ছিল গ্রামের আনন্দ ও আবেগের প্রতীক।
কিন্তু সময় বদলেছে…
পাকা রাস্তা, রিকশা, ভ্যান, মোটরযান আসার পর পালকির দরকার ফুরিয়ে যায়।
এখন পালকি শুধু ইতিহাসের প্রদর্শনী বা বিয়ের সাজের অংশ—একটা স্মৃতি মাত্র।
---
📜 পালকির শুরুর ইতিহাস
একসময় ঘোড়া কিংবা গাড়ি নয় — বাঙালির গর্ব, সম্মান আর ভালোবাসার প্রতীক ছিল একখানা “পালকি”।
পালকির দুলুনি মানেই ছিল এক রাজকীয় ছোঁয়া… নবাবের স্ত্রী, জমিদার বাড়ির কন্যা কিংবা নববধূ — সবার স্বপ্ন ছিল একটুখানি পালকিতে চড়ে পথ পাড়ি দেওয়ার।
কিন্তু জানো কি, এই পালকি আসলে বাংলার সৃষ্টি নয়!
প্রথম পালকির প্রচলন হয় প্রাচীন জাপান ও চীনে, যেখানে রাজা-রাজড়ারা দূরযাত্রায় বিশ্রামের জন্য মানুষ দিয়ে বহন করাতেন একধরনের চেয়ার।
সেই ধারণাটিই পরে "পালকি" হয়ে আসে ভারতবর্ষে — মুঘল আমলে। আর ব্রিটিশ শাসনামলে এশিয়ার প্রতিটি প্রদেশে পালকি হয়ে ওঠে এক অপরিহার্য যানবাহন।
বাংলাদেশে পালকির ইতিহাস বেশ প্রাচীন।
ঢাকায় তখন ঘোড়ার গাড়ির চেয়ে বেশি দেখা যেত পালকি।
বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া কাঁচা পথ, কাদামাখা গলি, নবাবপুর–চৌকবাজার–লালবাগের সরু রাস্তা — সবখানেই চলত সেই দুলে দুলে পালকি।
জমিদারবাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে থাকত চারজন বলশালী বাহক, হাতে বাঁশের কাঁধে তোলা কাঠের পালকি। ভিতরে বসে থাকতেন নবাবজাদা কিংবা কোনো গৃহবধূ।
পালকি ছিল শুধু যান নয় —
এটা ছিল “সম্মানের প্রতীক”,
একজন নারীর “পরদার ভেতরের স্বাধীনতা”,
একজন পুরুষের “সম্ভ্রান্ততার প্রকাশ”।
আর ধীরে ধীরে পালকি ঢুকে পড়ে বাঙালির গান, কবিতা ও লোককথায়।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন —
> “দুল দুল দুল পালকি চলে, পালকিতে বউ চলে…”
এই গানটি শুধু শব্দ নয় — একসময়ের বাস্তব ছবি।
---
🕰️
আজকের তরুণ প্রজন্ম হয়তো কখনো পালকি দেখেইনি—
কিন্তু একসময় এর দুলুনির ছন্দেই বাঙালির জীবন চলত।
পালকি শুধু বাহন নয়,
এটা ছিল ভালোবাসা, সামাজিক মর্যাদা আর বাঙালির সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক।
যখন কোনো পুরনো ছবিতে দেখি একটি পালকি…
মনে হয়, যেন শুনতে পাচ্ছি সেই পুরনো ঢাকার গলিতে ডাক—
> “চল মেমসাহেব, পালকি রেডি আছে!”
💔 পালকি হারিয়ে গেছে, কিন্তু এর দুলুনি আজও বাজে ইতিহাসের অন্তরালে।
___________________________________
✍️ লেখা: মোঃ নাঈম ভুইয়া
📘 এডমিন: ঢাকার গণপরিবহন
#ঢাকারগনপরিবহন #নাঈম #পালকিরইতিহাস
#হারিয়ে_যাওয়া_পালকি
#বাংলার_ঐতিহ্য
#নবাবি_আমল
#বাংলার_বিয়ে
#ঢাকারগণপরিবহন