27/08/2026
বিশ্ব স্বীকৃত আদিবাসীদের মত পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস যথা সমৃদ্ধ নয়।
CHT Insiders
জাতিসংঘের (UN) তথ্য মতে, বর্তমানে বিশ্বের ৯০টিরও বেশি দেশে প্রায় ৪৭ কোটি ৬০ লাখ প্রথাগত আদিবাসী জনগোষ্ঠী বসবাস করে, যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ। প্রকৃতি ও ভূমিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এদের প্রাচীন জীবনধারা ও সংস্কৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। কিন্তু ঔপনিবেশিক আগ্রাসন ও দখলদারিত্বের কারণে এই প্রাচীন জনগোষ্ঠীগুলো আজ বিলুপ্তির পথে। তাদের অধিকার, মৌলিক ভূমি ও অনন্য সংস্কৃতি রক্ষার তাগিদেই আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং জাতিসংঘ ‘আইএলও কনভেনশন ১৬৯ এর ১ এর b’ ও ‘২০০৭ সালের আদিবাসী অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র (UNDRIP)’ গ্রহণ করেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে দাবি করার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন, ইতিহাস ও নৃবিজ্ঞানের আলোকে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের পার্বত্য উপজাতিরা কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক সংজ্ঞায় স্বীকৃত ‘আদিবাসী’ নয়; বরং তারা বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে এ অঞ্চলে আগমন করা অভিবাসী উপজাতি। (UN DESA - Indigenous Peoples; State of the World's Indigenous Peoples, 2009)।
[https://tinyurl.com/y3k2sudz]
বিভিন্ন দেশের আদিবাসীদের পরিচয় ও স্বীকৃতির কারণ
রেড ইন্ডিয়ান (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র): আনুমানিক ১৫,০০০ থেকে ২০,০০০ বছর আগে এশিয়া থেকে বেরিং প্রণালী পার হয়ে আমেরিকায় এদের আগমন ও বসতি স্থাপন ঘটে। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকদের আগ্রাসনে তারা নিজস্ব আদিভূমি হারিয়ে সংরক্ষিত এলাকায় কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ১৯২৪ সালের "ইন্ডিয়ান সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট" (Indian Citizenship Act of 1924, 43 Stat. 253) এবং বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে তারা "নেটিভ আমেরিকান" বা "আমেরিকান ইন্ডিয়ান" হিসেবে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম আদিবাসী সার্বভৌমত্বের আইনি স্বীকৃতি লাভ করেছে। (Goebel, T. et al., "The Late Pleistocene Dispersal of Modern Humans in the Americas", Science, 2008) (Title 25 of the United States Code)
[https://tinyurl.com/5ysfp89f]
ফার্স্ট নেশনস (কানাডা): ইউরোপীয়দের আগমনের বহু হাজার বছর আগে থেকে এরা কানাডা ভূখণ্ডে বসবাস করছে। ১৮৭৬ সালের "ইন্ডিয়ান অ্যাক্ট" (Indian Act, R.S.C. 1985) এবং ১৯৮২ সালের কানাডার সংবিধানের সংশোধিত ৩৫ নম্বর ধারার (Section 35, Constitution Act, 1982) মাধ্যমে তারা কানাডার স্বীকৃত ৩টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্যতম হিসেবে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার ও প্রথাগত ভূমির স্বত্ব ভোগ করছে।(Royal Commission on Aboriginal Peoples Report, 1996)
[https://tinyurl.com/9xnvay5c]
আমাজনের আদিবাসী (ব্রাজিল): আনুমানিক ১১,০০০ থেকে ১৩,০০০ বছর আগে আমাজন অববাহিকায় এদের প্রথম আগমন ঘটে। ১৯৮৮ সালের ব্রাজিলের নতুন সংবিধানের ২৩১ নম্বর অনুচ্ছেদের (Article 231, Constitution of Brazil 1988) মাধ্যমে তাদের ঐতিহ্যবাহী প্রথাগত ভূমির আইনি স্বত্ব ও সুরক্ষার আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
(Roosevelt, A. C. et al., "Paleoindian Cave Dwelling in the Amazon", Science, 1996)
[https://tinyurl.com/yktvxzme]
অ্যাবোরিজিনাল (অস্ট্রেলিয়া): প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৬৫,০০০ বছর আগে থেকে এরা অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ডে বাস করছে। মৌখিক গল্প ও "Dreamtime" বিশ্বাসের মাধ্যমে তারা প্রাচীন সংস্কৃতি ধরে রেখেছে। ১৯৬৭ সালের জাতীয় গণভোট এবং ১৯৯২ সালের অস্ট্রেলিয়ার সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক 'মাবো বনাম কুইন্সল্যান্ড (নং ২)' মামলার রায়ের (Mabo v Queensland [No 2] [1992] HCA 23) মাধ্যমে তাদের ভূমির মূল স্বত্বাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
(Clarkson, C. et al., "Human occupation of northern Australia by 65,000 years ago", Nature, 2017)
[https://tinyurl.com/k5hz6pt2]
টরেস প্রণালী দ্বীপবাসী (অস্ট্রেলিয়া): প্রায় ২,৫০০ বছর ধরে সমুদ্রনির্ভর মেলানেশীয় বংশোদ্ভূত এই জনগোষ্ঠী টরেস প্রণালীর দ্বীপগুলোতে বসবাস করছে। ১৯৯২ সালের ঐতিহাসিক 'মাবো মামলা' (Mabo Decision 1992) ও 'নেটিভ টাইটেল অ্যাক্ট ১৯৯৩' (Native Title Act 1993)-এর মাধ্যমে এরা মূল ভূখণ্ডের অ্যাবোরিজিনালদের পাশাপাশি দ্বিতীয় পৃথক আদিবাসী জাতি হিসেবে আইনি স্বীকৃতি পায়। রেফারেন্স-৬ [https://tinyurl.com/2edvmwsc]
আফ্রিকান আদিবাসী (দক্ষিণ আফ্রিকা, কেনিয়া, তানজানিয়া): আফ্রিকার প্রাচীনতম অধিবাসী সান (San) ও খোয়েখোয়ে (Khoikhoi)-সহ বিভিন্ন পশুপালক ও শিকারী জনগোষ্ঠী বান্টু ও ইউরোপীয়দের আগমনের বহু পূর্ব থেকে সেখানে বসবাস করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা IWGIA এবং আফ্রিকান হিউম্যান রাইটস কমিশন (ACHPR)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী এবং দক্ষিণ আফ্রিকার 'ট্র্যাডিশনাল অ্যান্ড খোই-সান লিডারশিপ অ্যাক্ট ২০১৯' (Traditional and Khoi-San Leadership Act of 2019)-এর অধীনে এরা প্রথাগত ভূদৃশ্যের প্রতি আনুগত্য ও ঐতিহ্যের ভিত্তিতে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃত। রেফারেন্স-৭ [https://tinyurl.com/yc657tk9]
আদিবাসীদের রক্ষায় জাতিসংঘের ILO Convention
বিশ্বজুড়ে সভ্যতার বিকাশে অধিকাংশ জাতি আধুনিক হলেও এই জনগোষ্ঠীগুলো আজও তাদের হাজার বছরের প্রাচীন প্রথা, পশু শিকার, প্রকৃতি পূজা ও আদিম জীবনধারা অব্যাহত রেখেছে। এদের অনন্য ও বিচ্ছিন্ন অস্তিত্বের সুরক্ষার্থেই আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) ১৯৮৯ সালে গৃহীত ১৬৯ নম্বর কনভেনশনের ১(b) ধারায় (ILO Convention No. 169, Article 1(1)(b)) ‘আদিবাসী’র আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা ও অধিকার নির্ধারণ করেছে, যা কেবল এই ধরনের ঐতিহাসিক মূল ভূমিপুত্রদের জন্যই প্রযোজ্য। [https://tinyurl.com/yujxycdf]
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বিশ্বের প্রথাগত আদিবাসীদের সাথে বাংলাদেশের পার্বত্য উপজাতিদের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ বিপরীত। নৃবিজ্ঞান ও ইতিহাস (যেমন: Sir Alexander Mackenzie-এর "The North-East Frontier of Bengal", 1884 এবং ১৯০০ সালের "Chittagong Hill Tracts Regulation 1900") প্রমাণ করে যে, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও বমসহ মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত উপজাতিরা মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ বছর আগে মিয়ানমার (আরাকান) ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অভিবাসী হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে আশ্রয় নেয়। এরা এ মাটির মূল ভূমিপুত্র নয়। [https://tinyurl.com/mr22tu22]
প্রান্তিক আদিবাসীদের মতো এরা আধুনিক সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন বা অনগ্রসর নয়। পার্বত্য উপজাতিরা বর্তমানে আধুনিক শিক্ষায় অত্যন্ত শিক্ষিত ও আধুনিক জীবনধারায় অভ্যস্ত। যেমন চাকমাদের শিক্ষার হার দেশের মূল জনগোষ্ঠী থেকেও বেশি। [https://tinyurl.com/5n8y7hdv] [https://tinyurl.com/58n4yy4j]
[https://tinyurl.com/yvffc2s4]
বাংলাদেশে উপজাতিদের জন্য বিসিএস, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, উচ্চ শিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে বিশেষ কোটা সুবিধা দেওয়া রয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনা, নীতিনির্ধারণ, রাষ্ট্রদূত, সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং জাতীয় সংসদে মন্ত্রী-এমপি পদেও তাদের স্বতঃস্ফূর্ত ও ঈর্ষণীয় প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। যেমন: সাচিং প্রু জেরি, পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রী, সাবেক মন্ত্রী, বীর বাহাদুর উশৈসিং, সাবেক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার, কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, সুপ্রদীপ চাকমা উপদেষ্টা, সাবেক সরকারি কর্মকতা ও রাষ্ট্রদূত।
[https://tinyurl.com/3w6wshpe]
[https://tinyurl.com/3bze9vur]
[https://tinyurl.com/5n6kcntp]
[https://akkhor24.com/?p=3218]
অন্যান্য আদিবাসী এবং বাংলাদেশের উপজাতিদের মধ্যে পার্থক্য ঃ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আদিবাসীরা মূলধারার বিশ্ব ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বহুদূরে থেকে আজও আদিম জীবনসংগ্রামে লিপ্ত এবং ভূমি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশের পার্বত্য উপজাতিরা পূর্ণ নাগরিক অধিকার ভোগ করছে, আধুনিক সুট-টাই পরিহিত জীবনধারা বেছে নিয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক উচ্চপর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করছে।
কেন জাতিসংঘের ILO কনভেনশন বাংলাদেশে প্রযোজ্য নয়?
ILO Convention No. 169-এর Article 1(1)(a)-তে ‘উপজাতি’ (Tribal Peoples) এবং Article 1(1)(b)-তে ‘আদিবাসী’ (Indigenous Peoples)-এর পৃথক সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। যেহেতু পার্বত্য অধিবাসীরা এ দেশের প্রাচীন মূল ভূমিপুত্র নয়, তাই তারা ১(b) ধারার ‘আদিবাসী’ সংজ্ঞায় পড়ে না। বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক আইন মেনে তাদের ১(a) ধারা অনুযায়ী 'উপজাতি' বা 'ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং সেই অনুযায়ী সাংবিধানিক অধিকার প্রদান করেছে।রেফারেন্স-১৭ [https://tinyurl.com/4abpm58n]
ঐতিহাসিক বাস্তবতা, সামাজিক জীবনধারা ও আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট আলোকেই প্রমাণিত হয় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষেরা ‘উপজাতি’। দেশের সংবিধান এবং ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তির আলোকেই তারা তাদের সমস্ত ন্যায্য অধিকার পূর্ণাঙ্গভাবে ভোগ করছে। বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত প্রথাগত আদিবাসীদের সাথে এদের ইতিহাস মেলানোর কোনো সুযোগ নেই। তাই ঐতিহাসিক ও আইনি সত্য গোপন করে তথাকথিত ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের দাবির নেপথ্যে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা নিহিত রয়েছে।