29/05/2026
২০০৫ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হবার পর ২০১২ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সেখানে আমি তিনটি ঈদ কাটিয়েছিলাম। প্রথম ঈদটি ছিল ২০০৬ সালে। কুরবানীর ঈদ। আমার জীবনে প্রথম বাড়ীর বাইরে ঈদ করা।
তখন ছিল শীতকাল। ঈদের দিন সকালে নামাজ পড়ে আবার রুমে এসে শুয়ে রইলাম। নাস্তা করি নি। কারণ কোন হোটেল খোলা নেই। এত সকালে কোন দোকান পাটও খুলে নি। দুপুরে বের হলাম খেতে। কিন্তু কই খাব? কোন হোটেল ই খোলা পাচ্ছিলাম না।
সোহরাওয়ার্দী হলের ক্যান্টিনের পাশে একটা চায়ের দোকান খোলা পেলাম। সেখানে রুটি কলা চা আছে। গেলাম এগুলো খেতে। সেখানে গিয়ে পেলাম হলের কয়েকজন বড় ভাইকে। তুমি রুটি কলা খাইবা কেন?।চলো আমাদের সাথে। তারা আমাকে নিয়ে গেল সোহরাওয়ার্দী হলে। গিয়ে দেখি সেখানে ব্যাপক আয়োজন। খাসির মাংস, পোলাও, ডিম। কোন টোকেন নেই। ফ্রি। কিন্তু খাওয়া দাওয়া শুরু হবে ২ টায়। সবাই নামাজ পড়ে আসার পর একসাথে বসবে। উনারা নামাজ পড়তে গেলেন।
আমি হলের টিভি রুমে বসে টিভি দেখতে লাগলাম। এরপর দুপুর ২ টায় খাওয়া দাওয়া শুরু হলো। হলের মধ্যে ১৫/২০ জন ছিল। আর হলের বাইরের ১০/১২ জন যারা আমার মতো আশেপাশের কটেজে মেসে থাকে। সব মিলিয়ে আমরা ৩০/৩৫ জন। এত বিশাল আয়োজন তাও আবার ফ্রি তে। অবাক হলাম। পরে শুনলাম কুরবানী ঈদে সব হলেই একটা করে খাসী কুরবানী দেয়া হয় হলে থাকা ছাত্রদের জন্য। সেই রান্না ছিল অসাধারণ। আমার জীবনে যত ঈদের খাওয়া খেয়েছি তার মধ্যে সেদিন হলের রান্না ছিল অন্যতম মজার।
দুপুরে হলে ফ্রি খেলাম। কিন্তু রাতে? রাতে কি করব? রাতে তাহলে না খেয়ে থাকতে হবে। প্রচন্ড শীতে রুমে কাথামুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি। তখন কয়েকজন এসে দরজায় ডাকতে লাগলো। তারা শিবিরের। আমাকে বললো ছাত্র শিবির প্রতিটি হলে রাতের খাবারের আয়োজন করেছে। এর জন্য শিবির নাকি আলাদাভাবে গরু জবাইও করেছে পাশের জোবরা গ্রামে। শিবিরের ভাইয়েরা আমাকে রুম থেকে ডেকে নিয়ে যায় হলে। সেকি আন্তরিকতা। সবাই কোলাকুুলি করছে একে অন্যকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে। আমি আসলে এত সুন্দর আয়োজন এবং আন্তরিকতা কোনভাবেই প্রত্যাশা করি নি। আর যে যত পারে মাংস খাবে। বড় বোলে মাংস রাখা।
শিবিরের কয়েকজন বড় ভাই আমার বেশ পরিচিত ছিল তখন। খাওয়া দাওয়া শেষে তাদের সাথে পাশের চায়ের দোকানে বসে কিছুক্ষণ গল্প গুজব করি। তারা বললেন, নাদিম ক্যাম্পাসে হোটেল খুলতে আরও দেরি আছে। আগামী দুই দিন হলের ডাইনিং এ খাইবা। এগুলো সব শিবিরের আয়োজন। ফ্রি। পরের দুই দিন আমি হলের ডাইনিং এ খেয়েছি। এবং প্রতিবেলায় গরুর মাংস। চমৎকার রান্না।
শিবিরের প্রতি মুগ্ধতা আমার শুরু হয় সেখান থেকেই।এত চমৎকার ব্যাবহার। এত সুন্দর আন্তরিক আয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতে এসে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। মনে হচ্ছিল এরপর সব ঈদ ক্যাম্পাসেই করি।
আজ সেই চবিতে নাকি বিকাল ৪ টা পর্যন্ত হলে খাবারই পায় নি ছাত্ররা। চরম বিশৃংখলা। আবার নাকি টোকেনও নিতে হয়েছিল আগের দিন রাতে। আমার আইডিতে সাধারনভাবেই চবির ছাত্ররা অনেক আছে। যেহেতু আমি সাবেক ছাত্র চবির। তাদের অনেকের পোস্ট দেখে দেখে এগুলো জেনেছি।
আজ ২০২৬ সাল। ২০ বছর পর প্রিয় ক্যাম্পাসর এত অবনতি দেখে খারাপ লাগলো। একটা সময় নিজের বাড়ীর চেয়েও ভালো লাগতো যে ক্যাম্পাস, এত সুন্দর আন্তরিক পরিবেশ ছিল যে ক্যাম্পাসে আজ কত নষ্টের দিকে চলে গেল। শুয়ে শুয়ে এগুলো ভাবছিলাম। আমি অসুস্থ আজ অনেক। তাই আজ গুছিয়ে লিখতে পারছিনা। ইচ্ছা করছে না।
আমি চবির ভিসিকে বলব, ছাত্রবান্ধব ক্যাম্পাস গড়ে তুলুন। যাতে আমার মতো ২০ বছর পরেও তারা প্রিয় ক্যাম্পাসের গুন-গুন গাইতে পারে। ঈদের দিন ভিক্ষুকও দু টুকরো গরুর মাংস তার পাতে পায় অথচ তাদের সাথে খাবার নিয়ে ছেসরামি করলেন। হলের নামে দেয়া কুরবানির মাংস নাকি নিজেরাই ভাগ ভাটোয়ারা করে নিয়ে গেছে। এরকম লজ্জাজনক কাজ আমাদের সময় করা তো দূরে থাক কেউ মাথাতেই আনে নি। ছাত্রদের সাথে মানবিক হোন। এরা ভিক্ষুক না। সম্মানের সাথে আচরণ করুন।