19/08/2026
৪৫০ বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ বাশঁখালীর বখশী হামিদ মসজিদ।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর মধ্য ইলশায় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী বখশী হামিদ মসজিদ। শতবর্ষী এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছে ইট, পাথর ও সুরকি ব্যবহার করে। এই মসজিদটির নির্মাণ কৌশলের সাথে ঢাকার শায়েস্তা খান (আনুঃ ১৬৬৪ খৃঃ) মসজিদ এবং নারায়নগঞ্জের বিবি মরিয়ম মসজিদের (আনুঃ ১৬৮০ খৃঃ) মিল লক্ষ্য করা যায়।
মসজিদে রক্ষিত ফলকে আরবিতে লেখা আছে—‘বনাল মাসজিদুল মোকারেম ফি আহমিদ-মুলক, ইসনাদুল মিলাত ওয়াদ্দিন সুলতানুল মুয়াজ্জাম সুলাইমান (কররানি) সালামালাহু আনিল ওয়াফাত ওয়াল বলিয়্যাতি মুরেখাত তিসযু রমজান, খামছুন ও সাবয়িনা ওয়া তিসআতু মিআত হিজরি আলাইহিস সালাম।’
অর্থাত্ এই মসজিদ নির্মাণ হয়েছে সেই বাদশাহর যুগে যাকে উপাধি দেয়া হয়েছে দ্বীন এবং মিল্লাতের সুলতানুল মুয়াজ্জম তথা মহান সম্রাট, আর তিনি হলেন সুলাইমান কররানি (আল্লাহ তাকে বিপদাপদ থেকে মুক্ত রাখুন), তারিখ ৯৭৫ হিজরি সালের ৯ রমজান। যার ইংরেজি সাল ১৫৬৮ সালের ৯ মার্চের সঙ্গে মিলে যায়। শিলালিপির বক্তব্য মতে, এটি সুলাইমান কররানি কর্তৃক প্রতিষ্ঠা করার কথা থাকলেও লোকমুখে বখশী হামিদের নির্মিত মসজিদ বলে পরিচিত।
স্থানীয় মুরববীরা বলেন, বখশী হামিদের পুরো নাম মুহাম্মদ আবদুল হামিদ, বখশী তার উপাধি। বখশী ফার্সি শব্দ। এর অর্থ কালেক্টর বা করগ্রহীতা। তৎকালীন সময়ে বখশী হামিদ এতদাঞ্চলের কালেক্টর তথা প্রশাসক ছিলেন। তিনি এলাকার শিক্ষা, সভ্যতা, সংস্কৃতির ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন।
জনশ্রুতি অনুসারে তৎকালীন সময়ে এ এলাকায় প্যারাবন ছিল। ঝোঁপঝাড়ে জনবসতি ছিল না। ইউসুফ ও কুতুব নামে গৌড়ের দুজন আমির শাহ আবদুল করিম নামক জনৈক সুফীর সঙ্গে গৌড় ছেলে উপযুক্ত বাসস্থানের সন্ধানে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে বাঁশখালী এ জায়গায় অবতরণ করেন।
তারা উপকরণ নিয়ে বাঁশখালীর ইলশার দরগাহ বাড়ির স্থানে পৌঁছলে শাহ সাহেব ইল্লাল্লাহ শব্দ উচ্চারণ করে তার ছড়ি পুঁতে রাখেন এবং সেখানে বসবাসের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। এ সময় থেকে স্থানটি ইল্লাল্লাহ শাহের স্থান এবং পরে ইলশায় রূপান্তরিত হয়। বখশী আবদুল হামিদ উক্ত শাহ্ শাহের অধস্তন বংশধর। কেউ কেউ মনে করেন গৌড় থেকে আগত সুফী দরবেশের মধ্যে একজন ছিলেন সুলাইমান। তিনি নেতৃস্থানীয়ও সাধক ছিলেন। জ্ঞানেগুণে অসাধারণ বিচক্ষণ ও প্রভাবশালী ছিলেন।
সবাই তাকে সুলতান বলে ডাকত। তিনি এ মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন এবং পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের পর মুরববীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনার্থে একমাত্র কন্যাটি উপজেলার জলদী গ্রামে বিয়ে দেয়া হয়। তার দুই ভাই ছিল। বর্তমানে তাদের মাটি খুঁড়লে এখনও প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায়।
অলি বুজুর্গের আবাদকৃত এ গ্রামে বহু দ্বীনদার পীর মাশায়েখের আবির্ভাব হয়েছিল। তম্মধ্যে শাহ চান মোল্লা অন্যতম। তিনি এ মসজিদ নির্মাণের সমসাময়িক যুগের বলে অনেকের ধারণা।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৫ সালে এটি প্রটেকটেড মনুমেন্ট এন্ড মৌন্ডস ইন বাংলাদেশ এর তালিকায় স্থান পাওয়ায় কিছু সংস্কার হয়েছে। মোঘল স্থাপত্য কৌশলে নির্মিত এ মসজিদটি তিন গম্বুজবিশিষ্ট, মাঝেরটি অপেক্ষাকৃত বড় এবং ছোট গম্বুজ দুটি ধনুকের মতো করে ছাদের সঙ্গে যুক্ত।
মসজিদের পূর্ব পার্শ্বে প্রাচীন কালের সান বাঁধানো একটি সু – বিশাল পুকুর রয়েছে, পুকুরে মাছ চাষ করা হয় এবং পানি ব্যবহার করে মুসল্লিরা অজু করে।
মসজিদের পশ্চিমে কবরস্হান পূর্বে উত্তরে গড়ে উঠেছে সু বিশাল মাদ্রাসা ও এতিমখানা সহ ইসলামী কমপ্লেক্স। এ কমপ্লেক্সের নাম রাখা হয় দারুল কোরআন মুহাম্মদিয়া শাহ আব্দুল হামিদ মাদ্রাসা ও এতিমখানা।
প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজ আদায় করার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে হাজার হাজার ধর্মপ্রান মুসল্লি সমাবেত হয় এই মসজিদে।
#বখশী_হামিদ_মসজিদ #বাঁশখালী #চট্টগ্রাম #বাঁশখালীর_ইতিহাস #বাঁশখালীর_ঐতিহ্য #ঐতিহাসিক_মসজিদ #প্রাচীন_মসজিদ ের_ইতিহাস #ইসলামী_স্থাপত্য #মুঘল_স্থাপত্য #বাংলাদেশের_ঐতিহ্য #বাংলাদেশের_ইতিহাস #ঐতিহাসিক_স্থাপনা #ইসলামের_ইতিহাস #মসজিদ #ইসলামী_ঐতিহ্য