20/08/2026
মাসুদুর রহমান আদনান।
যেদিন আমার ফুফা মারা যায়, সেদিন আমি জানাজায় যেতে পারিনি। কারণ, আমার মা'কে পুলিশ বলেছিল আমাকে পেলে মাইরা ফেলবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে যখন ছাত্রলীগ টর্চার সেলে রাতভর নির্যাতন করে, তখন আমার মা বারবার কল দিচ্ছিল, ছাত্রলীগ আমার মায়ের কল রিসিভ করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। এবং বলা হয়, আমাকে মেরে ফেলবে তারা আজ।
আমার মা যখন খুব কাকুতি মিনতি একটাবার দেখতে চেয়েছিল আমাকে, তারা আমার মায়ের সেই কান্নাভরা আবদারটুকু রাখেনি। বরং এত বিভৎসভাষায় গালি দিয়েছিল, যা কোনো সভ্য মানুষের সন্তান দিতে পারে না।
আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার সহযোদ্ধা সেই গল্প জানে।
ঢাকার ওয়ারিতে যুবদল নেতা ফয়সালকে বাড়িতে না পেয়ে তার বাবাকে পিটিয়ে মেরেছিল ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা। এইতো ৩ বছর আগের ঘটনা।
পাবনায় ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাহিদুলকে বাড়িতে না পেয়ে তার বাবাকে হত্যা করেছিল লীগের গুন্ডারা।
বাংলাদেশের আজাদির সবচাইতে উচ্চকিত কণ্ঠস্বর আল্লামা সাঈদির বড়ো ছেলে রফিক বিন সাইদি মারা যাওয়ার পরে তার দাফনটুকু করতে দেয়নি বাবাকে।
মাত্র ২ ঘণ্টা প্যারোলে মুক্তি দিয়েছিল। জানাজার পরে জোর করে তাকে প্রিজন ভ্যানে তুলে দেয়।
আল্লামা সাঈদির সেদিনের “ও আল্লাহ” বলা গগনবিদারী চিৎকার এখনো কানে ভাসে।
আমার ঢাকা-০১ আসনের বর্তমান এমপি Khondaker Abu Ashfaque ভাই তার মায়ের জানাজায় আসতে পারেনি। তাকে প্যারোলে মুক্তি দেয়নি হাসিনার ফ্যাসিবাদি শাসনব্যবস্থা।
ঢাকা-০১ এর জামায়াতের এমপি প্রার্থী ব্যারিস্টার Md Nazrul Islam ভাই তার মায়ের জানাজা টা পড়ার অধিকারটুকু পায়নি। তাদেরকে আসতে দেয়া হয়নি।
আমার রুমমেট ছিলেন এক বড়ো ভাই, শিবির করতেন।
তারে দেখেছি ৩ ঈদে বাড়িতে যান নাই। বাবা যেদিন মারা গেলেন, সেদিন ঢাকা থেকে গ্রামে গিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, এই বেদনার দিনে অন্তত তারে গ্রেপ্তার করবে না পুলিশ। কিন্তু জানাজা শেষে পুলিশ তারে গ্রেপ্তার করে। রিমান্ডে তার পা ভেঙে দেয়।
ভাই এখনও স্বাভাবিক হয়ে দৌড়াতে পারেন না।
পটুয়াখালির ছাত্রনেতা নাজমুলের বাবার জানাজাতেও তাকে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখা হয়েছিল। বাবার দাফনটুকু শেষ করতে হাউমাউ করে চিৎকার করে পুলিশের কাছে হাত জোর করছিল৷ কিন্তু তাকে টেনে হিচড়ে নিয়ে যায় পুলিশ, বাবার দাফনটুকু করতে দেয়নি।
এমনকী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার আপন ভাইয়ের জানাজায় আসতে পারেনি দেশে।
এরকম হাজারটা গল্প আছে আমাদের। যেগুলো লিখতে গেলে লক্ষ পৃষ্ঠার মহাগ্রন্থে পরিণত হবে।
আমাদের জান ও জবানের অধিকার তো হাসিনা কেড়ে নিয়েছিল বটেই, বাবা মায়ের জানাজার অধিকারটুকু কেড়ে নিয়েছিল হাসিনা।
আজকে দিপুমনির মেয়ের কোর্টে দৌড়াদৌড়ি দেখে যারা সরকারকে বর্বর বলছেন, তারা গেলো ১৭ বছর বিবেকের দরজায় তালা দিয়েছিলেন। একটা কথাও বলেননি।
দিপুমনিকে ১২ ঘণ্টার প্যারোলে মুক্তি দিয়ে অবিশ্বাস্য উদারতা দেখিয়েছে সরকার। আওয়ামীলীগের আমলে কেউ ১ দিনের প্যারোলে মুক্তি পেয়েছে কিনা আমার জানা নেই।
দিপুমনির মতো একজন খুনি, জুলাইয়ের রক্ত যার হাতে লেগে আছে, তার জন্য এর চাইতে বেশি প্রত্যাশাই বরং বেইনসাফি।
এরপরেও যদি দিপুমনি ও খুনী লীগের কোনো দুঃখ থেকে থাকে, সেটুকু সহ্য করা উচিত। কারণ এই আইন তারাই তৈরি করে রেখেছিল। এগুলো তাদেরই হাতের কামাই।
নজরুল বলেছেন—
❝যুগের ধর্ম এই,
পীড়ন করিলে সে পীড়ন এসে
পীড়া দেবে তোমাকেই।❞
সংগৃহীত