18/08/2026
১৩.৮ বিলিয়ন বছরের মহাবিশ্বের যাত্রা: বিগ ব্যাং থেকে বর্তমান মহাবিশ্ব!
আজ থেকে প্রায় ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগের কথা। তখন ছিল না কোনো স্থান, ছিল না সময়ের অস্তিত্ব, এমনকি অন্ধকারের জন্য শূন্যতাও নয়। এক পরম রহস্যময় অসীম ঘনত্বের বিন্দু সিংগুলারিটি থেকে এক নিমেষে উন্মোচিত হলো স্থান, কাল আর মহাজাগতিক পদার্থের মূল ক্যানভাস। বিগ ব্যাং কোনো মহাশূন্যের বুকে সাধারণ বিস্ফোরণের মতো ঘটনা ছিল না, বরং এর মধ্য দিয়ে শূন্য স্থান নিজেই জন্ম নিয়ে প্রসারিত হতে শুরু করেছিল। এটাই আমাদের মহাজাগতিক অস্তিত্বের প্রথম স্পন্দন।
জন্মলগ্নের এক সেকেন্ডের অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশে, ১০^(- ৩৬) থেকে ১০^(-৩২) সেকেন্ডের মধ্যে, নবজাতক মহাবিশ্ব এক অকল্পনীয় দ্রুত গতিতে প্রসারিত হয়, যাকে বলা হয় কসমিক ইনফ্লেশন বা মহাজাগতিক স্ফীতি। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুসারে, শূন্যস্থানের মধ্য দিয়ে কোনো বস্তু বা তথ্য আলোর চেয়ে দ্রুত চলতে পারে না। তবে স্ফীতির সময় কোনো বস্তু ছোটেনি, বরং শূন্যস্থান নিজেই স্থানিকভাবে প্রসারিত হয়েছিল, তাই এটি পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম লঙ্ঘন করে নাই। স্ফীতি থামার পর মহাবিশ্ব কিছুটা শীতল হয় এবং বিশুদ্ধ শক্তি থেকে প্রোটন, নিউট্রন ও ইলেকট্রনের মতো আদিম মৌলিক কণা তৈরি হতে শুরু করে। বিগ ব্যাং-এর মাত্র ৩ মিনিটের মাথায় এই কণাগুলো যুক্ত হয়ে গঠিত হয় প্রথম পারমাণবিক নিউক্লিয়াস, যা মূলত হাইড্রোজেন এবং হেলিয়াম।
প্রথম ৩৮০,০০০ বছর মহাবিশ্ব ছিল এক ঘন, উত্তপ্ত প্লাজমার কুয়াশার মতো। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ছড়ানো মুক্ত ইলেকট্রনগুলো আলোর কণা বা ফটোনকে বারবার বাধা দিচ্ছিল, ফলে আলো মুক্তভাবে চলাচল করতে পারছিল না। ৩৮০,০০০ বছর পর মহাবিশ্ব যখন যথেষ্ট শীতল হলো, প্রায় ৩,০০০ কেলভিন, তখন প্রোটন ও ইলেকট্রন প্রথমবারের মতো একত্রে যুক্ত হয়ে নিরপেক্ষ পরমাণু গঠন করে, যাকে পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় 'রিকম্বিনেশন' বলা হয়। এর ঠিক পরপরই ইলেকট্রনগুলো পরমাণুর ভেতরে আটকে যাওয়ায় আলো প্রথমবারের মতো পদার্থ থেকে বিচ্ছিন্ন ও মুক্ত হয়ে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, যাকে বলা হয় ফটোনের ডিকাপলিং। সৃষ্টির সেই আদিম আলো আজও সমগ্র মহাবিশ্বে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যা আমরা কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে দেখতে পাই। এটি আমাদের মহাবিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো শৈশবের ছবি।
সৃষ্টির প্রথম আলো ছড়িয়ে পড়ার পর মহাবিশ্বে শুরু হয় এক দীর্ঘ আঁধার পর্ব, যাকে কসমিক ডার্ক এজেস বা মহাজাগতিক অন্ধকার যুগ বলা হয়। কারণ তখনো কোনো তারা বা নক্ষত্র তৈরি না হওয়ায় চারপাশ ছিল একদম আলোহীন। বিগ ব্যাং-এর প্রায় ১০ থেকে ৪০ কোটি বছর পর মহাকর্ষের টানে হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাস একত্রিত হয়ে জন্ম নেয় মহাবিশ্বের প্রথম প্রজন্মের বিশাল সব তারা। এই তারাগুলো থেকে তীব্র অতিবেগুনি রশ্মি চারপাশের হাইড্রোজেন গ্যাসে আঘাত হানে। এতে হাইড্রোজেনের পরমাণুগুলো ভেঙে গিয়ে আবার প্রোটন ও ইলেকট্রন আলাদা হয়ে যায়, যাকে বলা হয় পুনঃআয়নায়ন বা রিয়ায়োনাইজেশন।
প্রশ্ন জাগতে পারে, ইলেকট্রন আলাদা হয়ে গেলে মহাবিশ্ব কি আবার আগের মতো অন্ধকার বা কুয়াশচ্ছন্ন হয়ে যাওয়ার কথা ছিল না? উত্তর হলো - না। কারণ ততদিনে মহাবিশ্ব প্রসারিত হয়ে এতটাই বিশাল হয়ে গিয়েছিল যে, গ্যাসগুলো অনেক হালকা হয়ে পড়ে। ফলে মুক্ত ইলেকট্রনগুলো আর আলোকে আটকে রাখতে পারেনি। আলো খুব সহজেই পুরো মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে এবং সমস্ত অন্ধকার দূর করে মহাবিশ্বকে স্থায়ীভাবে স্বচ্ছ ও দৃশ্যমান করে তোলে।
এবার আসা যাক আমাদের সৌরজগতের জন্ম লগ্নের দিকে। মহাবিশ্বের বয়স যখন প্রায় ৯.২ বিলিয়ন বছর, অর্থাৎ আজ থেকে প্রায় ৪.৫৭ বিলিয়ন বছর আগে, তখন এক প্রাচীন নক্ষত্রের সুপারনোভা বিস্ফোরণের ধূলিমেঘ ও গ্যাস ঘনীভূত হয়ে আমাদের সূর্য এবং একে ঘিরে পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সৌরজগতের জন্ম হয়।
বিগ ব্যাং-এর পর প্রথম ৯০০ কোটি বছর পদার্থের মহাকর্ষ বলের প্রভাবে মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি ধীর হচ্ছিল। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ৬০০ কোটি বছর আগে ডার্ক এনার্জির ঘনত্ব পদার্থের ঘনত্বকে ছাড়িয়ে যায় এবং আজ থেকে প্রায় ৫০০ কোটি বছর আগে থেকে এটি স্থানকে ত্বরান্বিত গতিতে ঠেলে প্রসারিত করতে শুরু করে। ১৯৯৮ সালে দূরবর্তী সুপারনোভা পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন যে, মহাবিশ্ব কেবল প্রসারিতই হচ্ছে না, বরং এর প্রসারণের গতি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ত্বরান্বিত প্রসারণের নেপথ্যে থাকা শক্তিকে ডার্ক এনার্জি বলা হয়, যা বর্তমানে মহাবিশ্বের মোট কাঠামোর প্রায় ৬৮ শতাংশ দখল করে আছে।
স্থান আর কালের এই অনন্ত মহাসমুদ্রে বিগ ব্যাং ছিল কেবল প্রথম তরঙ্গের সৃষ্টি। সেই তরঙ্গে ভেসে ভেসে কত নক্ষত্রের জন্ম হলো, কত গ্যালাক্সি বিলীন হলো - তারই এক অলৌকিক ধারায় আজ এই নীল গ্রহে আমাদের উপস্থিতি। মহাবিশ্বের ১৩৮০ কোটি বছরের এই সুদীর্ঘ ইতিহাসের দিকে তাকালে অনুধাবন করা যায়, মানবজীবন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি অনন্তযাত্রার অপূর্ব সুরঙ্গীত। নক্ষত্রের আলোয় রচিত আমাদের এই গল্প অচেনা ভবিষ্যতের পানে বইতেই থাকবে অবিরামভাবে।
*** এই বিষয়ে অধিকতর জানতে কমেন্ট শেয়ারকৃত তথ্যসূত্র পড়ুন।
NASA's Hubble Space Telescope #মহাবিশ্ব #বিগব্যাং