26/10/2025
🌷শ্রীশ্রীরাম ঠাকুর💐
🌹💐শক্তি ও জ্ঞানের তুঙ্গ শিখরে রামঠাকুর আপন মহিমায় অধিষ্ঠিত, তাই উচ্চ নীচ, ভাল মন্দের পার্থক্য তাঁহার কাছে কিছু নাই। সন্ন্যাস আর সংসারাশ্রমের ভেদ রেখাও তাহার কাছে অবলুপ্ত। তাই দেখা যায়, নিতান্ত সাধারণ মানুষের মতো এসময়ে দিন যাপন করিতেছেন, গৃহস্থদের মধ্যে অবলীলায় করিতেছেন ঘোরাফেরা।
🌹ডিঙামাণিক গ্রামে নিজ ভবনে গিয়াও এসময়ে এক একবার তিনি উপস্থিত হন। প্রয়োজন হইলে মুমূর্ষু স্বজনদের রোগশয্যার পাশেও কল্যাণ হস্তটি প্রসারিত করিয়া তিনি দাঁড়াইয়া থাকেন। বাড়ীর জীর্ণ, পতনোন্মুখ রান্নাঘরটির হয়তো সংস্কার চলিতেছে। দেখা যায়, পরম উৎসাহে তিনি সেই কাজেই নামিয়া পড়িয়াছেন, কুষাণদের কাজের যোগান দিতেছেন। এ দৃশ্য দেখিয়া কে বলিবে যে, ইনিই সেই অপরিমেয় ঋদ্ধিসিদ্ধির অধিকারী মহাব্রহ্মজ্ঞ রামঠাকুর?
সে-বার এক ভ্রাতুষ্পুত্র তাঁহাকে জোর করিয়া চাপিয়া ধরিলেন আর এমন ঘরছাড়া বিরাগী হইয়া থাকা তাঁহার চলিবে না। এবার তাঁহাকে বিবাহ করিয়া সংসারী হইতেই হইবে, গৃহ ও আত্মপরিজনের দায়িত্ব গ্রহণ করিতে হইবে।
বাড়ীর আর সকলেও মহা উৎসাহী হইয়া উঠিলেন। সকলের এ অনুরোধ ঠাকুরকে রাখিতেই হইবে। বিবাহ না করিলে কোন মতেই এবার আর তাঁহাকে ছাড়া হইবে না। ভ্রাতুপুত্রটি তো আবেগভরে ঠাকুরের পায়ের উপরই পড়িয়া গেলেন, তাঁহার মুখের কথা না নিয়া তিনি ভূমিশয্যা ত্যাগ করিবেন না। ঠাকুরের যুক্তিতর্ক, অনুরোধ, উপরোধ সমস্ত কিছুই ব্যর্থ হইল।
🌹ঠাকুর যেন এক মহা সমস্যায় পড়িয়া গিয়াছেন। তাই তো কি করা যায়? সকলে এমন করিয়া ধরিয়াছে, এবার তো আর এড়ানো যাইবে না। অবশেষে নিরুপায় হইয়া তিনি সম্মতি দিলেন। বাড়ীর লোকদের কহিলেন, "আচ্ছা, কি আর করা যায়, এবার তবে তোমরা ভাল করে পছন্দসই কনের খোঁজ খবর কর।"
🌹কিন্তু পরক্ষণেই আবার কহিলেন, "হ্যাঁ, ভাল কথা মনে পড়েছে। কোলকাতায় কৃষ্ণবাবু নামে এক ইঞ্জিনিয়ার আছেন, তাঁর বড় ইচ্ছে, আমায় তাঁর একটি কন্যা দান করেন। আমিও কথা দিয়েছি, বিয়ে যদি করতেই হয়, তাঁর মেয়েকেই করবো। তাঁকেই বরং, এজন্য এক জরুরী চিঠি দেওয়া যাক।"
🌹সেই দিনই ব্যস্ত সমস্ত হইয়া কৃষ্ণবাবুর কন্যার পাণি গ্রহণের প্রার্থনা জানাইয়া তিনি চিঠি দিলেন। বেশ কিছুদিন কাটিয়া গেল, কিন্তু কলিকাতা হইতে কোন উত্তর আর আসিল না। ইতিমধ্যে ঠাকুরও একদিন সুযোগমত বাড়ী হইতে অন্তহিত হইলেন।
🌹মাসাধিককাল পরে কৃষ্ণবাবুর বহু প্রত্যাশিত পত্রটি পাওয়া গেল। লিখিয়াছেন, ঠাকুর কৃপা করিয়া তাঁহার কন্যাকে গ্রহণ করিবেন জানিয়া তিনি মহা আনন্দিত। তাঁহার পরম সৌভাগ্য যে তাঁহার বংশ এভাবে ধন্য হইতে যাইতেছে। আরো জানাইলেন, কলিকাতায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব হওয়ায় তিনি সপরিবারে সিমলায় আসিয়াছেন, তাই পত্র দিতে এত বিলম্ব হইল।
🌹বলা বাহুল্য, ভাবী বর ইতিপূর্ব্বেই সুযোগ বুঝিয়া কোথায় সরিয়া পড়িয়াছেন। ঠাকুরের সেদিনকার এই সুচতুর অভিনয়টি প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে শ্রীমহেন্দ্র চক্রবর্তী লিখিতেছেন--
🌹"এই বিবাহ ব্যাপারে ঠাকুর যে একটু রসিকতার অবতারণা করিয়াছিলেন, তাহা সে সময় বেশ উপভোগ্য হইয়াছিল। রাত্রিতে বিছানায় বসিয়া বিবাহের প্রসঙ্গ তিনি করিতেছিলেন। আমরা ছোট ছোট বালক হাঁ করিয়া তাঁহার কথা গিলিতেছিলাম। প্রথমতঃ তিনি, কৃষ্ণবাবু ও তাঁহার কন্যার কথা বলিলেন, কন্যাটি অতি ধর্ম্মপরায়ণা, সচ্চরিত্রা, সেও যোগ অভ্যাস করে ইত্যাদি। তারপর বিবাহের কথা-বিবাহ কলিকাতায় হইবে, আমরা তাঁহার বিবাহে বরযাত্রী হইয়া কলিকাতায় যাইব। কলিকাতা প্রকাণ্ড শহর, খুব সাবধান হইয়া চলাফেরা করিতে হয়। কৃষ্ণবাবু খুব বড়লোক, আমাদের মত তাঁহারা নোংরা থাকেন না। আমাদিগকে ভব্যসভ্য হইয়া চলিতে হইবে। আমাদের বাড়ীর ঘর দরজা, পথঘাট সব পরিষ্কার করিতে হইবে। একখানা নতুন ঘরও তৈয়ার করা আবশ্যক, ইত্যাদি কত কথাই তিনি বলিলেন।
🌹"আমরা অবোধ বালক কয়েকদিন বিবাহ বাড়ীর লুচিমণ্ডা আর আজব শহর কলিকাতার স্বপ্ন দেখিলাম। এখন বুঝিতে পারি, দাদা (ঠাকুরের অন্যতম ভ্রাতুষ্পুত্র) সেদিন কত বড় একটা হঠকারিতার পরিচয় দিয়াছিলেন। আমরা পিপীলিকার শক্তি নিয়া সেদিন অভ্রভেদী বিশালকায় অচল অটল হিমগিরিকে স্থানচ্যুত করিতে প্রয়াস পাইয়াছিলাম। ধৃষ্টতা আর কাহাকে বলে? অতঃপর বহুদিন আমরা ঠাকুরের আর কোন সংবাদ পাই নাই।"💐🌹
ক্রমশঃ
🌹জয় রাম জয় গোবিন্দ💐