25/07/2025
হযরত হোসাইন (رضي الله عنه)'র জন্ম ও শাহাদত
শহীদদের সর্দার, জান্নাতী যুবকদের সর্দার, ফাতিমা (رضي الله عنه)'র কলিজার টুকরা হযরত আলী (رضي الله عنه)'র নয়নমণি, রাসূল (ﷺ)'র প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হোসাইন (رضي الله عنه) মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরি চতুর্থ সালে ৫ শা'বান জন্মলাভ করেন। রাসূল (ﷺ) তাঁর কানে আযান দেন, মুখে লালা মোবারক লাগিয়ে দিয়ে তাঁর জন্য দোয়া করেন এবং সপ্তম দিন তাঁর নাম রাখেন আর আকীকা করেন। নাম হোসাইন, উপনাম আবু আব্দুল্লাহ, উপাধি "সিবতে রাসূল (ﷺ)" ও "রায়হানে রাসূল (ﷺ)"। হাদিস শরীফে আছে, নবী করীম এরশাদ করেন, হযরত হারুন (عليه السلام) তাঁর সন্তানদের নাম রাখেন শিব্বির ও শাব্বির আর আমি আমার সন্তানদের নাম রাখলাম তাদেরই নামে হাসান ও হোসাইন
এ কারণে এদেরকে শিব্বির ও শাব্বির নামেও ডাকা হয়। কেননা শব্দ দু'টি সুরিয়ানী ভাষা। আরবীতে এর অর্থ হয় হাসান ও হোসাইন। হাদিস শরীফে আছে-
الحسن والحسين اسمان من اهل الجنة
হাসান ও হোসাইন জান্নাতীদের দু'টি নাম। আরবের জাহেলী যুগে এ নাম দু'টি ছিলনা।
হযরত উম্মে ফজল বিনতে হারিস (رضي الله عنه) যিনি রাসূল (ﷺ)'র চাচী এবং হযরত আব্বাস ইবনে আব্দুল মোত্তালিবের স্ত্রী ছিলেন। তিনি একদিন রাসূল (ﷺ)'র খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করলেন, ইয়া রাসূল (ﷺ)াল্লাহ! আজ আমি এমন এক স্বপ্ন দেখেছি, যাতে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছি। রাসুল বললেন, আপনি কি স্বপ্ন দেখেছেন? তিনি বললেন, এমন কঠিন স্বপ্ন দেখেছি যা বর্ণনা করতে সাহস পাচ্ছিনা। তিনি বললেন, নির্বিঘ্নে বলুন। উম্মে ফজল (رضي الله عنه) বললেন, আমি স্বপ্নে দেখলাম যে, আপনার শরীর মোবারক থেকে গোশত কেটে আমার কোলে রাখা হয়েছে। রাসূল (ﷺ) এরশাদ করেন-
رأيت خيرا تلد فاطمة ان شاء الله غلاما يكون في حجرك
আপনি উত্তম স্বপ্ন দেখেছেন, ইনশাল্লাহ, ফাতিমা একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করবে আর সে সর্বপ্রথম আপনার কোলেই হবে। অতএব ঠিক এরূপই হয়েছে। ৬২
৬১. ইবনে হাজার মক্কী (رحمة الله) (৯৭৪হি) আস সাওয়ায়েকে মুহাররকাহ, পৃ:-১১৮
৬২. শেখ ওয়ালী উদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ (৭৪০হি), মিশকাত শরীফ, পৃঃ-৫৭২
ইমাম হোসাইন (رضي الله عنه) জন্মলাভের সাথে সাথেই তাঁর শাহাদতের সুসংবাদ এমনকি কোথায় বা কোন স্থানে কিভাবে শাহাদত বরণ করবেন তাও সকলের নিকট প্রসিদ্ধ হয়ে পড়েছিল। হযরত উম্মে ফজল বিনতে হারিস (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত, হোসাইন (رضي الله عنه)'র জন্মলাভ সম্পর্কিত হাদিসের শেষ ভাগে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি (উম্মে ফজল) বলেন, একদিন আমি নবী করিম'র খেদমতে হাযির হয়ে ইমাম হোসাইনকে তাঁর কোলে দিলাম। তারপর দেখলাম যে, তাঁর দুচোখ বেয়ে লাগাতার অশ্রুজল প্রবাহিত হচ্ছে। আমি আরয করলাম, ইয়া রাসূল (ﷺ)াল্লাহ! আমার মাতা-পিতা আপনার উপর উৎসর্গ হোক, আপনার একি অবস্থা? অর্থাৎ আপনি এভাবে অঝোর নয়নে কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন-
اتانى جبرئيل عليه السلام فاخبرني ان أمتى ستقتل ابني فقلت هذا قال نعم واتاني - بتربة من تربته حمراء
আমার নিকট জিব্রাইল (عليه السلام) এসে সংবাদ দিলেন যে, আমার উম্মত আমার এই সন্তানকে শহীদ করবে। আমি বললাম, একেই কি শহীদ করবে? জিব্রাইল (عليه السلام) বললেন, হ্যাঁ, একেই শহীদ করবে। অতঃপর জিব্রাইল (عليه السلام) হোসাইনের শাহাদত স্থলের লাল রঙের মাটিও আমার নিকট এনেছেন।৬৩
ইমাম বায়হাকী (رحمة الله) দালায়েলুন নবুয়্যত গ্রন্থে এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (رحمة الله) স্বীয় মুসনদে হযরত ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রাসূল (ﷺ)কে একদিন ঠিক দুপুর বেলায় ঘুম থেকে জাগ্রত অবস্থায় দেখেছি। এ সময় তাঁর চুল মোবারক ছিল এলোমেলো ও বিক্ষিপ্ত এবং ধুলি-বালি মিশ্রিত। আর তাঁর হাত মোবারকে ছিল একটি শিশির যার মধ্যে ছিল তাজা রক্ত। আমি বললাম, ইয়া রাসূল (ﷺ)াল্লাহ! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক, আপনার হাতে এটি কি?
هذا دم الحسين واصحابه ولم ازل النقطة منذ اليوم فأحصى ذالك الوقت فاجد قتل ذالك الوقت
এটি হযরত হোসাইন ও তার সাথীদের রক্ত যা আমি ঐ দিন সংগ্রহ করেছি। ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) বলেন, আমি ঐ (স্বপ্নের) সময়কে হিসেব করে দেখছি যে, ঐ সময়ই হযরত হোসাইন (رضي الله عنه) কে শহীদ করা হয়েছে। ৬৪
৬৩. শেখ ওয়ালী উদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ (رحمة الله), (৭৪০হি), মিশকাত শরীফ, পৃঃ-৫৭২
৬৪. শেখ ওয়ালী উদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ (رحمة الله) (৭৪০হি), মিশকাত শরীফ, পৃঃ-৫৭২
হযরত আনাস (رضي الله عنه) থেকে বর্ণিত, বৃষ্টির দায়িত্ববান ফেরেশতা আল্লাহর অনুমতিক্রমে একদিন রাসূল (ﷺ)'র সাক্ষাতে আসেন। এ সময় হযরত হোসাইন (رضي الله عنه) এসে রাসূল (ﷺ)'র কোলে বসে গেলেন। তখন তিনি তাঁকে চুমু খেয়ে আদর করতে লাগলেন। ফেরেশ্তা আরয করলেন, ইয়া রাসূল (ﷺ)াল্লাহ! আপনি কি হোসাইনকে খুব ভালবাসেন? উত্তরে তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন ফেরেশতা বললেন
ان امتك ستقتله
আপনার উম্মত তাঁকে অচিরেই শহীদ করবে। যদি আপনি চান তবে তাঁর শাহাদত স্থলের মাটি আপনাকে দেখাতে পারি। অতঃপর ফেরেশ্তা এক মুষ্টি লাল রঙের মাটি এনে দিয়েছেন যা হযরত উম্মে সালমা (رضي الله عنه) স্বীয় কাপড়ে নিয়ে নিলেন। অপর এক বর্ণনায় আছে, রাসূল (ﷺ) বললেন, হে উম্মে সালমা! যখন এই মাটি রক্তে পরিণত হবে তখন বুঝবে আমার সন্তান হোসাইনকে শহীদ করা হয়েছে। হযরত উম্মে সালমা (رضي الله عنه) বলেন, আমি ঐ মাটিগুলোকে একটি শিশিরে ভরে যত্ম করে রেখে দিয়েছি যা হযরত হোসাইন (رضي الله عنه)'র শাহাদতের দিন রক্তে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। ৬৫
জামেউল উসূল গ্রন্থে তিরমিযী শরীফের হাদিসে বর্ণিত আছে যে, একজন আনসারী মহিলা সালমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদিন হযরত উম্মে সালমা (رضي الله عنه)'র খেদমতে উপস্থিত হয়ে দেখি তিনি কান্নাকাটি করছেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেন, আমি এই মাত্র স্বপ্নে রাসূল (ﷺ) কে কাঁদতে দেখলাম, তাঁর দাড়ি ও চুল মোবারক ধুলি-বালি মিশ্রিত ছিল। তাঁর এ অবস্থা দেখে জিজ্ঞাসা করলাম, ইয়া রাসূল আল্লাহ! (ﷺ) আপনি কাঁদছেন কেন? উত্তরে তিনি বললেন, আমি এখনই হোসাইনকে শহীদ হতে দেখছি।৬৬
৬৫. ইবনে হাজার মক্কী (رحمة الله) (৯৭৪হি.), আস সাওয়ায়েকে মুহাররকাহ, পৃঃ-১১৮
৬৬. শেখ আব্দুল হক মুহাদ্দিস (رحمة الله) (১০৫২হি.), মা ছাবাতা বিস্সুন্নাহ উর্দু পূঃ- ৩২