24/05/2026
কোরবানির সূচনা
ইতিহাস ও জীবনীমূলক কিতাবাদি অধ্যয়ন করলে বুঝা যায় যে, পৃথিবীতে এমন কোন জাতি ছিল না যারা স্বীয় মাযহাব অনুসারে কোরবানি করেনি। কোরবানির এ ধারা, আদম (আ.)-এর পুত্র হাবিল-কাবিলের যুগ থেকে প্রবাহমান। হযরত আদম (আ:)-এর সন্তান হাবিল-কাবিলের মাঝে তাদের বোন আকলিমার বিবাহ নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিলে হযরত আদম (আ:) তাদেরকে ইখলাছের সহিত কোরবানি করার নির্দেশ দিয়ে বলেন: তোমাদের মধ্যে যার কোরবানি কবুল হবে তার সঙ্গেই এ মেয়েকে বিবাহ দেওয়া হবে। হযরত আদম (আ:) এর নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে, যে সত্য পথে আছে তার কোরবানিই গৃহীত হবে। তখনকার যুগে কোরবানি গৃহীত হওয়ার একটি সুস্পষ্ট নিদর্শন ছিল এই যে, আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা এসে কোরবানিকে বস্মীভূত করে আবার অন্তর্হিত হয়ে যেত। আর যে কোরবানি অগ্নি ভস্মীভূত করত না তাকে প্রত্যাখ্যাত মনে করা হত।
হাবিল ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি পশু পালন করত। সে তার পশুগুলো থেকে বেছে উৎকৃষ্ট একটি দুম্বা কোরবানি করল। আর কাবিল ছিল একজন কৃষক। সে কিছু শস্য, গম ইত্যাদি কোরবানির জন্য পেশ করল। অত:পর নিয়মানুযায়ী আকাশ থেকে একটি অগ্নিশিখা অবতরণ করে হাবিলের কোরবানিটি ভস্মীভূত করে দিল এবং কাবিলের কোরবানি যেমন ছিল, তেমনি পড়ে রইল অর্থাৎ হাবিলের কোরবানি আল্লাহ কবুল করে নিলেন কিন্তু কাবিলের কোরবানি আল্লাহ কবুল করলেন না। সেই ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ তা'য়ালা কোরআন মাজিদে এরশাদ করেছেন "হে হাবিব (সা:) আপনি তাদেরকে (আহলে কিতাবদেরকে) আদমের পুত্রদ্বয়ের (হাবিল ও কাবিলের) ঘটনা সঠিকভাবে পাঠ করে শুনিয়ে দিন; যখন তারা উভয়েই এক একটি কোরবানি উপস্থিত করল এবং তন্মধ্য হতে একজনের (হাবিলের) কোরবানি কবুল হল অপরজনের কোরবানি কবুল হল না। অপরজন বলতে লাগল: আমি তোমাকে নিশ্চয়ই হত্যা করবো; প্রথমজন বলল: আল্লাহ
খোদাভীরুদের আমলই কবুল করে থাকেন"। (আল মায়েদা ৬/২৭)
অত:পর হযরত আদম (আ:) নিজ সুন্দরী মেয়ে আকলিমাকে বিবাহ দেওয়ার জন্য যে মাপকাঠি নির্ধারণ করেছিলেন, সে মাপকাঠি অনুযায়ী হাবিল তাকে বিবাহ করার অনুমতিপ্রাপ্ত হলো। আর কাবিল বিয়ে করতে ব্যর্থ হল। এতে কাবিলের জেদ আরো বৃদ্ধি পেল। সে বলল: হে হাবিল আমি তোমার কারণে সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করতে ব্যর্থ হয়েছি, তাই আমি তোমাকে হত্যা করব। হাবিল তখন ক্রোধের জওয়াবে ক্রোধ প্রদর্শন না করে একটি মার্জিত ও নীতিগত বাক্য উচ্চারণ করল। এতে কাবিলের প্রতি তার সহানুভূতি ও শুভেচ্ছা ফুটে উঠেছিল। সে বলল: আল্লাহ তা'য়ালার নিয়ম এই যে, তিনি খোদাভীরুদের কর্মই গ্রহণ করেন। তুমি খোদাভীতি অবলম্বন করলে তোমার কোরবানিও গৃহীত হত। তুমি তো তা করনি, তাই তোমার কুরবানি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এতে আমার দোষ কি? আর তুমি আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে আমার দিকে হাত প্রসারিত করলেও আমি তোমাকে হত্যা করতে তোমার দিকে হাত প্রসারিত করব না। কারণ আমি বিশ্বজগতের পালনকর্তা আল্লাহকে ভয় করি। আমি চাই যে, আমার পাপ ও তোমার পাপ তুমি নিজের মাথায় চাপিয়ে নাও। অতঃপর তুমি জাহান্নামীদের অর্ন্তভুক্ত হয়ে যাও। এটাই অত্যাচারীদের শাস্তি।
একদিন হযরত আদম (আ:) হজ পালনের উদ্দেশ্যে পবিত্র মক্কায় তাশরীফ নিয়ে গেলেন। কাবিল এই সুযোগকে হাত ছাড়া করেনি। সে এই সুযোগে তার ভাই হাবিলকে হত্যা করে ফেলল। হত্যার পরে কাবিলের মন গলে যায় এবং সে অনুভব করে, আহারে! এত বড় ভুল করে ফেললাম। নিজের ভাইকে নিজ হাতে হত্যা করে দিলাম! এর চেয়ে বড় ধৃষ্টতা আর কি হতে পারে? ভেতরে ভেতরে সে অনেক অনুতপ্ত হল এবং নিজের অপকর্ম কিভাবে ঢাকবে তা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেল। তখনো পর্যন্ত পৃথিবীতে মৃতদেহ সৎকারের ব্যাপারে বিশেষ কোন নিয়ম ছিল না। কারণ এর আগে আর কোন মানুষের মৃত্যু ঘটেনি। মৃতদেহটিকে নিয়ে কি করবে এ নিয়ে যখন সে চিন্তায় মগ্ন, তখন সে দেখতে পেল, একটি কাক তার ঠোঁট দিয়ে ঠুকরে ঠুকরে একটি গর্ত করল অত:পর সেই গর্তে একটি মৃত কাককে টেনে এনে কবর দিয়ে দিল। এটি দেখে কাবিল ভাবল, তাকেও হয়ত এভাবে কবর দিতে বলা হচ্ছে। তাই একটি গর্ত করে সে তার ভাইকে কবর দিয়ে দিল। ইসলামের ইতিহাসে এটিই ছিল মানবজাতির প্রথম কবর।
পবিত্র কোরআনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আয়াত রয়েছে, যাতে এ কথা উল্লেখ আছে যে, "যে ব্যক্তি কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করলো, সে যেন পৃথিবীর সব মানুষকেই হত্যা করলো। আর যে ব্যক্তি কারো জীবন রক্ষা করলো সে যেন পৃথিবীর সব মানুষের জীবনই রক্ষা করল" (সূরা আল মায়িদাহ ৬/৩২) নাবী কারিম (সা:) বলেছেন যে, "পৃথিবীতে যত অন্যায় হত্যাকান্ড সংঘটিত হবে, তার পাপের একটা ভাগ আদম (আঃ)- এর প্রথম পুত্রের ওপরও বর্তাবে। কারণ সে-ই প্রথমে হত্যার রীতি চালু করে"।
🔹বিভিন্ন তাফসীর ও হাদিসের কিতাবাদি থেকে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে, সর্বপ্রথম হাবিল ও কাবিল তাদের কোরবানি দিয়ে ছিল বর্তমান দামেস্কের নিকটে যা বর্তমান সিরিয়ার রাজধানী। আর দামেস্কের নিকটেই "হাইলে কাসিউন" নামক একটি স্থান রয়েছে, সেখানে একটি বিশেষ স্থানে হাবিল নিহত হয়েছে বলে মনে করা হয়। এ জন্য হাজার হাজার লোক ঐ স্থানে জিয়ারত করতে যায়।
আল্লামা আসাকির (র.) আহমদ বিন কাসিরের জীবনী গ্রন্থে তাঁর এক স্বপ্নের কথা উল্লেখ করে বলেন: আহমদ বিন কাসির (র.) হুজুর (স:) কে স্বপ্নে দেখেছিলেন। হুজুর (স:) এর সাথে হাবিল-কাবিলও ছিল। হাবিল শপথ করে বলল যে, ইহাই আমার নিহত হওয়ার স্থান। আর হুজুর (স:) তার কথা সত্য বলে স্বীকার করলেন।
পরিশেষে মহান আল্লাহ তা'য়ালার নিকট প্রার্থনা করছি যে, তিনি যেন আমাদের সকলকে অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা, হত্যায় উদ্বুদ্ধ করা বা সহযেগিতা করা থেকে বাঁচিয়ে রাখেন।