21/05/2025
প্রথমে আদর্শ, পরে ক্ষমতা: মওদুদী (রহ.)-এর চিন্তায় ইসলামী আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট পথ
বর্তমান সময়ে ইসলামী আন্দোলন বা ইসলামী রাজনৈতিক চেতনার পুনর্জাগরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য আগে কী করতে হবে? সাংগঠনিক প্রস্তুতি, নাকি সরাসরি রাজনৈতিক মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়া?
এই প্রশ্নের বিশ্লেষণে বারবার ফিরে যেতে হয় উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আবুল আ’লা মওদুদী (রহ.)-এর চিন্তার কাছে। তিনি শুধু একজন লেখক বা দার্শনিকই ছিলেন না, বরং একজন সংগঠক, রাহবার এবং কার্যকর ইসলামী আন্দোলনের রূপকার। তার বক্তব্যে বারবার উচ্চারিত হয়েছে—ক্ষমতার দিকে যাওয়ার আগে চাই আদর্শিক সংগঠন গঠন ও চারিত্রিক প্রস্তুতি।
-
১. ইসলামী রাষ্ট্রের পূর্বশর্ত: সংগঠন, আদর্শ ও চরিত্র
• মওদুদী (রহ.) তার বিখ্যাত বই "তেহরিকে ইসলামী কি আখলাকি বুনিয়াদেন"–এ বলেন: “ইসলামী আন্দোলন এমন লোকদের মাধ্যমেই সফল হবে যারা নিজেদের জীবনকে ইসলামের আলোকে গড়ে তুলেছে। নেতৃত্ব পেতে হলে প্রথমে এমন ক্যাডার সৃষ্টি করতে হবে যাদের ভেতরে নৈতিকতা, আদর্শ এবং একাগ্রতা রয়েছে।” (সূত্র: Tehrik-e-Islami ki Akhlaqi Bunyaden, পৃষ্ঠা ১৫)
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সভ্যতা ও মূল্যবোধের নাম। এই মূল্যবোধের বাহক হওয়ার মত শক্তিশালী, আদর্শিক এবং নৈতিক সংগঠন না থাকলে রাজনৈতিক ক্ষমতা ইসলামের জন্য উপকারী নয়, বরং ক্ষতিকর হতে পারে।
-
২. ক্ষমতা নয়, বরং আদর্শ প্রতিষ্ঠাই মূল লক্ষ্য
• মওদুদী (রহ.)-এর ভাষায়: “আমাদের সংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো নেতৃত্বের পরিবর্তন, কিন্তু তা হতে হবে আল্লাহভীরু, আদর্শিক নেতৃত্বে রূপান্তরের মাধ্যমে।”
(সূত্র: তেহরিকে ইসলামী কি আখলাকি বুনিয়াদেন, পৃষ্ঠা ২১)
-
৩. সরাসরি রাজনীতি নয়, সাংগঠনিক প্রস্তুতিই তার পথ
• মুসলিম লীগ যখন সরাসরি ভারতবর্ষের রাজনৈতিক লড়াইয়ে অংশ নিচ্ছিল, তখন মাওলানা মওদুদী (রহ.) ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন "জামাআতে ইসলামী"। এ থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়, তিনি রাজনীতি করাকে অস্বীকার করেননি, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন মনে করেছেন আদর্শিক দাওয়াত, চিন্তাগত প্রশিক্ষণ এবং সংগঠন গঠনকে।
-
৪. সতর্কতা: চরিত্রহীন নেতৃত্ব ইসলামী আন্দোলনের অন্তরায়
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যে তিনি বলেন:
• “যদি ইসলামের নামে এমন লোক ক্ষমতায় আসে, যাদের চিন্তা ও চরিত্র ইসলামী নয়—তাহলে তারা ইসলামকে আরও কলঙ্কিত করবে।”
(সূত্র: “Risala Dastoori Hayate Tayyiba”, পৃষ্ঠা ১০)
-
ধৈর্য, দাওয়াত ও কাঠামোগত নির্মাণ—এটাই মাওঃ সাহেবের বাতলে দেয়া পথ।
• মওদুদী (রহ.) ক্ষমতা বা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অস্বীকার করেননি; বরং তার কাছে ক্ষমতা হচ্ছে এক দীর্ঘ আদর্শিক সংগ্রামের ফলাফল। এজন্য তিনি সরাসরি রাজনৈতিক মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে নৈতিক, আদর্শিক ও সাংগঠনিক প্রস্তুতির ওপর জোর দিয়েছেন।
-
শেষ কথাঃ আজ যারা ইসলামী রাজনীতির কথা বলেন, তাদের উচিত মওদুদী (রহ.)-এর মত সংগঠন ও আদর্শ গঠনের ধাপে ধাপে পথ অনুসরণ করা। রাজনৈতিক ক্ষমতা তখনই কল্যাণকর হবে, যখন তার পেছনে থাকবে একটি আদর্শিক, আত্মশুদ্ধ সংগঠন—যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাজ করে, ক্ষমতার জন্য নয়।
-
উৎস:-
• Tehrik-e-Islami ki Akhlaqi Bunyaden, মাওলানা আবুল আ’লা মওদুদী, পৃষ্ঠা ১৫–২১
• Risala Dastoori Hayate Tayyiba, পৃষ্ঠা ১০
• Siyasi Kashmakash, Vol. 1, পৃষ্ঠা ৫–৯
• Jamaat-e-Islami archives & Mawdudi.org