10/03/2025
মেঘের আড়ালে - পর্ব ১১: শেষ দিনের সন্ধ্যা
তিন মাস পর...
রাইসা জানালার পর্দায় হালকা বাতাসের উড়ে আসা শব্দে উঠে আসে সুমনের চোখ। তার শরীর ক্লান্ত, অবসন্ন, আর ভিতরে একটা অসহ্য যন্ত্রণা। সেদিন থেকে তার অবস্থা ক্রমাগত খারাপ হতে শুরু করেছে। মা আজ বাসায় নেই, তবে রাইসা তাঁর পাশে ছিল, ঠিক যেমন তাকে প্রতিদিন প্রয়োজন। কিন্তু আজ, সুমন জানতো, আর বেশি সময় নেই।
রাইসা বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। বাতাসে পাতা ঝরে পড়ছিল, কিন্তু তার মন ছিল একেবারে সুমনের কাছে। সে জানতো, কিছু একটা অদ্ভুতভাবে হয়ে যাচ্ছে—সুমনের হাসিটা কেমন যেন মিছে, চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে, আর মাঝে মাঝে সে কথা বলার সময় এমনভাবে কাঁপতে থাকে, যেন সমস্ত শরীর একদম নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। রাইসা অনুভব করতে পারছিল, কিছু একটা গণ্ডগোল হচ্ছে। কিন্তু সে কিছু বলতো না, শুধুমাত্র নিজের হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে থাকত।
রাইসা যখন রান্না ঘরে রান্না করছিল, তখন সুমন চোখ বন্ধ করে শুয়ে ছিল। তার মাথায়, শরীরে একপ্রকার অস্বাভাবিক শূন্যতা অনুভব হচ্ছিল। সে জানতো, এটা এখন একদম শেষ দিন। সেই ক্ষণটি তার জীবনে আসতে আর কোনো দেরি ছিল না।
বিলাসী পোশাক, বিয়ের সজ্জা, সমস্ত কিছু সুমনকে আর টানছিল না। তবে, রাইসার কাছে তার জানানো অসম্ভব সিদ্ধান্তটা এক মুহূর্তের জন্যও সহজ ছিল না। রাইসা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে সুমনের কাছে চলে আসে। সে শান্তভাবে বলেছিল, "তুমি কি আমাকে কিছু বলবে না, সুমন?"
সুমন নিজেকে যতটা সম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করে, বলল, "রাইসা, আমি ঠিক আছি। শুধু একটু ক্লান্ত লাগছে, কিছু নয়।" কিন্তু তার কণ্ঠের অস্ফুট শব্দে বুঝতে পারছিলো রাইসা, কিছু একটা আছেই।
"তুমি মিথ্যে বলছো," রাইসা বলল, চোখে তীব্র প্রশ্ন। "তুমি এখন আর আগের মতো হাসো না, হুটহাট চুপ হয়ে যাও, ফোন ধরো না... এসব কিসের লক্ষণ, সুমন?"
সুমন কিছুক্ষণ চুপ ছিল। তবুও, একসময় সে ধীরে ধীরে বলল, "রাইসা, আমি অসুস্থ। আর এটা এমন এক অসুখ... যা কখনো ভালো হবে না।"
রাইসার হৃদয়ে হঠাৎ এক ভারী শূন্যতা নেমে এল। তার গলা বন্ধ হয়ে আসে, তার চোখে জল। তার সামনের ব্যক্তিটি, যার জন্য সে নিজের জীবনের সব স্বপ্ন দেখেছিল, সে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এই সত্যি মেনে নেওয়া তার পক্ষে কঠিন ছিল, কিন্তু সে জানতো, সুমন একা সেটা গ্রহণ করতে পারে না।
"আমি চাই না তুমি কষ্ট পাও, রাইসা," সুমন বলল, চোখের কোণে অশ্রু জড়াতে জড়াতে। "আমি চাই না তুমি আমার জন্য নিজের জীবন নষ্ট করো। তুমি চলে যাও, রাইসা।"
এ কথাটা বলার পর, রাইসা চলে যায়নি। সুমন অনুভব করল, তার হাতটি শক্ত করে ধরেছে। রাইসার চোখে জল ছিল, কিন্তু তার কণ্ঠে দৃঢ়তা ছিল। "সুমন, আমি তোমার ব্যথা ভাগ করে নিতে পারব না, কিন্তু আমি তোমার পাশে থাকব। যতদিন পারি, যতদিন তুমি থাকতে চাও... আমি থাকব।"
এই মুহূর্তে সুমনের মনে এক অসীম শান্তি বিরাজ করেছিল। তাকে কোনো সাহায্য, কোনো দুঃখবোধের প্রয়োজন ছিল না। তার পাশে রাইসা ছিল, আর এটিই তার কাছে সবচেয়ে বড় শান্তি ছিল।
রাইসার পরিবার, বিশেষত তার মা-বাবা, এই সিদ্ধান্তটি কখনোই মেনে নিতে পারছিল না। তারা চাইছিল, রাইসা একজন সফল ব্যক্তিকে বিয়ে করুক, যার জীবন রাইসাকে কিছু দিতে পারবে। কিন্তু রাইসার দৃঢ় মনোভাব ছিল—সে সুমনের পাশে দাঁড়াবে, যতদিন তার জীবন থাকবে।
রাইসার আজ বিয়ে
তবে সুমনের সাথে নই
বিশাল বিজনেস ম্যান ফাহিম চৌধুরীর সাথে।
এদিকে, সুমনের মা শামিমা, জানতেন না কীভাবে তার ছেলের পরিস্থিতি মোকাবিলা করবেন। তিনি জানতেন, সুমনের রোগের শেষ মুহূর্তটা আসন্ন, কিন্তু তিনি একেবারে অজানা ছিলেন—কিভাবে তাঁকে সান্ত্বনা দেবেন? কীভাবে তাকে এই ভীষণ যন্ত্রণার সময় একা ছেড়ে দেবেন?
বিয়ের সাজে রাইসা।
শেষ দেখা করতে এসেছে
হ্যা শেষ দেখা
সুমন চোখ বন্ধ করে জেগে আছে।
রাইসা আসছে জেনেও চোখ খুলেনি।
সুমন যতটা পারছিল, রাইসার হাতটা শক্ত করে ধরেছিল। সে জানতো, এক সময় তার জীবন শেষ হয়ে যাবে।
কিন্তু শুধু জানতো না রাইসার সাথে তার শেষ দেখা হতে চলেছে।
রাইসা তার না হয়েই চলে যাবে।
রাইসা যখন শেষবার তার হাতে সুমনের হাতটি ধরেছিল সুমন আগে থেকে বেশি অসুস্থ ফিল করছে
বুকের যন্ত্রণা তীব্র ধারন করেছে, রাইসা চিতকার করে কান্না করতে পারছে না
তখন তার চোখের কোণে অশ্রু জমে গিয়েছিল। সুমন ধীরে ধীরে বলেছিল, "রাইসা, আমাকে কখনো ভুলবে না। আমি চাই না তুমি কষ্ট পাও... শুধু আমার ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে যাও।"
ডাক্তার এসেছে রোগীকে শেষবার চেক করে বাসায় চলে যাবে।
সুমনের জন্য যেন সবই শেষ বার।
রাইসার হাত সুমন শক্ত করে ধরেছে সুমন গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে চুপ হয়ে গেল। তার শরীরের সমস্ত শক্তি যেন এক মুহূর্তে নিঃশেষ হয়ে গেল।
হি ইজ নো মোর
বাক্যটা পৃথিবীর সবচেয়ে কস্টের বাক্য।
সুমন বেঁচে গেছে মরে গিয়ে
তাকে এত কস্ট পেতে হয়নি
এখন কস্ট পেতে হবে রাইসার।
সুমন মারা যাওয়ার পর, সুমনের পরিবারের সুকের ছায়া ঠিক একই সময়ে, রাইসার পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল। দুটো গাড়ি, এক গেট থেকে বের হয়ে আসছিল—একটি ছিল বিয়ের গাড়ি, আর অন্যটি ছিল এম্বুলেন্স।
এই দৃশ্যের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ছিল রাইসার দাঁড়িয়ে থাকা। তার চোখে ছিল এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে শূন্যতা, কিন্তু অন্তরে ছিল সুমনের কথা। একদিন, এই জীবন তাকে শোকেও দাঁড়িয়ে থাকতে শিখাবে, কিন্তু সুমনের ভালোবাসা কখনোই তার হৃদয় থেকে চলে যাবে না।
সে চোখ বন্ধ করে, এক সাদা ফুলের মতো শান্ত হয়ে গেল।