24/07/2026
জনপ্রিয় শিক্ষক মোহাম্মদ মহসিনের বদলিতে ক্ষোভ: জলাবদ্ধতার দায়ে শাস্তিমূলক বদলি নিয়ে উঠছে প্রশ্ন
-------------------------------------------
নিজস্ব প্রতিবেদক,
কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের ইংরেজি বিভাগের জনপ্রিয় শিক্ষক মোহাম্মদ মহসিনের আকস্মিক বদলিকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সুশীল সমাজের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। কলেজের জলাবদ্ধতার ঘটনায় সাতজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার অংশ হিসেবে তাঁকে বরগুনা জেলায় বদলি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন এবং নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া এমন পদক্ষেপ গ্রহণ না করার দাবি তুলেছেন।
শিক্ষার্থীদের কাছে মোহাম্মদ মহসিন শুধু একজন শিক্ষক নন; তিনি একজন অভিভাবক, পরামর্শদাতা ও মানবিক মানুষ হিসেবেও সুপরিচিত। তাঁর পাঠদানের স্বতন্ত্র ধরন, আন্তরিকতা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তাঁকে কলেজের অন্যতম জনপ্রিয় শিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর নীরব মানবিক উদ্যোগের অংশ। অনেক শিক্ষার্থীর বই কেনার সামর্থ্য না থাকলে তিনি নিজ উদ্যোগে তহবিল সংগ্রহ করে বই কিনে দিতেন। আবার কারও পরীক্ষার ফি বা বেতন পরিশোধে সমস্যা হলে ব্যক্তিগতভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন। এসব কাজ তিনি কখনো প্রচারের জন্য করেননি; বরং নীরবে মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই করে গেছেন।
এদিকে কলেজের জলাবদ্ধতার ঘটনায় সাতজন শিক্ষকের ওপর দায় বর্তানোর বিষয়টি জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জলাবদ্ধতা সাধারণত অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি, নির্মাণকাজের ত্রুটি কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ফল হয়ে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, শিক্ষকদের প্রধান দায়িত্ব হলো পাঠদান, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা। যদি তাঁরা অবকাঠামো নির্মাণ, প্রকৌশল বা রক্ষণাবেক্ষণসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা বাস্তবায়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকেন, তাহলে কেবল তাঁদের ওপর দায় চাপানো ন্যায়সংগত নয়।
তবে সংশ্লিষ্ট কোনো শিক্ষক যদি প্রশাসনিক দায়িত্বে থেকে অবহেলা, গাফিলতি বা ভুল সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সমস্যাটি সৃষ্টি বা দীর্ঘায়িত করে থাকেন এবং তা তদন্তে প্রমাণিত হয়, তাহলে আইন ও বিধি অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগে বা পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া দায় নির্ধারণ করা ন্যায়বিচার ও সুশাসনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মত প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
মোহাম্মদ মহসিনের বদলির বিষয়টি পারিবারিক দিক থেকেও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তাঁর একটি প্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে, যার সার্বক্ষণিক দেখভালের প্রয়োজন হয়। তাঁর সহধর্মিণীও একজন চাকরিজীবী। ফলে দুজনের কর্মব্যস্ততার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সন্তানের পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে শত শত কিলোমিটার দূরের বরগুনায় বদলি হওয়ায় পরিবারটি বড় ধরনের সংকটে পড়েছে বলে স্বজনরা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে মোহাম্মদ মহসিনের সহধর্মিণী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন এক পোস্টে লিখেছেন—
“প্রথম বিসিএসে শিক্ষকতা পেশাটাকেই বেছে নিয়ে জেনারেলের বাকি পরীক্ষাগুলো আর দিলে না। একেবারে আদর্শ শিক্ষক যাকে বলে, ছাত্রদের উজাড় করে দিলে নিজের যতটুকু জ্ঞান আছে। গরিব ছাত্রদের জন্য শিক্ষাবর্ষের শুরুতে তহবিল সংগ্রহ করে বই কিনে দেওয়া, বিনা পয়সায় পড়ানো, ছাত্রদের পারিবারিক বিষয়ে খোঁজখবর রাখা—কোনো প্রচারণায় না গিয়ে করে গিয়েছো একেবারে নীরবে-নিভৃতে। তোমার ক্ষতি—হয়তো আমাদের প্রতিবন্ধী সন্তানের দেখভালের কষ্ট হবে, কিন্তু তোমার ছাত্রদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হবে, সেটা কীভাবে পূরণ হবে?”
এদিকে কুমিল্লার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মোহাম্মদ মহসিনের বদলি আদেশ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারণ করা হোক। তদন্তে কোনো ব্যক্তির দায় প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া শাস্তিমূলক বদলি একজন নিষ্ঠাবান ও জনপ্রিয় শিক্ষকের প্রতি অবিচার বলেই মনে করছেন তাঁরা।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, একটি গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ব্যক্তিকে নয়, সমস্যার প্রকৃত কারণকে চিহ্নিত করাই হওয়া উচিত। তথ্য-প্রমাণভিত্তিক নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ন্যায়বিচারের অন্যতম শর্ত।তাঁদের প্রত্যাশা, সরকার বিষয়টি মানবিক ও ন্যায়সঙ্গত দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করবে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের আলোকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
প্রকাশের আগে একটি বিষয় যাচাই করে নেওয়া ভালো হবে—জলাবদ্ধতার ঘটনায় সাতজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও মোহাম্মদ মহসিনের বদলি "শাস্তিমূলক" ছিল কি না, সে বিষয়ে সরকারি আদেশ বা নির্ভরযোগ্য সূত্র থাকলে সেটি উল্লেখ করুন। এতে প্রতিবেদনটি আরও শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ হবে।