21/06/2026
তাকফীর নিয়ে বিভ্রান্তি ও সমাধান
تكفير
এর মূল ধাতু ك ف ر।
এর শাব্দিক অর্থ হলো ঢেকে দেওয়া,আচ্ছাদিত করা,
গোপন করা।
এ কারণেই কৃষককে কখনো কখনো كافر বলা হয়;
কারণ সে বীজকে মাটির নিচে ঢেকে দেয়।
পারিভাষিক অর্থ
ইসলামী আকীদা ও ফিকহের পরিভাষায় تكفير বলতে বোঝায়—
কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট ব্যক্তির কথা, কাজ বা কারণে তাকে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে বলে "কাফির" হওয়ার হুকুম দেওয়া।
আরবিতে বলা হয়:
الحكم على شخصٍ معيَّنٍ بالكفر، أو نسبة الكفر إليه بسبب قولٍ أو فعلٍ أو اعتقادٍ يقتضي الكفر.
অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি এমন কথা, কাজ বা বিশ্বাস গ্রহণ করেছে যা কুফর সাব্যস্ত করে—এ মর্মে তার ওপর কুফরের বিধান আরোপ করাকেই তাকফীর বলা হয়।
জানার বিষয় হল, তাকফীর করা যায় কিনা? বা কখন এবং কে করবে?
আসুন আমরা পর্যালোচনা করি।
প্রথম কথা হল ইসলাম বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি মুক্ত একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বীন।
আর তাকফীর এটাও জরুরীয়াতে দিনের একটি অংশ, কিভাবে তা পরে আলোচনা করছি।
তাই তাকফীরের বিষয়ে ও সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে, যখন তখন তাকফীর করাও যেমন যায় না ঠিক তেমনি প্রয়োজনে তাকফীর না করাও দ্বীন ইসলামের জন্য ক্ষতির কারণ হিসেবে দেখা দিবে। কেননা যদি কেউ কুফরি আকিদা লালন করে তাকে যদি তাকফির করা না হয় তাহলে সে কখনো সতর্ক হবে না। আর তার হেদায়েতের পথ ও সুগম হবে না! সাথে সাথে সে যদি অনুসরণীয় ব্যক্তি হয় তাহলে সাধারণ মানুষ তার বিশ্বাসে বিশ্বাসী হওয়ার কারণে ঈমান হারা হবে! তাকফির করার উদ্দেশ্য হলো প্রথমত তাকে সতর্ক করা। সাথে সাথে তার থেকে অন্যকে সতর্ক করা ।যাতে সাধারণ মানুষের ইমান আকিদা নিরাপদ থাকে ।
দ্বিতীয় কথা হল তাকফীর কখন করবে?
তাকফীর করতে হলে নিম্নে বর্ণিত পাঁচটি উসুলের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে
(১) যে কথা বা কাজের উপর তাকফীর করা হচ্ছে তাহা যে কুফর তা কোরআন হাদিস থেকে সন্দেহাতিকভাবে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হতে হবে।
(২) তাকফির করার আগে তার কাছে সঠিক ও হক কথাটি পৌঁছাতে হবে। অজ্ঞতাবশত করত বা ভুলের কারণে কাউকে তাকফীর করা যাবে না।
(৩) যে ব্যক্তি কুফরে কাজ বা কথা বলেছে তার নিয়ত ও যাচাই করতে হবে , অনিচ্ছায় বা ভুলে বা না জানার কারণে বলে থাকলে তাকফির করা যাবে না।
(৪) এজতেহাদী মাসালা বা যে বিষয়ে বিজ্ঞ ইমামদের মতানৈক্য রয়েছে সে সমস্ত বিষয়ে তাকফীর করা যাবে না। তাকফীর করা যায় মতানৈক্য হীন قطعی বিষয়ে।
(৫) কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে কাফির সাব্যস্ত করা অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। এটি বিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের এবং শরয়ী বিচারিক কর্তৃপক্ষের কাজ। সাধারণ মুসলমান বা যে-কোনো আলেম/ ব্যক্তির জন্য কারো ওপর কুফরের ফতোয়া দেওয়া বড় ধরনের অনুমতিহীন কাজ; তা করা উচিত নয়।
এখন কথা হচ্ছে خیر القرون তথা স্বর্ণ যুগেও কি কাউকে তাকফীর করা হয়েছিল? আসুন দেখা যাক!
সর্বপ্রথম রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেরাজের পর যারা মেরাজ অস্বীকার করেছিল তাদেরকে মুরতাদ হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল!
দ্বিতীয়ত , জঙ্গে ইয়েমামা সংগঠিত হওয়ার প্রাক্কালে প্রতিপক্ষকে হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু মুরতাদ গণ্য করে হযরত খালেদ বিন ওয়ালিদকে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য পাঠিয়েছিলেন।
তৃতীয়ত, হযরত আলী রাঃ জামানাতে আব্দুল্লাহ বিন সাবা এবং তার অনুসারী যাদেরকে (সবায়ী) বলা হতো তাদেরকে মুরতাদ ঘোষণা করে তাদের অনেককে আলী রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু শাস্তি এবং হত্যা করেছিলেন।
চতুর্থ , হযরত আব্দুল্লাহ বিন ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু মা'বদ আল জোহাইনি ও তার সহযোগীদের কে মুরতাদ ঘোষণা করেছিলেন।
পঞ্চম, তবে' তাবিনের যুগে আলেমরা জোহাম বিন ছফওয়ান কে তাকফির করেছিলেন।
তেমনি ভাবে ইমাম নববী রহমাতুল্লাহি আলাইহি মুসলিমের সরাতে খাওয়ারিশদের বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন যদি তাদের কাজে বা কথায় কুফরি পাওয়া যায় তাদেরকে মুরতাদ ঘোষণা করা হবে। তেমনি ভাবে কাজী আইয়াস রহমাতুল্লাহ আলাইহি আশশেফা গ্রন্থে ৩৩৪ থেকে ৩৩৮নং পৃষ্ঠায় খাওয়ারিশদের তাকফির করার কথা উল্লেখ করেন।
এর থেকে বোঝা যায় তাকফির করা শুধু বৈধ নয় বরং প্রয়োজন।
কেউ যদি বলে হাদিসের মধ্যে এসেছে কেউ কাউকে কাফের বললে এই বলাটা তাদের দুজনের কেউ একজনের উপর অবশ্যই বর্তাবে! যাকে বলা হচ্ছে সে তেমন হলে তো ঠিক অন্যথায় যে বলবে তার গোনাহ তার দিকে ফিরে আসবে।
*আসলে যে সমস্ত হাদিসের মধ্যে তাকফির করতে নিষেধ করা হয়েছে সে সমস্ত হাদিসের উদ্দেশ্য হলো শুধুমাত্র তাড়াহুড়ো করে বা কুফরের কারণ পাওয়া না যাওয়া সত্ত্বেও তাকফীর করতে নিষেধ করা হয়েছে। আরো সহজ করে বলতে গেলে কোন মুমিনকে তাকফির করতে বারণ করা হয়েছে।
কোন কাফেরকে কাফের বলতে নিষেধ করা হয়েছে এমন কোন নস কেউ দেখাতে পারবে না।
কুফরের কারণ পাওয়া গেলে তাকফীর করতে কোন অসুবিধা আছে তা কোরআন হাদিস থেকে প্রমাণিত নয়।
তার প্রমাণ হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর হযরত হাতেব বিন বলতি'আ কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপস্থিতিতে মোনাফেক সাব্যস্ত করে হত্যা করতে উদ্যত হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতেব রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর عزر গ্রহণ করে হযরত ওমরকে এই বলে সান্ত্বনা দিলেন যে হযরত হাতেব বদরী সাহাবা আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। এ হাদিসের লক্ষ্যনীয় বিষয় হল, আল্লাহর রাসূল হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু কে একজন বদরী সাহাবাকে মোনাফেক ডাকার কারণে তিরস্কার করেননি! তার থেকে বোঝা যায় কারণ পাওয়া গেলে কুফরের দিকে নিসবত করা যায়। এরকম আরো অনেক উপমা রয়েছে।
আর ইমাম বুখারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বুখারীতে এই বলে বাব(অধ্যায়) কায়েম করছেন যে ইল্লত পাওয়া গেলে তাকফীর করাতে কোন অসুবিধা নেই।
নিকট সময়ে আকরাম নদভী'র একটি বক্তব্য কে সামনে এনে কেউ কেউ এটাই প্রমাণ করার চেষ্টা করতেছে যেন তাকফীর করাটা কোনভাবেই ইসলামে বৈধ নয়। মজার বিষয় হল তিনি আকরাম নদভী'র দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করেছেন! তিনি মুফতি সমায়েল নদভী'র ও মুফতি ইয়াসির নদভী'র, যারা দারুল উলুম নদোয়ার সমসাময়িক সূর্যসন্তান তাদের কোন বক্তব্য উপস্থাপন করেননি।
আর তিনি আকরাম নদভী'র কথাগুলা এমনভাবে প্রচার করলেন যেন কুরআন হাদিস!
আর আকরাম নদভী কাওকে তাকফীর না করাটা এটা উনার দৃষ্টিভঙ্গি, কারো ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে হালাল-হারাম প্রমাণিত হয় না!
ঐ মৌলভী
তাকফীরের বিরুদ্ধে গোজামিল পূর্ণ বক্তব্য বা লিখনির মাধ্যমে নিজের কুফরিকে লুকানোর পাঁয়তারা করতেছে বলে মনে করি।
আসলে প্রতিটা চোর চাই পুলিশের কর্মকান্ড বন্ধ হয়ে যাক যাতে নির্বিঘ্নে চুরি করতে পারে, ঠিক তেমনি এই সমস্ত পথভ্রষ্ট রা চাই প্রকৃত আলেমদের ধরা বাধা উঠে যাক যাতে তারা সহজে সাধারণ মানুষদেরকে তাদের মত হক বিচ্যুত করতে পারে। এবং তাদের বস্তা পচা যুক্তিগুলা দিয়ে সাধারণ মুসলমানদেরকে বিভ্রান্ত করতে পারে! আল্লাহ সকলকে হেফাজত করুন।