07/11/2025
তারিখঃ ০৭/১১/২০২৫ ইং,
"নির্দিষ্ট মতবাদি রাজনীতি বনাম বিজ্ঞান ভিত্তিক রাজনীতি"
যদি কোনো দেশে দূরদর্শিহীন (Visionless) রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে — অর্থাৎ এমন দল যারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বাস্তবভিত্তিক নীতি ও উন্নয়ন চিন্তা ছাড়া শুধুমাত্র অন্ধ বিশ্বাস, ক্ষমতা, জনপ্রিয়তা বা ব্যক্তিস্বার্থে রাজনীতি করে — তাহলে দেশটি নানা দিক থেকে পিছিয়ে যায়। নিচে কারণগুলো ব্যাখ্যা করা হলোঃ
১/ নীতিহীন সিদ্ধান্ত ও দুর্বল পরিকল্পনাঃ দূরদর্শিতা না থাকলে সরকার তাৎক্ষণিক লাভ বা জনপ্রিয়তার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়, এতে দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২/ দুর্নীতি ও পক্ষপাতিত্ব বৃদ্ধিঃ দূরদর্শিহীন দলগুলো প্রায়ই নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে প্রশাসনে দুর্নীতি, দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি বাড়ায়। এতে যোগ্য মানুষ উপেক্ষিত হয়, এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।
৩/ শিক্ষা ও গবেষণায় অবহেলাঃ যে দল ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করে না, তারা শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ কমায়। ফলে দেশ মানবসম্পদ উন্নয়ন-এ পিছিয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না।
৪/ অর্থনীতি স্থবির হয়ে যায়ঃ দূরদর্শী নেতৃত্ব না থাকলে অর্থনীতি পরিকল্পনাহীন হয়, বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারায়, শিল্প বিকাশ পায় না, এবং বেকারত্ব বাড়ে
৫/ সামাজিক বিভাজন বৃদ্ধিঃ
দূরদর্শিহীন রাজনীতি সাধারণত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ না করে বিভক্ত করে — ধর্ম, ভাষা, অঞ্চল বা দলের নামে। এতে সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়।
★বিজ্ঞান বনাম অন্ধ বিশ্বাস রাজনীতিঃ
১/ বিজ্ঞান নির্ভর করে প্রমাণ, পরীক্ষা ও যুক্তির ওপর।
যখন একটি দল সীমাবদ্ধ জ্ঞানের বিশ্বাসকে রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি করে, তখন সিদ্ধান্তগুলো যুক্তি বা প্রমাণের বদলে বিশ্বাসের আলোকে নেওয়া হয়। এতে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, স্বাধীন চিন্তা ও সমালোচনার পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হয়।
২/ সীমাবদ্ধ জ্ঞান সম্পন্ন অন্ধ নীতিতে বিশ্বাসী সরকার সাধারণত শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে কুসংস্কারের ছোঁয়া রাখে, এর ফলে বিজ্ঞানশিক্ষা ও গবেষণা সীমিত হয়, এবং সমালোচনামূলক চিন্তা নিরুৎসাহিত হয়, ফলে সমাজ ধীরে ধীরে আবেগ-নির্ভর ও অতীতমুখী হয়ে পড়ে। যে সব দেশ যেমন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, বা ইউরোপীয় দেশগুলো বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি অনুসরণ করেছে, তারা দ্রুত উন্নত উন্নত ও শান্তি প্রিয় রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
★ একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের রাজনীতির প্রভাব এবং বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নমূলক রাজনীতির প্রভাবঃ
১/ রাষ্ট্রনীতি ও আইন যদি একটা নির্দিষ্ট মতাদর্শের ভিত্তিতে প্রণয়ন করা হয়, তাহলে এতে নারী, সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীরা বঞ্চিত হতে পারে।
কিন্তু বিজ্ঞান ভিত্তিক মতাদর্শে সংবিধান ও মানবাধিকারের ওপর ভিত্তি করে আইন তৈরি হয়, এতে সবাই সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করে।
২/ শিক্ষাব্যবস্থায় মতাদর্শগত শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, এবং বিজ্ঞান, দর্শন, যৌনশিক্ষা বা ইতিহাসকে সীমিত করা হয়। কিন্তু
বিজ্ঞান ভিত্তিক নীতিতে গবেষণা, সমালোচনামূলক চিন্তা, ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়।
৩/ অর্থনীতি ও শিল্পনীতি সুদ, ব্যাংকিং, নারীর কর্মসংস্থান ইত্যাদিতে নির্দিষ্ট মতাদর্শগত বিধিনিষেধ থাকায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়। কিন্তু বিজ্ঞান ভিত্তিক নীতিতে প্রযুক্তি, রপ্তানি, নারী অংশগ্রহণ ও উদ্ভাবনমুখী অর্থনীতি গড়ে ওঠে।
৪/ গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মতাদর্শের বাইরে প্রশ্ন তোলাকে অপমান মনে করা হয়, ফলে মুক্ত চিন্তা বাধাগ্রস্ত হয়। কিন্তু বিজ্ঞান ভিত্তিক নীতিতে নতুন ধারণা, প্রশ্ন ও গবেষণায় উৎসাহিত করা হয়, ফলে নতুন প্রযুক্তি তৈরি হয়।
৫/ বিদেশনীতিতে ও আধুনিকতা য় নির্দিষ্ট মতাদর্শের কারণে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সীমিত হতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞান ভিত্তিক নীতিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পায়, ফলে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা সম্ভব হয়।
৬/ নির্দিষ্ট মতাদর্শের কারণে সামাজিক সংস্কৃতিতে এবং সমাজে কুসংস্কার, বিভাজন ও নারী-পুরুষ বৈষম্য বাড়ে।
কিন্তু বিজ্ঞান ভিত্তিক মতাদর্শে যুক্তিবাদী ও সমতাভিত্তিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
★বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থাঃ
বাংলাদেশের সংবিধান আংশিক অসাম্প্রদায়ীক, কিন্তু রাজনীতিতে নির্দিষ্ট মতবাদের প্রভাব এখনও রয়েছে। দেশে বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, তরুণ উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু নীতিনির্ধারণ ও শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি বিজ্ঞানমুখী নয়। নির্দিষ্ট মতবাদের প্রভাব ও রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত অনেক সময় দুর্বল হয়ে পড়ে। যত বেশি রাষ্ট্রনীতি ও শিক্ষা বিজ্ঞান ভিত্তিক হবে, তত দ্রুত বাংলাদেশ “উন্নয়নশীল” থেকে “উন্নত” রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে পারবে।
কিন্তু নির্দিষ্ট মতবাদি রাজনীতি যত প্রভাব বিস্তার করবে, ততই উন্নয়ন হবে ধীর, এবং সমাজ হবে বিভাজিত ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন।
বাংলাদেশ একটি মুসলিমপ্রধান দেশ হলেও এর সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা অন্যতম মূলনীতি। কিন্তু বাস্তবে রাজনীতির মাঠে নির্দিষ্ট মতাদর্শ ভিত্তিক দলের প্রভাব এখনো শক্তিশালী। এই দলগুলো রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজ মতাদর্শের নীতি ও আদর্শকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলস্বরূপ শিক্ষা, নারী অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গবেষণামূলক চিন্তার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। মতাদর্শগত রাজনীতি সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে—কে “আমাদের মতাদর্শে বিশ্বাসী” আর কে "আমাদের মতাদর্শে বিশ্বাসী না” এই বিতর্ক সমাজকে ঐক্যের বদলে দ্বন্দ্বে ঠেলে দেয়। অন্যদিকে, বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নমুখী রাষ্ট্র যুক্তি, প্রমাণ ও মানবকল্যাণকে সর্বাগ্রে রাখে। এ ধরনের রাষ্ট্রে শিক্ষা হয় মুক্ত, গবেষণা হয় বাধাহীন, এবং নতুন চিন্তা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহ দেওয়া হয়। প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি, নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ এবং বৈশ্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে এমন রাষ্ট্র দ্রুত উন্নতির শিখরে পৌঁছায়। উদাহরণ হিসেবে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা ইউরোপীয় দেশগুলোকে উল্লেখ করা যায়, যারা, যার যার মতাদর্শ ও অনুভূতির প্রতি সম্মান রেখেও রাষ্ট্র পরিচালনায় বিজ্ঞানের নীতি অনুসরণ করে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই ভারসাম্যের ওপর—রাষ্ট্র কি আবেগ ও নির্দিষ্ট মতাদর্শের নীতিতে পরিচালিত হবে, না কি বাস্তববাদী ও বিজ্ঞাননির্ভর চিন্তায় এগোবে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাত, যদি যথাযথ বিনিয়োগ ও স্বাধীন চিন্তার সুযোগ পায়, তবে বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে। কিন্তু মতাদর্শগত রাজনীতি যদি রাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে, তবে সমাজে কুসংস্কার ও বিভাজন বাড়বে, যা উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে।
সর্বোপরি বলা যায়, বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়ন ও আধুনিক সমাজ গড়তে হলে রাষ্ট্র পরিচালনায় নির্দিষ্ট মতাদর্শ নয়, বিজ্ঞান ও মানবকল্যাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। মতাদর্শ ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গায় থাকুক, আর রাষ্ট্রচিন্তা হোক যুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণাভিত্তিক—তবেই সম্ভব একটি সত্যিকারের উন্নত, সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
★দেশের যুব সম্প্রদায়কে দেশের উন্নয়নের জন্য কোন ধরণের শাসন ক্ষমতাকে সমর্থন করা উচিতঃ
একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার যুব সমাজ। তরুণ প্রজন্ম যদি সঠিক দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্ব পায়, তবে সে দেশ দ্রুত উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু ভুল নেতৃত্ব বা দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনব্যবস্থা তরুণদের শক্তিকে বিপথে নিতে পারে। তাই যুব সমাজের উচিত এমন নেতৃত্ব ও শাসনকে সমর্থন করা, যা সত্যিকার অর্থে দেশের উন্নয়নের পক্ষে কাজ করে। দেশের উন্নয়নের জন্য যুব সমাজকে গণতান্ত্রিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন করতে হবে। যে শাসনব্যবস্থা জনগণের মতামতকে মূল্য দেয়, প্রশাসনে স্বচ্ছতা বজায় রাখে, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও গবেষণায় বিনিয়োগ করে, এবং ধর্ম, বর্ণ বা দলীয় বিভাজন নয়, বরং জাতীয় ঐক্য ও মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেয়। একটি বিজ্ঞানভিত্তিক সরকার তরুণদের চিন্তাশক্তিকে মুক্ত করে, গবেষণা ও উদ্ভাবনে উৎসাহিত করে। দূরদর্শী নেতৃত্ব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা চিন্তা করে পরিকল্পনা নেয়, যেমন— টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষা, এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। তরুণরাই দেশের ভবিষ্যৎ স্থপতি। তাই তাদের উচিত অন্ধ দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে সেই নেতৃত্বকে সমর্থন করা, যে নেতৃত্ব জনগণের কল্যাণে, যুক্তি ও বিজ্ঞানের আলোকে কাজ করে। শুধু এমন শাসনই বাংলাদেশকে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাবান রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করতে পারে।
গোলাম এহিয়া,
সাবেক সভাপতি,
এশিয়ান হিউম্যান রাইটস এন্ড কালচারাল ফাউন্ডেশন,
জীবননগর উপজেলা শাখা,
চুয়াডাঙ্গা।