02/05/2026
শ্রমিক দিবস: পাহাড়ে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের উপর উপজাতি সন্ত্রা'সীদের মানবাধিকার লঙ্ঘন
Follow: CHT Expose
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলো বাইরে থেকে যতটা শান্ত ও মনোরম মনে হয়, ভেতরে ততটাই অজানা আতঙ্ক লুকিয়ে থাকে। এই আতঙ্কের অন্যতম রূপ হলো শ্রমিক অপহরণ ও গুম, যা বহু বছর ধরে এখানে কর্মরত সাধারণ মানুষের জীবনে এক গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। সশস্ত্র উপজাতীয় সন্ত্রা'সীগোষ্ঠীগুলো পাহাড়ে তৈরি করেছে গুম, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের এক নির্মম ও ভয়ানক পরিবেশ। যা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এ যাবৎ উপজাতি সন্ত্রা'সীদের গুম ও অপহরণের শিকার হয়েছে পাহাড়ের অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ। এমনকি অপহরণের পর মুক্তিপণ না দিলে খুনের শিকারও হতে হয়েছে অনেক শ্রমিককে। দুর্গম পাহাড়ি পথ, ঘন জঙ্গল আর যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা — এসব কারণে কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়ে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠী শ্রমিকদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। বিশেষ করে টেলিকম, নির্মাণ, ইটভাটা, কৃষি বা পাহাড়ি প্রকল্পে কাজ করা শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি টার্গেটে থাকে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে এ পর্যন্ত উপজাতি সন্ত্রা'সীগোষ্ঠীগুলোর দ্বারাই সবচেয়ে বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে। অগণিত গুম, খুন, অপহরণ, ধর্ষণ ও চাঁদাবাজির নজির রয়েছে সন্ত্রা'সী গোষ্ঠীগুলোর। মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী সশস্ত্র সন্ত্রা'সী সংগঠনগুলো হলো জেএসএস (শান্তিবাহিনী), ইউপিডিএফ, কেএনএফ, এমএলপি, পিসিপি ও এইচডব্লিউএফসহ আরো কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। তাদের হাতে এ যাবৎ হাজার হাজার নিরীহ শ্রমিকসহ কৃষক, নিরাপত্তা বাহিনী, ব্যবসায়ী ও পর্যটক খুন, গুম ও অপহরণের শিকার হয়েছে। তারাই আবার নিজেদের অপরাধ ঢাকতে বাঙালি ও সেনাবাহিনীর উপর মিথ্যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় চাপায়। কিন্তু বাস্তবে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন — মানবাধিকার লঙ্ঘন করে এই সন্ত্রা'সীরাই।
চলতি বছর ফেব্রুয়ারির ১৬ তারিখ চাঁদার দাবিতে বান্দরবানের লামায় ২৫ জন শ্রমিককে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে সন্ত্রা'সীগোষ্ঠী জেএসএসের একদল সশস্ত্র সদস্য। অপহরণের পর শ্রমিকদের পরিবারের কাছে কড়া অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করে সন্ত্রা'সীরা। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর রুদ্ধশ্বাস অভিযানে শ্রমিকরা মুক্ত হন। অন্যদিকে ২৪ এপ্রিল বান্দরবান সদরের টংকাবতীতে ৬ জন রাবার শ্রমিককে অপহরণ করে উপজাতি সন্ত্রা'সীরা। তাদের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হলেও সেনাবাহিনীর অভিযানে ছয়জন শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
২০২৫ সালে খাগড়াছড়িতে ২ কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে রবি মোবাইল টাওয়ার রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত চারজন শ্রমিককে অপহরণ করে সন্ত্রা'সী সংগঠন ইউপিডিএফ। তাদের মধ্যে ২ জন দীর্ঘ সময় ধরে নিখোঁজ ছিলেন, পরিবারগুলো অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটিয়েছে। অপহরণের পর পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। ২ কোটি টাকা চাঁদা না দিলে তার তার কেটে দিয়ে মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেয় সন্ত্রা'সীরা। তা ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে অপহৃতদের কোনো তথ্যই পাওয়া যায় না, যা গুমের আশঙ্কা তৈরি করে।
একইভাবে ২০২৬ সালে বান্দরবানের একটি ইটভাটা থেকে দুই শ্রমিক রাতের অন্ধকারে নিখোঁজ হয়ে যান। স্থানীয়রা তাদের খোঁজে নেমেও কোনো সন্ধান পাননি। ঘটনাস্থলে পায়ের ছাপ ও স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী নিশ্চিত হওয়া যায় যে, জোরপূর্বক তাদের তুলে নেওয়া হয়েছে। পরে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর তদন্তে বের হয়ে আসে যে, সন্ত্রা'সী সংগঠন জেএসএসই অপহরণের মূলহোতা। মোটা অঙ্কের চাঁদা না দেওয়ায় শ্রমিকদের অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করে সন্ত্রা'সীরা। পরবর্তীতে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সন্ত্রা'সীরা শ্রমিকদের মুক্তি দেয়। তা ছাড়া ২০২৫ সাল ও এর আগে একাধিক বাঙালি ফেরিওয়ালা কাজের উদ্দেশ্যে বান্দরবানের রুমা ও থানচিতে গিয়ে আর ফিরে আসেননি। তাদের কোনো খোঁজ আজও পাওয়া যায়নি।
২০১৩ সালের ৮ জুলাই রাঙামাটির বাঘাইছড়ি থেকে অপহরণ করা হয় মোবাইল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান টেলিটকের পাঁচ কর্মীকে। তাঁদের কাছ থেকে মুক্তিপণও দাবি করা হয়। এ ঘটনার জন্য ইউপিডিএফকে দায়ী করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অপহরণের ১৭ দিন পর ২৬ জুলাই খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় তাঁরা জিম্মিদশা থেকে মুক্তি পান। মুক্তির পর টেলিটকের কর্মী মো. আখতারুজ্জামান বলেছিলেন, অপহরণের পর তাঁদের তিন দিন একটি মাটির ঘরে রাখা হয়েছিল সশস্ত্র পাহারায়। এরপর বিভিন্ন পাহাড়ে ঘোরানো হয়।
স্থানীয় উপজাতি ও বাঙালিদের অভিযোগ, পাহাড়ি সন্ত্রা'সীরা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে এক আতঙ্ক ও ত্রাসের নাম। তাদের এসব অপহরণের পেছনে থাকে চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, শ্রমিক, ঠিকাদার বা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য অপহরণ একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অনেক ক্ষেত্রে মুক্তিপণ না দিলে নির্যাতন বা দীর্ঘদিন আটকে রাখা, এমনকি হত্যার ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় একমাত্র ভরসা ও আশ্রয়ের নাম সেনাবাহিনী। তাদের সক্রিয় তৎপরতায় অসংখ্য গুম, খুন ও অপহরণ থেকে রক্ষা পায় এবং অপহৃতরা জীবিত ফিরে আসে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সব অপহৃত ব্যক্তি ফিরে আসে না। কিছু মানুষ বছরের পর বছর নিখোঁজ থাকে, যাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা অজানাই থেকে যায়। পরিবারগুলো অপেক্ষা করতে করতে একসময় আশা হারিয়ে ফেলে। এই অনিশ্চয়তাই 'গুম'-এর ভয়কে আরও বাস্তব করে তোলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলে অপহরণের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে — সন্ত্রা'সীদের দলীয় দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি, নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, এমনকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও। ফলে এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, বরং একটি বহুমাত্রিক সংকট।
সব মিলিয়ে, পার্বত্য চট্টগ্রামে শ্রমিক অপহরণ ও গুম একটি মানবিক সংকট, যা শুধু ভুক্তভোগী পরিবার নয়, পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। প্রতিদিন জীবিকার তাগিদে কাজ করতে যাওয়া মানুষগুলো জানে না, তারা নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে কিনা — এই অনিশ্চয়তাই পাহাড়ের সবচেয়ে বড় ভয়। উপজাতীয় সন্ত্রা'সীদের শ্রমিক ও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের উপর এমন নৃশংসতা হানাদার বাহিনীর নির্মমতাকেও হার মানায়, যা পাহাড়ে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্তর্ভুক্ত।
নতুন সরকারের জন্য দেশের নিরাপত্তায় সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের বিষয় হলো এই পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সেখানে বিদ্যমান সশস্ত্র উপজাতীয় সন্ত্রা'সী গোষ্ঠীগুলো। তারা ভয়ভীতি, সন্ত্রা'স, গুম-খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে পাহাড়ে অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দিয়েছে। তারা পাহাড়ে এখন উপজাতি ও বাঙালিসহ সব মানুষের কাছে বিষফোঁড়ার নাম। তাই নতুন সরকারকে অবশ্যই পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে সুদৃষ্টি দিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং পাহাড়কে শান্ত ও উন্নয়নের পথে ধাবিত করতে প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী সশস্ত্র সন্ত্রা'সীদের চিরতরে নির্মূল করে পাহাড়কে অবৈধ অস্ত্রমুক্ত করতে হবে এবং সেনাবাহিনীসহ নিরাপত্তা বাহিনীর সংখ্যা আরো বৃদ্ধি করতে হবে।
#অপহরণ #গুম #চাঁদাবাজি
#উপজাতিসন্ত্রাসী