22/05/2026
একসময় সূর্যের আলো ছিল জীবনের সহজ আশীর্বাদ। ভোরবেলা উঠোনে দাঁড়ালেই শরীর ভরে যেত সতেজতায়, মন ভরে যেত উষ্ণতায়। আজ সেই আলোকে ভুলিয়ে আমাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ভিটামিন ডি ক্যাপসুল।
একসময় হাঁটা ছিল মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন। পথ ছিল, সময় ছিল, বিশুদ্ধ বাতাসে বুকভরা নিঃশ্বাস ছিল। এখন হাঁটার আনন্দ হারিয়ে গিয়ে আমরা কিনছি স্টেপ কাউন্টার, ট্রেডমিল। যেন সংখ্যা আর মেশিনের ভেতরেই সুস্থতার সংজ্ঞা লুকিয়ে আছে।
একসময় ঘুম আসত ক্লান্ত শরীরের স্বাভাবিক আহ্বানে। রাত মানেই ছিল নিশ্চিন্ত বিশ্রাম। আজ অনিদ্রার বাজারে বিক্রি হচ্ছে ঘুমের ঔষধ।
কারণ আমরা জীবনকে এতটাই জটিল করেছি যে শান্ত ঘুমও এখন পরিণত হয়েছে পণ্যে।
একসময় নীরবতা ছিল মানুষের অন্তরের আশ্রয়। গাছতলায় বসে থাকা, নদীর ধারে চুপ করে তাকিয়ে থাকা—এসবই ছিল ধ্যান। আজ সেই নীরবতাকেও বন্দি করা হয়েছে মেডিটেশন সাবস্ক্রিপশনে।
একসময় গাছের ছায়া ছিল পথিকের শীতলতা। আজ কংক্রিটের নগরে ছায়া হারিয়ে আমরা কিনছি এয়ার কন্ডিশনার।
একসময় তৃষ্ণা মিটত ঠান্ডা পানিতে। এখন আমাদের বোঝানো হয়েছে তৃষ্না মেটানোর আসল সুখ হলো বোতলবন্দী কোমল পানীয়।
খাবার একসময় ছিল মাটির গন্ধমাখা, ঋতুর স্বাদে ভরা। তারপর তাতে যোগ হলো রং, রাসায়নিক, সংরক্ষণ আর মুনাফার হিসাব।
ত্বকের যত্ন একসময় ছিল সুস্থ জীবনযাপন আর স্বাভাবিক পরিচ্ছন্নতা। আজ মানুষকে বিশ্বাস করানো হয়েছে, সৌন্দর্য মানে সতেরো ধাপের স্কিনকেয়ার রুটিন। অথচ একই সঙ্গে বেড়েছে ত্বকের অসুখ, উদ্বেগ, আর অস্থিরতা।
এভাবেই ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে শরীরের নিজস্ব শক্তিকে। তারপর আমাদের সামনে খুলে দেওয়া হয়েছে হাসপাতালের দরজা, মোড়ে মোড়ে দাঁড় করানো হয়েছে ফার্মেসি আর ক্লান্ত শরীরকে আবার সচল করার নামে তৈরি হয়েছে জিম।
আমাদের বাপ-দাদারা সুস্থ থাকার জন্য আলাদা করে “ফিটনেস” শেখেননি। তারা শুধু হেঁটেছেন, পরিশ্রম করেছেন, মাটির কাছাকাছি থেকেছেন। তাদের সুস্থতা কোনো প্যাকেটজাত পণ্যের ওপর নির্ভর করেনি। আমাদের দাদী-নানীদের কাছে অতিরিক্ত কিছু ছিল না,
তাই কৃত্রিম ঘাটতিও ছিল না। তাদের জীবন ছিল সরল, অনাবিল অথচ পরিপূর্ণ।
আজ মানুষকে প্রতিনিয়ত বোঝানো হচ্ছে— তোমার কিছু একটা কম আছে। আর সেই অভাব পূরণ করবে কোনো না কোনো পণ্য।
এইভাবেই পরিকল্পিতভাবে সৃষ্টি হয়েছে আধুনিক অভাবের পৃথিবী। মানুষ আজ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বন্দি নিজের ভোগে,
নিজের বিলাসিতায়, নিজের কেনাকাটায়।
যার জীবনে পণ্যের আধিপত্য যত বেশি, তার স্বাধীনতা তত কম।
কারণ মানুষ বুঝতে পারেনা - সে ধীরে ধীরে পণ্যের মালিক হয় না। বরং পণ্যেই একসময় মানুষের মালিক হয়ে যায়।
゚