25/01/2026
ইনসাফ ভিত্তিক রাষ্ট্র আর বৈষম্য দূর করার সরকারের কারাগারে জীবিত বাবাকে দেখতে গিয়ে মৃত সন্তানের না বলা কথা…
বাবা,
ভুমিষ্ঠ হয়েই আমি দেখেছি এই পৃথিবীটা বড়ই নিষ্ঠুর। আমি পৃথিবীতে আসার পর তুমি আমাকে এক পলকের জন্যও দেখতে পারোনি। এখানে মানবাধিকারের বুলি কপচিয়ে পকেট ভারী করে তথাকথিত মানবাধিকারের ফেরিওয়ালারা। ওরা এক চোখা। ওদের হৃদয়ে মায়া নেই, মমতা নেই। ওরা কথা বলে হিসেব করে। কার জন্য কোথায় কী বললে স্বার্থ হাসিল হবে, এর বাইরে মুখে একটা রা’ শব্দও করে না ওরা।
বাবা,
তুমি তো জানো, মা তোমাকে বড্ড বেশি ভালোবাসতো। তোমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করবার জন্য আমাকে পেটে নিয়েই কি নিদারুন লড়াই করেছে। জেল গেটে গিয়ে তোমার দেখা না পেয়ে অশ্রুসজল চোখে ফিরে আসা। আদালতের বারান্দায় ভাবলেশহীন বসে থাকা।
আমি যখন পৃথিবীর আলোয় আসি, আমাকে বুকে জাপটে ধরে চালিয়ে গেছে সেই লড়াই। তোমার জামিন হয়েছিল। যেদিন জামিন হলো- মা, সেদিনও কেঁদেছে। বিজয়ের কান্না। কিন্তু আমার বোকাসোকা মা-টা জানতো না, তোমাকে ওরা কারাগার থেকে বের হতে দেবে না। মাম্মি ঘুর্ণাক্ষরেও টের পায়নি, নিষ্ঠুর জেল কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যে মিথ্যে মামলায় আবারো বাবাকে আটকিয়ে দেবে পুলিশ সুপার।
মা যখন বুঝতে পারলো, সহসাই তোমার মুক্তি মিলছে না, মিথ্যের বেড়াজালে ফেঁসে গেছো তুমি, শুধুমাত্র রাজনীতি করার অপরাধে তোমার প্রতি অবিচার চলতেই থাকবে, তখন হঠাৎই হাল ছেড়ে দিল। একরাশ শুণ্যতা গ্রাস করেছিল মাকে। যেন চারদিকে কেউ নেই। চোখের সামনে নিকষ অন্ধকার। একটা শুন্য মরুভূমি। মানুষরূপী জানোয়ারের অট্টহাসি হাসছে সবাই।
মা সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাবা,
আমি জানি, তুমি কারা প্রকোষ্ঠের অন্ধকারে দেয়ালের দিকে মাথা ঠিকরে নীরবে চোখের জল ফেলেছ। আমাকে দেখবার জন্য তোমার হৃদয় উথাল-পাতাল হয়েছে। আমারও হয়েছে। আমিও অপেক্ষায় ছিলাম কবে তোমার নির্ভরতার কোলে উঠতে পারবো।
মা খুব বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। তোমার শুন্যতায় যেন পাঁজর ভেঙ্গে যাচ্ছিল মায়ের। আমি টের পেতাম। আমি তো মায়ের কোলেই থাকতাম। মায়ের হৃদয়ের গভীরে কান পেতে শুনতে পেতাম শুধু কান্নার ধ্বনি।
মা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল প্রথমে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার। কিন্তু তুমিও নেই। কারাগার থেকে কথিত এই শান্তিার দূতিয়াল কবে তোমায় ছাড়বে তার তো কোনও ঠিক-ঠিকানা নেই। তুমিও নেই, মাও থাকবে না, আমার কি হবে?
এই চিন্তায় মায়ের ঘুম হারাম হয়ে গিয়েছিল। রাতভর নির্ঘুম থাকতো মা। এমনও রাত গেছে, দুচোখের পাতা এক করেনি একটি বারের জন্যেও। আমি ঘুমিয়েছি। কিন্তু আমার অন্তরাত্মা দেখেছে সবই। যদিও আমার করবার কিছু ছিল না। আমি মেনে নিয়েছি, মা যা ভালো মনে করে, তাই করুক। মায়ের চেয়ে আর কে-ই বা সন্তানের জন্য বেশি মঙ্গল কামনা করে?
তারপর একদিন ঘুমভাঙা এক সকালে স্থির হলো মা। সারাদিন আনমনে কাটিয়েছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকেছে নির্বাক। আমি আঁচ করতে পেরেছি। তুমি তো জানো- আমার মতো বয়সী শিশুরা সব বুঝতে পারে, কিন্তু তাদের করবার কিছু থাকে না। আমিও সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম। নিয়তিকে মেনে নিয়েছিলাম। শুধু কষ্ট হচ্ছিল, তোমার নির্ভরতার কোলে একবার উঠবার সৌভাগ্য আমার হলো না। কষ্ঠ হচ্ছিল, তুমি আমার পিঠে একবার হাত বুলিয়ে দিতে পারলে না। কষ্ঠ হচ্ছিল, আমার কপালে তুমি একটা চুমু দিতে পারলে না।
তারপর মধ্যরাতে, যখন থেমে গেছে সমস্ত কোলাহল। দূরে কোথাও একটা পেঁচা ডাকছিল থেমে থেমে। একটা টিকটিকি টিক টিক বলে দৌড়ে হারিয়ে গেলো দেয়াল বেয়ে। শীতল বাতাসে কম্বলের নিচে যখন প্রতিবেশীরা বিভোর ঘুমে। আমিও ঘুমিয়ে ছিলাম। যদিও দেখছিলাম সবই, অন্তরাত্মা দিয়ে। মা, আমাকে কোলে নিয়ে শেষবারের মতো কপালে এঁকে দিলেন শেষ চুমু। তারপর আস্তে আস্তে করে চেপে ধরলেন আমার গলাটা...।
তুমি কিছু একটা টের পেয়েছিলে বাবা?
তুমি তো ঘুমাওনি। কারাগারের সেলের ঠান্ডা দেওয়ালে হাঁটু ভাজ করে মাথা ঠেকিয়ে বসেছিলে। ভাবছিলে কি আমাদের নিয়ে কিছু?
বাবা,
আমার কোনও দুঃখ নেই। আমি মায়ের পেট চিড়ে বের হয়ে এসেছিলাম। মায়ের সঙ্গেই আবার ফিরে যাচ্ছি। শুধু দুঃখ, ওরা তোমাকে একটুকুর জন্য আমাদের শেষ বিদায় দিতে ছুটিটা মঞ্জুর করলো না। এতে কি এমন ক্ষতি হতো ওদের? ওরা এত নিষ্ঠুর কেন? আমার এই দেশটার কান্ডারি হয়েছে এখন শান্তির দূতিয়াল? তাঁর সাথে আছেন না আইনের অধ্যাপক, মানাধিকারের ফেরিওয়ালা? কি ক্ষতি হতো তাদের যদি একটুকু ছুটি দেওয়া হতো তোমায়?
বাবা,
ওরা যে ইনসাফের কথা বলে গলা ফাটায়, সেটা কী বাবা? সেটা কাদের জন্য? ওরা কি শুধু নিজেদের জন্য ইনসাফ চায়? মানুষ চিনে ইনসাফের কথা বলে? অথচ সকলেরই তো সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করার কথা। ওরা এত নিকৃষ্ঠ কেন বাবা?
যাইহোক, তোমাকে ছুটি দেয়নি তাতে কী হয়েছে। আমি আর মা তোমাকেই দেখতে এসেছি। তোমার কাছে বিদায় নিতে এসেছি। তোমাকে একটু ছুঁয়ে দেখবার শখ ছিল, তা পূরণ করতে এসেছি। পাঁচ মিনিট, তাতে কী? পাঁচ মিনিটই আমাদের জন্য ঢের সময়। জানি তুমি কষ্ট পাচ্ছো, তোমার বুকটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। কিন্তু কষ্ট পেয়ো না। একজন সর্বশক্তিমান, তিনি তো উপর থেকে সবই দেখছেন, তিনি এর উত্তম প্রতিদান দেবেন। ধৈর্য্য ধরো। আশায় বুক বাঁধো। সুদিন একদিন আসবেই বাবা।
আর হ্যাঁ, আমাকে কথা দাও। যদি সুদিন কোনওদিন আসে, আমাদের মতো যেন কারো পরিণতি না হয়, সেই চেষ্টাটা করে যাবে বাবা, প্লিজ। মানুষ হয়ে জানোয়ারের মতো প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ো না কখনো বাবা।
বিদায় বাবা।
দেখা হবে নিশ্চয়ই, যেখানে সকলকেই ফিরতে হবে এই নশ্বর জীবনের মায়া ও স্বার্থ ছেড়ে।
ভালো থেকো। নিজের প্রতি যত্ন নিও।
ইতি
তোমার চোখ খুলে না দেখা সন্তান।