13/08/2026
প্রান্তর জীবন যুদ্ধ
পর্ব–২ | বন্ধুত্বের পরীক্ষা
দোকানে কাস্টমার থাকায় প্রান্ত খেয়ালই করেনি যে রনি দোকানে এসেছে।
—বন্ধু, শুনতেছিস?
রনি ডাক দিল।
প্রান্ত কাজের ফাঁকে কে ডাকছে দেখার জন্য তাকাতেই দেখল, রনি এসেছে।
—বন্ধু, আসছিস?
এটা বলে সে রনিকে বসতে বলল।
রনির জন্য কড়া করে একটা চা বানিয়ে দিল প্রান্ত।
চা খেতে খেতে রনি বলল,
—বন্ধু, কিছু মনে করিস না। আমি তোর কাছে এখন টাকা চাইতাম না। জানি, তুই এখন খুব কষ্ট করছিস।
এগুলো বলতে বলতেই প্রান্ত বলে উঠল,
—আরে বন্ধু, এভাবে বলিস না। আমি তো জানি, আন্টির চিকিৎসার জন্য টাকা না লাগলে তুই এখন চাইতিস না।
কিন্তু রনি একটা জিনিস খেয়াল করল—কথাগুলো বলার সময় প্রান্ত মাথা নিচু করে কথা বলছে। তার দিকে তাকাচ্ছেই না।
চায়ের কাপটা রেখে রনি প্রান্তের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
—কি হয়েছে তোর? তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন?
—কই, কী হবে? কিছুই তো হয়নি।
—সত্যি করে বল, প্রান্ত। কী হয়েছে?
রনি একটু থেমে বলল,
—তুই তো কথা বলার সময় এভাবে নিচের দিকে তাকিয়ে কথা বলিস না। তাহলে আজ কেন নিচের দিকে তাকিয়ে কথা বলছিস?
প্রান্ত রনির দিকে তাকাতেই রনি দেখল—প্রান্তের চোখে জল ঝলমল করছে।
রনি আর কিছু না বলে প্রান্তের ক্যাশবক্সটা খুলে দেখল।
সব মিলিয়ে হয়তো হাজার দুয়েক টাকা হবে সেখানে।
আর সেখানে একটা কাগজ ছিল।
রনি কাগজটা হাতে নিয়ে দেখল—বৃষ্টির দেওয়া বাজারের লিস্ট।
রনি লিস্টটা নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কিরে, ভাবি বুঝি বাজার নিয়ে যেতে বলেছে?
প্রান্ত কিছুই বলতে পারছিল না।
রনি বলল,
—বন্ধু, শুন, একটা কথা বলি। আজ আমার হয়তো টাকার দরকার, হ্যাঁ, এটা ঠিক। কিন্তু তুই আমার বন্ধু। ছোটবেলা থেকে তোকে দেখে আসতেছি। তুই সবার ভালো-খারাপের সময়ে সবার আগে এগিয়ে এসেছিস।
রনি একটু থেমে বলল,
—তোর লাইফ তো এমন ছিল না। আজকের পরিস্থিতিও তো এমন হতো না, যদি না তুই পরিবারের অবাধ্য হয়ে তোর ভালোবাসার মানুষটাকে নিজের করে নিতি।
এগুলো বলতে বলতেই প্রান্তের মোবাইলটা বেজে উঠল।
বৃষ্টি কল করেছে।
প্রান্ত কলটা ধরতে পারছিল না।
রনি জিজ্ঞেস করল,
—কিরে, কল ধরছিস না কেন? কে কল করেছে?
—তোর ভাবি কল করেছে।
—তো ধরছিস না কেন? দে আমাকে দে।
রনি কলটা রিসিভ করল।
—ভাবি, ভালো আছেন? আমি রনি বলতেছি।
ও পাশ থেকে বৃষ্টি বলল,
—ভালো আছি। ভাইয়া, আপনার বন্ধু কই? ওকে একটু দেন না।
রনি প্রান্তের দিকে মোবাইলটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
—এই নে, কথা বল।
প্রান্ত মোবাইলটা নিয়ে হ্যালো বলার সঙ্গে সঙ্গেই বৃষ্টি কান্না করতে করতে বলল,
—তোমার কী হয়েছে, সত্যি করে বলতো? তুমি হাজার ব্যস্ত হলেও এই তিন মাসে একদিনও দুপুরে কল না দিয়ে থাকো না। আর আজ তুমি কল দাওনি। আমি কল দেওয়ার পরও তুমি ভালোভাবে কথা বলোনি।
—আমি জানি, তুমি আজ দুপুরে খাওনি। তুমি না বললেও আমি বুঝতে পারি।
—চারটা বছর তোমার সাথে আছি আমি। আমাকে মিথ্যা বলেও কি কখনো কিছু লুকাতে পেরেছো? আজও মিথ্যা বলছো, আমি বুঝতে পেরেছি।
প্রান্ত কিছু না বলে বৃষ্টির কথাগুলো শুনছিল।
রনি এদিকে প্রান্তের দোকানের কাজে সাহায্য করছিল।
বৃষ্টির কান্নামাখা কণ্ঠ শুনে প্রান্ত তাকে বাড়ি গিয়ে সব বলবে বলে সান্ত্বনা দিয়ে কল রেখে দিল।
রনি প্রান্তের দিকে তাকিয়ে তাকে আর কিছু বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিল না।
সে প্রান্তকে জড়িয়ে ধরল।
তারপর বলল,
—প্রান্ত, শুন। আমি আছি। তুই কখনো ভেঙে পড়বি না।
—আমার টাকা তোর এখন দিতে হবে না। আমি মায়ের চিকিৎসার জন্য টাকা ম্যানেজ করে নেব। তুই আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যাবি। আর যে টাকা আছে, ঐগুলো দিয়ে ঘরের বাজার নিয়ে যাবি।
—তুই আমার জন্য অনেক করেছিস। আমার খারাপ সময়ে তুই পাশে ছিলি। আর আজ তোর এই সময়ে আমি তোর পাশে যদি দাঁড়াতেই না পারি, তাহলে কেমন বন্ধু আমি?
—তুই আমার টাকার কথা একদম ভাববি না। তোর হাতে টাকা আসলে তখন দিবি।
রনি একটু থেমে বলল,
—আর হ্যাঁ, ভাবির সাথে কী হয়েছে, আমি জানি না। সব ঠিক করে নিবি।
—আমি আজ গেলাম।
রনি চলে যাওয়ার সময় প্রান্ত তাকে জড়িয়ে ধরে ধন্যবাদ জানাল।
কিন্তু রনি চলে যাওয়ার পর প্রান্তের সামনে তখনও একটা প্রশ্ন—বৃষ্টি কেন তাকে এতটা চিন্তিত হয়ে ফোন করেছিল?
চলবে…
পর্ব–৩: তুমিই আমার শক্তি