14/08/2025
১৫০বছরের ইতিহাস সমৃদ্ধ উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদ...!
১৮৭৬ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে শুধুমাত্র ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং চালু ছিল। কোন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স চালু ছিল না। বর্তমান বুয়েট (তৎকালীন আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল) প্রথম ১৮৭৬ সালে ৩-বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা কোর্স চালু হয়। পরবর্তী ৭৩বছর বুয়েটে ডিপ্লোমা কোর্স করানো হত । তখনকার প্রচলিত ইন্ডাস্ট্রি, অটোমোবাইলস, কন্সট্রাকশন কাজ করতো ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা। ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমান বুয়েট)-এ ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী চালু হয়। বুয়েটে পাশাপাশি চলতে থাকে ডিপ্লোমা ও বিএসসি কোর্স। ১৯৫৬ সালে বুয়েটে পুরোপুরি ডিপ্লোমো কোর্স বন্ধ করে দেয়া হয়।
১৯৪৯ সাল থেকেই ডিপ্লোমাকে ছোট করা, পদবী অবনয়ন করতে চাওয়া, উচ্চশিক্ষার সুযোগ বন্ধ করা, ইঞ্জিনিয়ারিং উপাধি কেড়ে নেয়াসহ একের পর এক ষড়যন্ত্র শুরু হয়। তৎকালীন সময়ে আমেরিকার ওকলামা স্টেট ইউনিভার্সিটি স্টান্ডার্ডে পরিচালিত ডিপ্লোমা কোর্সের সাথে গ্রাজুয়েশন কোর্সের তখন খুব বেশি পার্থক্য ছিল না। তথাপি ডিপ্লোমার পদ অবনয়ন করা হয় এবং গ্রাজুয়েটদের পদের সুযোগ-সুবিধার মাঝে বিশাল পার্থক্য সৃষ্টি করা হয়। প্রতিবাদে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা রাজপথে আন্দোলন করলে; ১৯৫১ সালে পাকিস্তানি পুলিশের গুলিতে অনেকে আহত হন। অনেকে চাকরিচ্যুত হন। ১৯৫৩, ১৯৬৭ সালেও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা আন্দোলন করে। ১৯৭০ সালে আলাদা সংগঠন খুলে। সরকার ১৯৪৯ সালে আলাদা টেকনিক্যাল ডিরেক্টরেট বোর্ড গঠন করে। ১৯৫১ সালে গ্লাস এন্ড সিরামিক ইন্সটিটিউট এবং ব্রিটেনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় ১৯৫৫ সালে ঢাকায় ইস্ট বেঙ্গল পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট খুলে ডিপ্লোমা কোর্স চালু করে।
১৮৭৬ সাল থেকে ৭৩বছর ধরে শুধুমাত্র ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারগণ দেশের উন্নয়নে কাজ করছিল। কারন তখন দেশে কোন বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ছিল না। উপমহাদেশে ১৭৮০ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর শুরু হয় ডিপ্লোমা দিয়ে। বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং চালুর ৭৩বছর আগেই ডিপ্লোমা চালু হয়। ১৯১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত সার্ভে ইন্সটিটিউট, ১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল এবং ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত গ্লাস এন্ড সিরামিক ইন্সটিটিউট হতে গ্রাজুয়েটদের Associate Engineer উপাধি দেয়া হতো। পরবর্তীতে গ্রাজুয়েশন চালুর পরে এসোসিয়েট ইঞ্জিনিয়ারিং বিলুপ্ত করে; বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য পদ সৃষ্টি করা হয়। প্রকৌশল বিদ্যা চালুর প্রারম্ভিকতা থেকে; শিল্পকারখানায় সমানভাবে ও সমানপদেই বিএসসি ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা কাজ করে যাচ্ছে। অপরদিকে প্রায় সমপর্যায়ের কোর্স করার পরেও সুযোগ-সুবিধা ও পদবীতে অনেক পার্থক্য থাকায়; ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদ সৃষ্টি করা হয়। কারিকুলাম প্রায় কাছাকাছি হওয়া সত্ত্বেও ১৯৪৯ সাল থেকেই ডিপ্লোমা কোর্স বন্ধ করে দেয়া, ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের ফোরম্যান পদে নিয়োগ দেয়া, সুপারভাইজার পদ দেয়া, এসোসিয়েট ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স বন্ধ করা, আইইবি থেকে পৃথক করে দেয়া, কারিগরি শিক্ষা কারিকুলাম আধুনিকায়ন না করা, ডিপ্লোমাদের গ্রাজুয়েশনের পদ বন্ধ করাসহ নানামুখী ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। কিন্তু পাকিস্তান ও বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারই ডিপ্লোমা শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছে। দেশের উন্নয়নের স্বার্থে কারিগরি শিক্ষার উপর ভরসা করেছে। দেশে ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় চালু হবার আগেই ১৭টি পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠা করে পাকিস্থান সরকার। ফলে দেশের সরকারি-বেসরকারি শিল্পকারখানা পরিচালনায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন।
১৯৪৯ সাল পর্যন্ত যারা এইদেশে এসোসিয়েট ইঞ্জিনিয়ার ছিল। দেশে গ্রাজুয়েশন চালুর পরে; তাদেরকে উপ-সহকারী প্রকৌশলী বানিয়ে দেয়া হল। দেশ স্বাধীনের পরে ১৯৭৩ সালে জাতীয় বেতন কমিশন দেশে প্রচলিত ৪হাজার পদকে ১০টি গ্রেডে ভাগ করেন। ফলে অন্যান্য পেশাজীবিদের সাথে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররাও আন্দোলনে নামেন। কমিশনের সুপারিশে ডিপ্লোমাকে ফোরম্যান/ওভারশিয়ার পদমর্যদায় অবনয়নের চেষ্টা করা হয়। ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের আন্দোলনের ফলে যা বাস্তবায়ন সম্ভব হয় নি। তবে তৎকালীন সরকার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে দেশের প্রত্যেক উপজেলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নামক ২য় শ্রেণীর পদ সৃষ্টি করে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য। ১৯৭৭ সালে গঠিত বেতন স্কেলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের ৩টি গ্রেডে ভাগ করা হয়। প্রতিবাদে ৩১শে মার্চ ১৯৭৮ সালে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা রাজপথে নামেন। উক্ত আন্দোলনে পিডিবি, পাউবো, সওজ, পিডব্লিউডি, পলিটেকনিকে কর্মরত প্রকৌশলীরা মার্শাল ল ভঙ্গ করে ঢাকায় বিক্ষোভ করেন। ফলে প্রেসিডেন্ট রহমান সাবেক আইজিপিকে প্রধান করে ৯ সদস্যের পে এন্ড সার্ভিস কমিশন গঠন করেন। উক্ত কমিশনের সুপারিশের আলোকে ১৯৭৮ সালের ৩১শে জুলাই রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশের মাধ্যমে দেশে বিদ্যমান উপ-সহকারী প্রকৌশলী, ফোরম্যান, ওভারশিয়ার, ওয়াচম্যান, সুপারভাইজারসহ ১৪টি পদে কর্মরত ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের পদের নাম “উপ-সহকারী প্রকৌশলী” নির্ধারণ করা হয়। কয়েক যুগের আন্দোলন এবং ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ ১৯৭৮ সালে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি ৩৩% এবং সিলেকশন গ্রেড ৫০% নির্ধারণ করেন। যদিও এর আগেই PDB, PWD, BWDB-এ অনেক ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার পদোন্নতি পেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী পদেও কর্মরত ছিলেন। উচ্চশিক্ষা বঞ্চিত ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে শহিদ জিয়া ১৯৮০ সালে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমান ডুয়েট) কে নির্ধারণ করেন।
এরশাদ সরকারের শাসনামলে হায়ার ডিপ্লোমা চালুর ষড়যন্ত্র করা হয়। কিন্তু ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা আন্দোলন শুরু করলে; এরশাদের শাসনামলে ৮বছরে অনেক ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার আহত হয়, কারাবরণ করে, ছাত্রত্ব বাতিল হয়। এরশাদের আমলে পলিটেকনিক ৫-৬সেশন ধরে লাগাতার বন্ধ ছিল। ১৯৯৪ সালে বেগম খালেদা জিয়া সরকার উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদকে দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদা প্রদান করেন। তাৎক্ষনিকভাবে দেশের সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত উপ-সহকারী প্রকৌশলীগণ ৩য় শ্রেণীর কর্মচারী হতে ২য় শ্রেণীর কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন হয়। ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ডিপ্লোমা কোর্সকে ৪বছরে রুপান্তর করে। ২০০৯ সালে ইমারত নীতিমালার অধীনে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের আবারও ফোরম্যান পদে রুপান্তরের চেষ্টা করা হয়। যা বাস্তবায়ন হবার আগেই পলিটেকনিক শিক্ষার্থীরা ২০১৩ সালে রক্তাক্ত প্রতিবাদ জানালে; আওয়ামী লীগ সরকার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদ বহাল রাখেন। বার বার ডিপ্লোমা কোর্সকে ৩বছর করা, উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের পদোন্নতি বন্ধ করা, উক্ত পদে ডিগ্রি ইঞ্জিনিয়ারদের সুযোগ প্রদানের দাবী জানালেও; আওয়ামী লীগ সরকার বার বার দাবী প্রত্যাখান করে।
১৮৭৬ সাল থেকে এইদেশে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স চালু রয়েছে। দীর্ঘ আন্দোলনের পরে জিয়াউর রহমান ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের একটি কাঠামোতে নিয়ে আসেন। শেখ হাসিনা সরকার অস্ট্রেলিয়ান মডেল অনুযায়ী কারিকুলাম আধুনিকায়ন করে ডিপ্লোমাকে চার বছরে উন্নীত করেন। খালেদা জিয়া সরকার উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদকে ২য় শ্রেণীর মর্যাদা দেন। শেখ হাসিনা সরকার শত বাঁধার পরেও সকল সুবিধা অক্ষুন্ন রাখেন এবং ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের সরাসরি চীনে গ্রাজুয়েশন করার সুযোগ সৃষ্টি করেন। বেগম খালেদা জিয়া সরকার প্রথম মেয়াদে ৫টি এবং দ্বিতীয় মেয়াদে ১৫টি পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠা করেন। শেখ হাসিনা সরকার ৫০০টি টিএসসি এবং ১৭টি পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠা করেন।
যেহেতু উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদটি মিড-লেভেল পদ এবং পিরামিড অরগানোগ্রাম অনুযায়ী এসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারদের অধীনে ৪-৫জন উপ-সহকারী প্রকৌশলী কর্মরত থাকে। অনুরুপভাবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পিরামিড অরগানোগ্রামে একজন উপ-সহকারী প্রকৌশলীর অধীনে ১০-১২জন টেকনিশিয়ান কাজ করেন। তাই এসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার পদের তুলনায় উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদের সংখ্যা বেশি। একইভাবে এসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার পদের চেয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী পদ ৬-৭গুণ কম। কারণ পিরামিডের যত উপরে যাবেন; ততই পদ কমে।
উপরন্তু ৭৫বছরের সংগ্রাম আন্দোলন, ক্যারিয়ার বিসর্জন, রক্তাক্ত হওয়া, জীবন দেয়ার বিনিময়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদ অর্জিত হয়েছে এবং টিকে আছে। ৭৫বছর ধরে উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদ নিয়ে ষড়যন্ত্র হয়েছে। ফোরম্যানে রুপান্তরের চেষ্টা হয়েছে। কর্মচারীতে অবনয়নের চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু কোন বাঁধাই দেশের সেবায় কাজ করা থেকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের পিছুপা করতে পারে নি। দেশের প্রতিটি উন্নয়ন, রক্ষনাবেক্ষণ, মেরামত ও অপারেশন কাজে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়াররা নিয়োজিত। মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক হাজার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার নির্মাণ, তেল-গ্যাস ক্ষেত্র, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ কাজে নিয়োজিত আছেন। এখনো দেশের অধিকাংশ শিল্পকারখানা, ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান, মাঝারী ও ভারী শিল্পের নিয়োগে ডিপ্লোমা/বিএসসি চাওয়া হয়। কারণ নিম্ন-আয়ের বাংলাদেশের উন্নয়ন, উৎপাদন, নির্মাণে মধ্যম সারির দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবলের চাহিদাই সর্বাধিক।
লেখক-
প্রকৌশলী নাজিম সরকার
প্রতিষ্ঠাতা, স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ার্স
(স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ার্স মেটা, গ্লোবাল ইয়ুথ পার্লামেন্ট, বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃত এবং ওআইসিতে প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন)