17/11/2025
লামা উপজেলার ফাইতংয়ে কাফনের কাপড়ে জনতার আকুতি।
অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদ অভিযানে উত্তাল জনজীবন
এক মানবিক বাস্তবতা ও প্রশাসনিক দায়িত্বের দ্বন্দ্বে দিনব্যাপী নাটকীয়তা।
বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নের সকালটা ছিল অন্য দিনের মতোই। পাহাড়ি বাতাসে কুয়াশার আস্ত পরত, শ্রমজীবীদের ভোরবেলা ইটভাটার পথে হাঁটা, আর দূর থেকে ভেসে আসা চুল্লির ধোঁয়া—সব মিলিয়ে পাহাড়ের নিয়মিত জীবন। কিন্তু সেই দিনের সকালটা হঠাৎই হয়ে উঠল ইতিহাসের এক মারাত্মক বাঁক। পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের একটি বিশেষ দল ফাইতংয়ের অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদে মাঠে নামল; আর মুহূর্তেই পরিস্থিতি রূপ নিল জনতার ঢল, কান্না, প্রতিবাদ ও মানবিক আবেগে উৎকট এক বাস্তবতায়।
অভিযানের নেতৃত্ব দেন পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক জমির উদ্দিন এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রেজাউল ইসলাম। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন লামা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুবায়েত আহমেদ—যিনি ঘটনার প্রতিটি মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক অবস্থায় রাখেন।
কাফনের কাপড়ে শুয়ে থাকা জনতা—এক হৃদয়বিদারক প্রতীকী প্রতিবাদ
অভিযানে ব্যবহৃত সরকারি গাড়িবহর ফাইতংয়ে প্রবেশ করতেই দৃশ্যপটে অদ্ভুত, বিস্ময়কর, এবং হৃদয়বিদারক একটি ছবি ফুটে ওঠে। কয়েক শতাধিক মানুষ রাস্তা জুড়ে সার বেঁধে শুয়ে রয়েছে। কারও গায়ে সাদা কাফনের কাপড়—মৃত্যুর প্রতীক; কারও চোখে জল, মুখে অনুরোধের কাঁপা সুর—
“স্যার, ভাটা ভেঙে দিলে আমরা বাঁচব কীভাবে?”
মহিলারা শিশু কোলে দাঁড়িয়ে স্লোগান তুলছেন—
“আমরা শ্রমিক, আমাদের জীবিকা বন্ধ করবেন না!”
বয়স্ক শ্রমিকদের কেউ কেউ বুকে ইট চেপে শুয়ে পড়েছেন। তাদের যুক্তি, “ইটভাটা মানে আমাদের অন্ন, আমাদের অস্তিত্ব।”
পাহাড়ের নিস্তব্ধতা ভেঙে মানবিক আকুতির এই আঁচড়ে প্রশাসনও কিছুক্ষণ থমকে যায়।
আইন বনাম জীবিকা—এক অব্যক্ত টানাপোড়েন
বিগত কয়েক বছর ধরে এসব ইটভাটা পরিবেশগত নিয়ম না মেনেই পরিচালিত হয়ে আসছিল—এই অভিযোগ নতুন নয়। বন অরক্ষিত হচ্ছে, পাহাড় কাটার আশঙ্কা বাড়ছে, বায়ু দূষণ ছড়িয়ে পড়ছে—এসব যুক্তিতেই পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান।
কিন্তু প্রশ্ন উঠল, যেখানে একটি ভাটার সঙ্গে জড়িত আছে ২০০–৩০০ শ্রমিকের পরিবার, সেখানে হঠাৎ উচ্ছেদ কি চরম মানবিক সংকট সৃষ্টি করবে না?
প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন—“আইনের প্রয়োগ আমাদের দায়িত্ব। তবে মানুষের কান্না উপেক্ষা করাও সহজ নয়।”এ যেন আইন ও মানবিকতার মাঝখানে বন্দি এক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতিচ্ছবি। ইটভাটা মালিকরা প্রশাসনের সামনে মাথা নত করে অনুরোধ জানান,“স্যার, তিন মাস সময় দিন। সব কাগজপত্র ঠিক করে নেব। আইন মেনে ভাটা চালাব।”
তারা দাবি করেন, ভাটার সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকেরা দিনভিত্তিক উপার্জন করেন।
,উচ্ছেদ হলে পুরো গ্রামের অর্থনীতি ভেঙে পড়বে।
,পাহাড়ি এলাকায় সরকারি প্রকল্প, সড়ক নির্মাণ, বাজার ব্যবস্থার জন্য ইট অপরিহার্য।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও শ্রমজীবী মানুষের দুর্দশা তুলে ধরেন। একপর্যায়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এগিয়ে যায়, কিন্তু জনতার ঢল এতটাই ঘন যে গাড়িবহর সামনে অগ্রসর হতে পারে না। একজন বৃদ্ধ শ্রমিক আকুতি করে বলেন,
“মারা যাইতেও রাজি, কিন্তু ভাটা ভেঙে দিলে ঘরে খাবার নিতে পারব না।” পরিস্থিতি আরও উত্তেজিত হয়ে উঠলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট লোকজনকে শান্ত হতে আহ্বান জানান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংযমী আচরণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে—একটিও সংঘর্ষ ছাড়াই।
ফাইতংয়ের দিনটি যেন পাহাড়ের বুকের এক দাগ হয়ে রইল। সেদিন প্রশাসনের আইনি দায়িত্ব পালনের দৃঢ়তা যেমন ছিল, তেমনি ছিল সাধারণ মানুষের বাঁচার আকুল চেষ্টা। দুটি শক্তির সংঘর্ষে তৈরি হওয়া আবেগ, ভয়, অনিশ্চয়তা এবং মানবিক সংকট আগামী দিনের জন্য রেখে গেল অজানা এক প্রশ্ন, পরিবেশ রক্ষা প্রথম, নাকি মানুষের জীবিকা রক্ষা?
নাকি, দুইয়ের মধ্যে দরকার সংবেদনশীল সমন্বয়?
পরিবেশ অধিদপ্তর এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি—সময় দেওয়া হবে কি না। তবে ফাইতংয়ের জনতার হৃদয়স্পর্শী আহ্বান, কাফনের কাপড় পরিহিত প্রতীকী প্রতিবাদ এবং প্রশাসনকে ঘিরে মানুষের আবেগ আগামী কয়েকদিন স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে—এটা নিশ্চিত।