29/01/2026
থেকে যাওয়ার নাম ভালোবাসা
পর্ব ১:
--------
আরিফ সেদিন সকাল থেকেই অস্থির ছিল। অস্থিরতার কোনো নাটকীয় কারণ নেই—এইটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
ঘুম ভাঙার পর থেকেই মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের জীবনের ভেতর অতিথি হয়ে আছে। সব আছে, তবু কিছু নেই।
বাবা সকালে শুধু বলেছিলেন,
— “আজ ইন্টারভিউটা ঠিকমতো দিস।”
এই ঠিকমতো শব্দটার ভেতরে যে কতটা চাপ লুকানো থাকে, সেটা আরিফ ভালোই জানে।
বাসস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়ানোর পর হঠাৎ মনে হলো, আজ যদি বাসটা না আসে, তাও সে দাঁড়িয়ে থাকবে। কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই, কিন্তু কোথাও না যাওয়ারও সাহস নেই।
ঠিক তখনই সে মেয়েটাকে দেখল।
মেয়েটা ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে নেই—ভিড়টা যেন তার চারপাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, আর সে স্থির। চোখে মোবাইল নেই, কানে হেডফোন নেই। দুই হাত দিয়ে ব্যাগটা ধরে আছে, এমনভাবে, যেন ব্যাগটা না থাকলে সে ভেঙে পড়বে।
আরিফ প্রথমে তাকাল না।
পরে আবার তাকাল।
এইবার চোখ সরাতে পারল না।
বাস ঢুকতেই হুড়োহুড়ি।
একটা ধাক্কা, তারপর আরেকটা।
মেয়েটার হাত থেকে একটা মোটা ডায়েরি পড়ে গেল।
আরিফ না ভেবেই তুলে নিল।
ডায়েরির মলাটে কোনো নাম নেই, কোনো সাজানো কথা নেই—শুধু পুরোনো হয়ে যাওয়া কাগজের গন্ধ।
মেয়েটা একটু বেশি জোরে বলল,
— “ওটা দিন, প্লিজ।”
কণ্ঠে ভয় ছিল, কিন্তু কৃত্রিম না।
আরিফ ডায়েরিটা বাড়িয়ে দিল।
হাত ছোঁয়ার সময় দুজনেই একটু থমকে গেল—একেবারে অস্বস্তিকর না, আবার স্বস্তিকরও না।
ডায়েরিটা ফেরত দিতে গিয়ে পাতাটা একটু খুলে গিয়েছিল।
লেখা ছিল—
“আজও কাউকে কিছু বুঝতে দিলাম না।”
আরিফ দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।
মেয়েটা ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরল, যেন আর কোনো শব্দ বের হতে দেবে না।
বাসে উঠে দুজন আলাদা জায়গায় দাঁড়াল।
আরিফ জানালার কাঁচে নিজের মুখ দেখছিল, কিন্তু ফোকাস পড়ছিল না। কাঁচে প্রতিফলিত ভিড়ের মধ্যে বারবার সেই মেয়েটার মুখটা ভেসে উঠছিল—নিরাবেগ, তবু ক্লান্ত।
বাস চলতে শুরু করলে মেয়েটা একবার জানালার দিকে তাকাল।
আরিফ তখনই চোখ ফিরিয়ে নিল—ধরা পড়ে যাওয়ার অস্বস্তি থেকে।
নামার সময় মেয়েটা হঠাৎ পেছন থেকে বলল,
— “শুনুন…”
আরিফ ঘুরল।
— “ডায়েরিটা… আপনি না তুললে আজ আমার দিনটা খুব খারাপ হতো।”
এই কথাটা বলার পর মেয়েটা হালকা হাসল।
হাসিটা সুন্দর ছিল না—সৎ ছিল।
আরিফ কী বলবে বুঝতে পারল না।
শেষ পর্যন্ত বলল,
— “এটা তো স্বাভাবিক।”
মেয়েটা নাম বলল,
— “আমি মায়া।”
তারপর আর কিছু না বলে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।
বাসটা চলে গেলে আরিফ সিটে বসল। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ভার।
হঠাৎ খেয়াল করল—সিটের কোণে একটা কাগজ।
ভাঁজ করা।
খুলে দেখল—
“কখনো কখনো অচেনা মানুষই সবচেয়ে নিরাপদ লাগে।”
নিচে ছোট করে লেখা—
মায়া
আরিফ কাগজটা অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে রইল।
সে বুঝতে পারছিল না, এটা কি কাকতাল, না একটা ইঙ্গিত।
কিন্তু সে এটুকু বুঝেছিল—আজকের দিনটা আর আগের মতো থাকল না।
দূরে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে তার হঠাৎ মনে হলো—
ভিড়ের মধ্যে থেকেও কেউ কেউ একা থাকে,
আর কেউ কেউ এক মুহূর্তেই অচেনা কারো জীবনে ঢুকে পড়ে।
আরিফ জানত না, এই কাগজটা সে রাখবে না ফেলে দেবে।
কিন্তু পকেটে ঢোকানোর সময় হাত কাঁপেনি।
চলবে.......