16/05/2026
গল্পের নাম: #মরীচিকার_ওপারে_শান্তি
ভাবনায় ও লিখনীতে: রাবেয়া রীমা
বিকেলের মৃদু আলোয় বারান্দায় এসে দাঁড়াল রীতা। হাতে এক কাপ চা। ঢাকা শহরের বহুতল ভবনগুলোর দিকে তাকালে তার ইদানীং কেমন যেন দমবন্ধ লাগে। চারদিকে শুধু এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা। কে কার চেয়ে দামি গাড়ি কিনল, কার পরনের জামাটা কোন ব্র্যান্ডের, কে কত হাজার টাকা রেস্তোরাঁয় উড়িয়ে এল—এই নিয়েই সবার মাতামাতি।
অথচ এই তো সেদিন, রীতা তার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাসায় গিয়েছিল। ড্রয়িংরুমে বসে সোফার কুশন থেকে শুরু করে গায়ের চাদর—সবকিছুর দাম আর ব্র্যান্ডের ফিরিস্তি দিচ্ছিলেন গৃহকর্ত্রী। রীতা চুপ করে শুনছিল আর ভাবছিল, “আসলে আমরা মানুষরা কী করছি? আদৌ কি আমরা জানি জীবনটা কত ক্ষুদ্র?”
একটু আগেই সে খবর পেয়েছে, তাদের এলাকার এক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেটি তার বাবার কাছে পাঁচ হাজার টাকার একটা ব্র্যান্ডের শার্টের জন্য বায়না ধরেছে। মধ্যবিত্ত বাবা কপালে চিন্তার ভাঁজ নিয়ে বসে আছেন। বড়লোকদের সাথে টেক্কা দিতে গিয়ে আজ মধ্যবিত্তরা নিজেদের পিষে ফেলছে। আর যারা ধনী, তারা ছুটছে আরও উপরে ওঠার নেশায়।
রীতা মনে মনে ভাবলো দুই দিনের এই দুনিয়া। একটা মানুষ বড়জোর কয় বছর বাঁচে। অথচ এই ছোট্ট জীবনে কত আকাঙ্ক্ষা, কত উচ্চবিলাসিতা! কেন চার-পাঁচ হাজার টাকার ব্র্যান্ডের পোশাক না পরলে কি শরীর ঢাকা যায় না? একটা দুইশো বা পাঁচশো টাকার সাধারণ পোশাকেও তো একজন মানুষকে সমান সুন্দর এবং মার্জিত দেখায়। তাহলে কেন এই টাকার অহংকার দেখানো?
তার মনে পড়ল আল্লাহর সেই বাণী—ধন-সম্পদ তো আসলে একটা পরীক্ষা। আল্লাহ মানুষকে টাকা দেন এটা যাচাই করার জন্য যে, সে কোন খাতে তা খরচ করছে। অতিরিক্ত এই টাকার ওপর যে সমাজের দুঃখী, দরিদ্র, মুসাফির আর ক্ষুধার্ত মানুষের হক আছে, তা আজ আমরা ভুলেই গেছি। ব্র্যান্ডের দোকানে হাজার হাজার টাকা বিল করার সময় আমাদের বুক কাঁপে না, অথচ রাস্তার পাশের ক্ষুধার্ত শিশুটার দিকে চেয়ে দশটা টাকা বের করতে আমাদের হাত কাঁপে।
রীতা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ভাবল, শতভাগ সৎ পথে কামানো টাকা কি কেউ এভাবে অপচয় করতে পারে? সৎ পথের উপার্জনে একটা বরকত থাকে, একটা মায়া থাকে। তা কখনো বিলাসিতার স্রোতে ভাসিয়ে দেওয়া যায় না। মানুষ আজ টাকা ছাড়া কিছুই বোঝে না, টাকার মোহে অন্ধ হয়ে সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে ফেলছে। কিন্তু দিনশেষে কঠোর পরিশ্রম, অল্প আয় আর অল্প খাবার—এটাই তো ইসলামের মূল শিক্ষা। অল্পতেই তৃপ্ত থাকার মাঝেই লুকিয়ে আছে আসল রাজকীয়তা।
রীতার নিজেরও খুব বড় কোনো চাওয়া নেই। সে মনেপ্রাণে আল্লাহর কাছে একটাই প্রার্থনা করে—"হে আল্লাহ, যতদিন বাঁচি, কম খাব, কম পরব, সাধারণ হয়ে থাকব। কিন্তু তোমার সন্তুষ্টি যেন আমার সাথে থাকে।"
ঠিক তখনই বারান্দার গ্রিলের ফাঁক গলে একটা চড়ুই পাখি এসে বসল কার্নিশে। পাখিটা কোথাও থেকে ছোট্ট একটা ধানের শীষ মুখে করে নিয়ে এসেছে। সেটা খুঁটে খুঁটে খেয়েই সে তৃপ্তির সুরে কিচিরমিচির করে ডানা মেলে আকাশে উড়ে গেল।
পাখিটার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রীতার মনে এক পরম সত্যের উদয় হলো। এই প্রকৃতির দিকে তাকালে কত বড় শিক্ষা পাওয়া যায়! পাখিরা তো আগামীকালের জন্য কোনো খাবার জমিয়ে রাখে না, আলিশান খাঁচার লোভ করে না। আল্লাহ তাদের যেভাবে যতটুকু দেন, তাতেই তারা সুখী। অথচ আমরা মানুষরা আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব হয়েও একটা পাখি বা অবুঝ প্রাণীর সমপরিমাণ সন্তুষ্টি নিজেদের মনে ধরে রাখতে পারছি না।
রীতা উপলব্ধি করল, এই দুনিয়াটা আসলে একটা পরীক্ষাকেন্দ্র মাত্র। পরীক্ষাকেন্দ্রে কেউ দামি চেয়ার-টেবিলে বসল নাকি সাধারণ বেঞ্চে বসল, তা দিয়ে যেমন মেধার বিচার হয় না; ঠিক তেমনি কে কত দামি ব্র্যান্ডের জামা পরল আর কত দামি গাড়ি চড়ল, তা দিয়ে আল্লাহর দরবারে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ হয় না। আসল বিচার তো হবে আমাদের খাতার ভেতরের উত্তরগুলো দিয়ে—আমরা কীভাবে চললাম, কতটা সৎ থাকলাম এবং মানুষের প্রতি কতটা দয়া দেখালাম।
বিলাসিতা আসলে একটা চোরাবালি। মানুষ যত এর পেছনে ছুটবে, তত বেশি নিচে তলিয়ে যাবে। এর কোনো শেষ নেই। তৃপ্তি কখনো ব্র্যান্ডের দোকানে বা টাকার অঙ্কে কেনা যায় না, তৃপ্তি থাকে মনের ভেতরের শুদ্ধতায়। কিসের পেছনে ছুটছে এই সমাজ? মরীচিকার পেছনে ছুটে তো কখনো তৃষ্ণা মেটে না!
পৃথিবীর সব ব্র্যান্ডের গাড়ি আর দামি কাপড়ের মোহকে পেছনে ফেলে রীতা যখন ঘরে ফিরে এল, তখন তার মনটা এক অদ্ভুত হালকা আর শান্তিতে ভরে গেছে। সে বুঝতে পারল, কম টাকা, কম আয় আর অল্প খাবারে যে কঠোর পরিশ্রমের জীবন—তাতেই লুকিয়ে আছে স্রষ্টার নৈকট্য আর আত্মার আসল স্বাধীনতা। এই দুই দিনের পৃথিবীর মোহে নিজেকে বিলীন না করে, অল্পতে বেঁচে থাকার মাঝেই জীবনের সবচেয়েবড় সার্থকতা।
"এই গল্পটি কোনো কাল্পনিক গল্প নয়, বরং আমাদের আজকের সমাজের বাস্তব চিত্র। এটি সম্পূর্ণ আমার নিজের চিন্তা, অনুভূতি এবং একান্ত নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে লেখা। চারপাশের এই অন্ধ প্রতিযোগিতার ভিড়ে আমাদের মন যেন একটু থমকে দাঁড়ায়, সেই তাগিদ থেকেই এই লেখার জন্ম। আশা করি, এই ছোট্ট বার্তাটি সমাজের জন্য একটি পজিটিভ মেসেজ বয়ে আনবে এবং আমাদের জীবনের দৃষ্টিভঙ্গিটা কিছুটা হলেও বদলে দিতে সাহায্য করবে।"
⚠️ কপিরাইট সতর্কতা:
এই লেখাটি সম্পূর্ণ আমার নিজের চিন্তা ও অনুভূতির প্রকাশ। লেখিকার নাম বাদ দিয়ে বা পরিবর্তন করে এটি অন্য কোথাও পোস্ট করা থেকে বিরত থাকুন। ভালো লাগলে লেখিকার নামসহ সরাসরি শেয়ার করার অনুরোধ রইল। অন্যের সৃজনশীলতাকে সম্মান করুন।