20/01/2026
ছবির তিনজন অসুস্থ শিশুকে রাস্তায় ফেলে দেওয়ার ঘটনা বিগত এক মাসের। দুজন মারা গিয়েছে। এবার কিছু কথা বলি -
আপনি যদি বিয়ে করে থাকেন। সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনাও করে থাকেন তাহলে 'একটি সুস্থ সন্তানের জন্য প্রার্থনা করবেন আল্লাহ্র দরবারে।
যদি আপনি একজন অসুস্থ, হতদরিদ্র, বদমেজাজি, দয়ামায়াহীন ব্যক্তি হোন। তাহলে আপনার জন্য সন্তান না নেওয়াই উত্তম। কেন নয়! সেই প্রসঙ্গে পরে আসছি।
তবে শুধু আল্লাহ্র দরবারে প্রার্থনা করলেই হবে না। আপনার স্ত্রীর পরিচর্যা করতে হবে। গর্ভকালীন সময়ে আপনার স্ত্রীর পুষ্টিকর খাবার, প্রয়োজনীয় মেডিসিন ও চিকিৎসার এবং মানসিক সুস্বাস্থ্যের বিন্দুমাত্র অভাব যেন না হয়।
আপনার স্ত্রী কোন পরিত্যক্ত জমি নয়, যে নিজে নিজেই ঘাস লতাপাতা গজাবে। আপনার গর্ভবতী স্ত্রী এমন মূল্যবান গাছ যার সঠিক পরিচর্যা করলে সেখান থেকে একটি সুস্থ ফল পাবেন। তো আপনি স্ত্রীর সঠিক পরিচর্যা করবেন না, আবার সুস্থ সবল সন্তানও আশা করবেন। এটা আসলে সম্ভব না।
এরপরেও আল্লাহ্ না করুক! যদি আপনার একটি সুস্থ সন্তান না হয়ে থাকে। তাহলে আল্লাহ্র কাছে অভিমান না পুষে ঐ সন্তানকে একটি ভালো জীবন দেওয়ার জন্য চেষ্টা করুন।
আমার ফ্রেন্ডলিস্টে অনেক বন্ধু বান্ধব আছেন। আবার আমি কিছু ইনফ্লুয়েন্সারদেরকে ফলো করি - যাদের বেবি অটিজম কিংবা পঙ্গুত্ব নিয়ে জন্ম নিয়েছে। বিশ্বাস করুন এই মানুষগুলো এত ভালো। এত ধৈর্যশীল। এদের সন্তানগুলোকে এমন আদর যত্নে বড় করে যাচ্ছেন।
আমি অবাক হয়ে যাই, তাদের সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা ও ধৈর্য দেখে।
আমি বিশেষভাবে অবাক হয়ে যাই বাইরের দেশের অটিজম, ডিসেবল বাবুদের ডকুমেন্টারি দেখলে -
কারো সন্তানের চোখ নাই, কারো নাক নাই, হাত নাই, পা নাই। কারো সন্তানের মাছের আঁশের শরীর, কারো শুধু একটা মাংসপিণ্ড।
কথা বলতে পারে না। শব্দ করতে পারে না। অন্ধকারে কেউ দেখলে ভূত ভেবে চিৎকার করে উঠবে। তারপরেও এই সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বাবা মায়ের সে কী চেষ্টা। ঐ মুখে চুমু খাচ্ছে।
এমনও দেখেছি মিসকেরেজ হওয়া ভ্রূণকে পর্যন্ত ছোট্ট কাঁচের বোতলে রেখে বাবা মা কাঁদছে। দাফন করছে।
তখন আল্লাহ্র দরবারে মস্তক অবনত হয়ে যায়। হ্যাঁ! আল্লাহ্ আপনি আমাকে এরকম কঠিন পরীক্ষায় ফেলেননি। আপনার প্রতি শুকরিয়া। আপনি এই বাবা মায়েদের আরও ধৈর্যশীল করুন।
আমার ছেলেটা যখন গর্ভে তখন অ্যানোমালি টেস্ট যিনি করেছেন উনি একটু সন্দেহ করেন যে, বাবুর মস্তিষ্কে পানির কোন কিছু একটা বেশী। এটা ডেলিভারির আগে না কমলে একটু ইস্যু হতে পারে।
এই কথা শোনার পর আমি দুনিয়াতে নাই। ভয়ে ও আতঙ্কে কাঁদতে কাঁদতে শেষ। ছবিতে যেই মাথা বড় বাবুটা দেখতে পাচ্ছেন। সে একজন হাইড্রোসেফালাস শিশু। পরীক্ষক ঐ মহিলার কথার অর্থ এটাই বুঝিয়েছে। যদি ফ্লুয়েড না কমে, তাহলে আমার বাবুও ওরকম হতে পারে।
কিন্তু আমার ওয়াইফের ব্যক্তিগত চিকিৎসক জানিয়েছেন। চিন্তা করতে না। সত্যি বলতে, আমি বাবু হওয়ার আগ পর্যন্ত দুশ্চিন্তা করেছি। আমার মাথায় ঐ জিনিসটাই বারবার ঘুরপাক করেছে। আল্লাহ্র দরবারে একই চাওয়া চেয়েছি। হে আল্লাহ্! আমি অনেক দূর্বল মনের মানুষ। আমাকে একটি সুস্থ বাচ্চা দাও।
আল্লাহ্ আমার দোয়া কবুল করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ্। এখনও আমার সন্তানেরা একটু হাচি কাশি দিলে আমার অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। আমি সহ্য করতে পারি না।
এবার তিনটি ঘটনা শেয়ার করি -
১) আমার বন্ধু সুইডেন প্রবাসী। ওর সন্তান ৭ মাসের প্রিম্যাচিউরড জন্ম নেয়। দুই মাস হাসপাতালে স্বামী স্ত্রী অবস্থান করে। এরপর বাবু সুস্থ হওয়ার পর বাসায় গিয়েছে। এই যে, দুই মাস! ওর এক টাকাও লাগেনি।
উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টার পর্যন্ত রেডি ছিলো। যদিও পরে আর লাগেনি। সুইডেন সরকার সেই দেশের শিশুদেরকে এরকম ফেরেশতার মতো ট্রিট করে।
২) আমার আরেক বন্ধু। সে বেশ ধনী। সকালে আড্ডা দিচ্ছিলাম বাবু হবে এক মাস পর। কিন্তু না! সেদিন রাতেই ইমার্জেন্সি ভাবীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। সিজারে বাবু হলো। প্রিম্যাচিউর এই বাবুকে সুস্থ করতে ওর ৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ৭ লাখ। আলহামদুলিল্লাহ্!
৩) আমার আরেক ছোট ভাই। ওর টুইন বাবু হলো প্রিম্যাচিউর। আইসিউ লাগবে। এত টাকা ওর নেই। আমিসহ কয়েকজন ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে প্রায় ৭ লাখ টাকার মতো তুললাম। কিন্তু আল্লাহ্ হায়াত দেননি। ২০দিন পর বাচ্চা দুটো মারা যায়।
এই তিনটি গল্পে আপনি দেখতে পাচ্ছেন যে, আপনার সন্তান অসুস্থ হলে কিংবা প্রিম্যাচিউরড জন্ম নিলে। এই সন্তানের চিকিৎসার পেছনে যেই অর্থ প্রয়োজন। সেটি যদি সরকার দেয়। তাহলে আপনার কোন চিন্তাই করতে হবে না।
যদি আপনি ধনী হোন। তাহলেও আপনার চিন্তা করতে হবে না।
যদি আপনি ধার দেনা করার মতো লোক থাকে। তাহলেও আপনার চিন্তা করতে হবে না।
কিন্তু যদি একজন বাংলাদেশী এবং একজন মধ্যবিত্ত/গরীব হয়ে থাকেন। যাকে সাহায্য করার জন্য সরকার বা কোন ব্যক্তি না থাকে। আপনার জন্য ঐ সন্তানকে সুস্থ করে বাড়ি ফেরার সম্ভাবনা জিরো। আপনি অথৈ সাগরে ভেসে থাকা এক ডুবন্ত মানুষ।
যার সন্তান ঐ মূহুর্তে কোনভাবে মরে গেলে আপনি পাহাড় সমান যন্ত্রনা থেকে বেঁচে যাবেন। আপনার হৃদয় হালকা হবে। নিজেকে সান্ত্বনা দিতে পারবেন। আল্লাহর মাল আল্লাহ্ নিয়ে গিয়েছে।
বেশ স্বার্থপরের মতো বললাম। কিন্তু সত্যি। আর এই অসহায় মানুষদের সংখ্যাই বেশী। যাদের পাশে কেউ নেই।
তো এই যে, অসুস্থ সন্তান। অটিজম। এসব হওয়ার পরেও কেন উন্নত রাষ্ট্রের মানুষের সন্তানদেরকে এত ভালোবাসে, যত্নে রাখতে পারে?
এর একটাই কারণ -
সেই দেশের হেলথ কেয়ার ভাতা সুবিধা। অসুস্থ, ডিজেবল সন্তানদের জন্য সরকারী ভাতা পাওয়া। যার কারণে কোন বাবা মায়ের ঐ দুশ্চিন্তায় ধুঁকে ধুঁকে মরতে হয় না যে, 'হায় আল্লাহ্! আমার বাবুটার মেডিসিন শেষ! হায় আল্লাহ্ আমার বাবুটার চিকিৎসা করার টাকা নেই।'
এই দুচিন্তা করতে হয় না বলেই, সন্তানকে ভালো রাখতে পারে। যত্ন নিতে পারে। আপনি এমনও অটিজমে বা শারীরিকভাবে বিকলাঙ্গ কিছু শিশু দেখবেন যাদের বয়স ৬০-৭০ পর্যন্ত বাঁচে।
অথচ ঐ একই শিশু আমাদের দেশে ১-৫ বছরও বাঁচানো সম্ভব ছিলো না।
আবার অন্যদিকে আপনার ঘরে অটিজম সন্তান রয়েছে। আপনাকে এই সমাজের মানুষ বাঁকা চোখে তাকাবে। আপনার সন্তানের সাথে কেউ মিশতে চাইবে না। ছিঃ ছিঃ করবে। ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে পারবে না। বাসার বাইরে কোন পার্ক বা যানবাহনে সুব্যবস্থার অভাবে চড়াতে পারবেন না। আপনাকে দমিয়ে রাখার জন্য, সন্তানের প্রতি বিতৃষ্ণা আনার জন্য যা যা প্রয়োজন। সবই এই রাষ্ট্র ও সমাজ দিবে। যেটা উন্নত দেশে আপনি পাবেন না।
কখনও ভেবেছেন? রাস্তাঘাটে ভিক্ষা করা কিংবা আপনার পরিবারে জন্ম নেওয়া বিকলাঙ্গ শিশুগুলোর ভবিষ্যৎ কী হতে পারে আপনার মৃত্যুর পর? এদেরকে কে দেখবে? যত্ন করবে? কে খাওয়াবে?
আমি নিশ্চিত আমাদের দেশের প্রতিটি স্পেশাল বাবা মা এই চিন্তায় ধুঁকে ধুঁকে মরে যায়। আল্লাহর কাছে হয়তো প্রার্থনা করে, আল্লাহ্! আমার এই সন্তানের মৃত্যুর আগে আমাকে নিও না।
তাঁরা ধনী হলে কোন না কোন ব্যবস্থা হয়তো করে যেতেই পারে। কিন্তু হতদরিদ্রদের সন্তানদের কী হয়?
কিছুদিন আগে বাবা মায়ের কবরে কান্না করতে থাকা বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী শিশুর ভিডিওটি নিশ্চয়ই আপনারা দেখেছেন। ওদের অবস্থা ঠিক ওর চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়। বিশেষ করে যারা কথা বলতে পারে না। নড়তে চড়তে পারে না।
লেখাটা অনেক বড় হয়ে গিয়েছে।
আবারও বলছি - আপনি যদি সন্তান নেওয়ার প্লান করে থাকেন। তাহলে একজন সুস্থ সন্তানের জন্য নিজের এবং স্ত্রীর যত্ন নিন। আর্থিকভাবে সক্ষম হোন। মানসিকভাবে ধর্যশীল হোন। সন্তান নেওয়া ভাই বিশাল ব্যাপার। বিশাল ব্যাপার।
অন্যদিকে আমাদের রাষ্ট্র! প্রতিদিন প্রায় একশ কোটি টাকা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চাঁদাবাজি হয়। সত্যিই আমাদের টাকার অভাব নাই। অন্যায়ভাবে জোর করে নিলে দিতে রাজী আছি। কিন্তু সরকারীভাবে সেটা নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ সরকারও ঐ টাকা নয় ছয় করবে।
অথচ এই টাকাগুলো যদি কোন রাজনৈতিক দল না তুলে, সরকারই তুলতো। আর ঐ টাকাটা যদি সমাজে সুবিধাবঞ্চিত ৩৫ লাখ পথশিশু, অটিজম, বিকলাঙ্গ শিশুদের আবাসন, পুনর্বাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, থেরাপি কেন্দ্র, চিকিৎসায় ভাতা হিসেবে ব্যয় করা হতো। দূরারোগ্য ব্যধিতে দুঃস্থ মানুষের বিনামূল্যে চিকিৎসার জন্য ব্যয় করা হতো।
তাহলে এই সমাজে এসব সন্তান ফেলে যাওয়ার ঘটনা আমাদের হয়তো দেখতে হতো না।
তারপরেও একটাই কথা কিন্তু থেকেই যায় -
আপনার সন্তানকে আপনি কীভাবে ফেলে যান? বুক কাঁপে না?
- অন্তর মাশঊদ