23/07/2026
Garden/bd # গ্রাফটিং (কলম) করা গাছ কি সত্যিই তাড়াতাড়ি মারা যায়? নাকি এটি একটি ভুল ধারণা?
অনেকের মুখে একটি কথা শোনা যায়—**"কলম করা (গ্রাফটিং) গাছ বেশি দিন বাঁচে না।"** এই ধারণার কারণে অনেকেই কলমের চারা কিনতে ভয় পান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ধারণা কি সত্যিই সঠিক?
**সংক্ষেপে উত্তর হলো—না।** সঠিক নিয়মে তৈরি ও পরিচর্যা করা গ্রাফটিং করা গাছ শুধু ভালোই বাঁচে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত ফল দেয় এবং বছরের পর বছর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠে।
# # গ্রাফটিং আসলে কী?
গ্রাফটিং বা কলম হলো এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে একটি উন্নত জাতের গাছের ডাল (Scion) একটি শক্তিশালী ও সুস্থ মূলযুক্ত গাছের (Rootstock) সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কিছুদিন পর দুটি অংশ একসঙ্গে জোড়া লেগে একটি নতুন গাছ তৈরি হয়।
এই পদ্ধতি শত শত বছর ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আম, লিচু, কমলা, লেবু, আপেল, নাশপাতি, গোলাপসহ অসংখ্য গাছে সফলভাবে ব্যবহার হয়ে আসছে।
# # তাহলে মানুষ কেন বলে কলমের গাছ বেশি দিন বাঁচে না?
এই ধারণার পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ আছে।
**১. নিম্নমানের চারা**
সব নার্সারির চারা এক মানের হয় না। যদি দুর্বল রুটস্টক বা অপরিপক্ব ডাল দিয়ে কলম করা হয়, তাহলে গাছ দুর্বল হতে পারে।
**২. ভুলভাবে গ্রাফটিং করা**
কলমের অংশ ঠিকভাবে না জোড়া লাগলে বা ক্যাম্বিয়াম স্তর না মিললে গাছ পরে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
**৩. পরিচর্যার অভাব**
অনেকেই চারা লাগানোর পর নিয়মিত পানি, সার, আগাছা পরিষ্কার বা রোগবালাই দমন করেন না। ফলে গাছ মারা যায়। কিন্তু এর জন্য গ্রাফটিং দায়ী নয়।
**৪. পানি জমে থাকা বা মাটির সমস্যা**
গাছের গোড়ায় দীর্ঘদিন পানি জমে থাকলে শিকড় পচে যেতে পারে। এটিও গ্রাফটিংয়ের সমস্যা নয়।
# # তাহলে গ্রাফটিং কেন করা হয়?
যদি কলমের গাছ এত খারাপ হতো, তাহলে বিশ্বের অধিকাংশ বাণিজ্যিক ফলের বাগানে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো না।
গ্রাফটিং করার প্রধান কারণগুলো হলো—
* দ্রুত ফল পাওয়া যায়।
* মাতৃগাছের গুণাগুণ একই থাকে।
* ফলের আকার, স্বাদ ও মান ভালো থাকে।
* অনেক ক্ষেত্রে রোগ সহনশীল রুটস্টক ব্যবহার করা যায়।
* বাণিজ্যিকভাবে মানসম্মত চারা উৎপাদন সম্ভব হয়।
# # গ্রাফটিং করা গাছ কত বছর বাঁচতে পারে?
এটির নির্দিষ্ট কোনো একক উত্তর নেই। কারণ গাছের আয়ু নির্ভর করে—
* গাছের প্রজাতি
* রুটস্টকের মান
* গ্রাফটিংয়ের গুণগত মান
* মাটি ও জলবায়ু
* নিয়মিত পরিচর্যা
অনেক কলম করা আম, লিচু, লেবু ও অন্যান্য ফলগাছ **২০–৫০ বছর বা তারও বেশি সময়** ভালোভাবে বেঁচে থাকে, যদি সঠিক পরিচর্যা করা হয়। আবার অবহেলায় বীজের গাছও অল্প বয়সে মারা যেতে পারে।
অর্থাৎ **গাছ কতদিন বাঁচবে, তা শুধু গ্রাফটিংয়ের ওপর নির্ভর করে না।**
# # একটি বাস্তব উদাহরণ
বাংলাদেশে অধিকাংশ বাণিজ্যিক আম, লিচু, লেবু ও পেয়ারার বাগানে কলমের চারা ব্যবহার করা হয়। কারণ কৃষকরা জানেন, এতে দ্রুত ফল আসে এবং বাজারে চাহিদাসম্পন্ন মানের ফল পাওয়া যায়। যদি কলমের গাছ কয়েক বছরের মধ্যেই মারা যেত, তাহলে কেউ কোটি কোটি টাকার বাগান কলমের চারা দিয়ে তৈরি করতেন না।
# # সঠিক চারা চিনবেন কীভাবে?
* বিশ্বস্ত নার্সারি থেকে কিনুন।
* কলমের জোড়া শক্ত ও সুন্দরভাবে যুক্ত আছে কিনা দেখুন।
* গাছের কাণ্ড মোটা ও সুস্থ হওয়া উচিত।
* রোগাক্রান্ত বা শুকিয়ে যাওয়া চারা কিনবেন না।
# # উপসংহার
**"গ্রাফটিং করা গাছ বেশি দিন বাঁচে না"—এটি সম্পূর্ণ সত্য নয়।** এই ধারণা মূলত নিম্নমানের চারা, ভুল গ্রাফটিং এবং অপর্যাপ্ত পরিচর্যার কারণে তৈরি হয়েছে।
একটি ভালো মানের কলমের চারা যদি সঠিকভাবে রোপণ ও পরিচর্যা করা হয়, তবে সেটি বহু বছর সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারে এবং নিয়মিত উন্নত মানের ফল দিতে পারে।
**তাই গুজবে নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্যের ওপর বিশ্বাস রাখুন। ভালো নার্সারি থেকে মানসম্মত কলমের চারা সংগ্রহ করুন এবং নিয়মিত পরিচর্যা করুন—তাহলেই একটি গ্রাফটিং করা গাছও দীর্ঘদিন আপনার বাগানকে সমৃদ্ধ করবে।**