02/05/2026
জন্মের মাত্র ২১ দিনের মাথায় মা চলে গিয়েছিলেন অন্যত্র। দুই বছর পেরোতেই এবার বাবাকেও হারাল শিশুটি। ‘গুজবে’র বলি হয়ে জনতার পিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন বাবা হান্নান শেখ। ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর ইউনিয়নের সাতৈর গ্রামের ২৫ মাস বয়সী ছোট্ট শিশু মুসলিমা ইসলাম এখন পুরোপুরি এতিম। তার আশ্রয়ের শেষ ভরসা এখন বৃদ্ধ দাদা-দাদি।
শনিবার (২ মে) বিকেলে নিহত ট্রাকচালক হান্নান শেখের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। বাড়িতে শোকের মাতম, স্বজনদের কান্নার রোল আর মানুষের ভিড়ের মধ্যেও অবুঝ শিশু মুসলিমা কখনো দাদির কোলে, কখনো অন্যের কোলে ঘুরছে। মাঝেমধ্যেই ফিডারে দুধ খেতে খেতে হঠাৎ গুমরে কেঁদে উঠছে সে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, মুসলিমার মা আরিফা বেগম মেয়ের জন্মের ২১ দিন পরই স্বামী হান্নানকে ডিভোর্স দিয়ে অন্যত্র চলে যান। এরপর থেকে দাদা শাহিদ শেখ ও দাদি নার্গিস বেগমই তাকে আগলে রাখছিলেন। দাদি নার্গিস বেগম বিলাপ করতে করতে বলছিলেন, ‘মা ২১ দিনেই চলে গেছে, এখন বাপও নাই। আমার মুসলিমার কেউ রইল না। আমি মরে গেলে এই বাচ্চার কী হবে?’
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাত সাড়ে আটটার দিকে নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের বিলনালিয়া এলাকায় হান্নানের ট্রাকটি কয়েকজন পথচারীকে ধাক্কা দিয়েছে—এমন একটি খবর ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই গুজব রটে যায় যে, ট্রাকটি ২০ জনকে চাপা দিয়েছে। এতে উত্তেজিত জনতা ইট-ব্লক ফেলে রাস্তা অবরোধ করে ট্রাকটি থামায়। চালক হান্নান শেখকে (৪৫) নামিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরিবারের অভিযোগ, গুজব ছড়িয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে হান্নানকে। নিহতের বাবা শাহিদ শেখের প্রশ্ন, ‘আমার ছেলে সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিল। সে অপরাধ করে থাকলে আইনের হাতে তুলে দেয়া যেত। কিন্তু গুজব ছড়িয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো কেন? এখন এই বাচ্চার ভবিষ্যৎ কী?’
নগরকান্দা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মাহমুদুল হাসান জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আহতদের হাসপাতালে পাঠায়। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ট্রাকের দুই হেলপার নাঈম (২২) ও আল-আমিন (২৫) আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া স্থানীয় অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বেপরোয়া গতির অভিযোগ থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা বিপজ্জনক। মা-বাবাহীন ছোট্ট মুসলিমার অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে শিশুটির জন্য সরকারি ও সামাজিক সহায়তার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।