03/11/2025
দুজনই ডক্টর। মহেন্দ্র গ্যাস্ট্রোলজিস্ট, এবং কীর্তিকা ডার্মাটোলজিস্ট। ধুমধাম করেই বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। হলোও তাই। কীর্তিকার অনেকগুলো অসুখ ছিল। গ্যাস্ট্রিক, পেটব্যথা, অমুক, তমুক নানাবিধ অসুখ।
তবে সুবিধা ছিল তার। স্বামী মহেন্দ্র গ্যাস্ট্রোলজিস্ট। সে তার কর্মস্থলে একটু দূরে থাকে। তবে যখন তখন ব্যথা উঠলে তাকে ফোন দিয়ে ফ্রি চিকিৎসা পাওয়া যায় । ডার্মাটোলজিস্ট হলেও নিজের ক্যারিয়ার স্টার্ট করেনি কীর্তিকা। সম্ভবত নিজের অসুস্থতা ও নতুন বিয়ের আনন্দ - সব মিলিয়ে সে ভেবেছিল আর কিছুদিন যাক।
মহেন্দ্র এই ফিল্ডে একজন স্পেশালিষ্ট হিসেবে কীর্তিকার চিকিৎসা দিতে লাগল। ব্যথা উঠলে মহেন্দ্রের দেওয়া ওষুধ বা ইনজেকশন নিলেই ব্যথাটা কমে যায়। কীর্তিকার ভরসার নামই মহেন্দ্র। মহেন্দ্রও জানে প্রিয় বউ কীর্তিকা আর কারও কাছে চিকিৎসার জন্য যাবেই না।
এর মাঝে ডক্টর মহেন্দ্র শ্বশুরকে বলল কীর্তিকার নামে একটা ক্লিনিক দিলে কেমন হয়? তাহলে কীর্তিকা ওখানে বসে ডার্মাটোলজিস্ট হিসেবে প্রাকটিস শুরু করতে পারবে, আর বাড়তি ব্যবসাও হবে। টাকাটা যদি শ্বশুরমশায় ম্যানেজ করে দেন তো বেশ হয়।
শ্বশুরমশায় এতোগুলা টাকা হুট করে কোথায় পাবেন?
যাই হোক। কীর্তিকার অসুস্থতা বাড়তে লাগল। মহেন্দ্র তার কর্মক্ষেত্র থেকে ফোনেই ইনজেকশন ও ওষুধ বলতে লাগল। কীর্তিকা সেগুলো গ্রহণ করতে লাগল।
এর মাঝে একদিন শরীর প্রচন্ডরকম খারাপ লাগতে শুরু করলে কীর্তিকা মহেন্দ্রের কর্মস্থলের বাসায় ছুটে গেল। ভরসার আরেক নাম প্রিয় মহেন্দ্র। এর মাঝে তিন দিন ধরে ব্যথার ইনজেকশন চলেছে। ব্যথা কমেছে কিন্তু শরীর প্রচন্ড খারাপ। প্রিয় মানুষটার কাঁধটায় কিছুক্ষণ মাথা রাখলে হয়তো আরাম লাগবে।
দিন- রাত কেটে গেল মহেন্দ্রের সঙ্গে।
পরদিন সকালে কীর্তিকা আর উঠছে না দেখে হসপিটালে হন্তদন্ত হয়ে তাকে নিয়ে ছুটল মহেন্দ্র। বাসায় সবাইকে খবর দেওয়া হলো।
কিন্তু কীর্তিকা আর জাগল না।
হসপিটালের নিয়ম অনুযায়ী কীর্তিকার মৃত্যুটি 'অসময়ে' রোগে ভুগে হওয়ায় রিপোর্ট তৈরি করা জরুরি ছিল। পেছনের কারণ কী তা জানা জরুরি ছিল। ফলে পোস্ট মর্টেম জরুরি ছিল। কিন্তু বাসার কেউ চাইল না, যে মেয়েটা মাত্র আটাশ বছরের জীবনে এতোটা কষ্ট সহ্য করে মৃত্যুবরণ করল তার সেই কষ্ট সহ্যকারী শরীরটা আবার কাটাছেড়া করা হোক। মহেন্দ্রও চাইলো না প্রিয় কীর্তিকার সাথে এমন কিছু হোক।
কিন্তু নিয়ম নিয়মই। সেটা পালন করলেন কর্তব্যরত চিকিৎসকরা।
গত ১৩ তারিখ, মানে ১৩/১০/২০২৫, কীর্তিকার মৃত্যুর কারণ সংবলিত রিপোর্ট পরিপূর্ণভাবে তৈরি হয়ে ডক্টর ও সংশ্লিষ্টদের হাতে এসেছে।
সেখানে উল্লেখ আছে, কীর্তিকার মৃত্যুর কারণ তার পেট ব্যথা বা অসুখ নয়। বরং তার শরীরে ধীরে ধীরে প্রয়োগ করা এনেস্থিসিয়া।
কে এটা করল? কীর্তিকা তার চিকিৎসার জন্য কোনো ডক্টরের শরণাপন্ন হয়নি, কেবল মহেন্দ্র ছাড়া। এবং এনেস্থিসিয়ার এই ডোজ এতো সূক্ষ্মভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে যাতে কীর্তিকা সুস্থ বোধ করে, সেই সাথে ধীরে ধীরে তার অবস্থার অবনতি হয়।
এবং আলটিমেট ডেস্টিনেশন মৃত্যু।
যে কোনো বিপদে সব 'প্রিয়'দের বাইরে সবার আগে নিজের রক্তই ছুটে যায় সবার আগে। কীর্তিকার ক্ষেত্রেও তাই হলো।। বোন সবকিছু পরখ করে ভেবেচিন্তে ছুটে গেল পুলিশ স্টেশন। জানালো বিয়ের এগারো মাসের মাথায় তার বোন কে হ'ত্যা করা হয়েছে। কৌশলে, সূক্ষ্মভাবে।
পুলিশ মহেন্দ্রকে এরেস্ট করল। গত কয়েকদিনে ভারতীয় আদালতে মহেন্দ্র ধীরে ধীরে সব স্বীকার করল৷ কীভাবে সে নিজের পরিকল্পনামতো একজন 'অসুস্থ' কীর্তিকাকে দুনিয়া থেকে ওপারে পাঠিয়ে দিয়েছে।
ছোটবেলায় মায়ের কাছে শুনেছিলাম, আমাদের খুব পরিচিত একজন গ্রাম্য ডক্টর বিয়ের পর দেখলেন শ্যালিকা বড়ো হচ্ছে। ডাক্তারি কায়দায় বউকে মে'রে ফেললেন। এমনভাবে মা'রলেন, লোকে ভাবল স্বাভাবিক মৃত্যু। এরপর শ্বশুরবাড়ির লোক খুব ব্যথিত হয়ে জামাইয়ের বউ হারানো শোক কাটানোর জন্য জামাইয়ের সেই শ্যালিকাকেই তার সাথে বিবাহ দিলেন। এই শ্যালিকাকে বিবাহের পর দেখলেন ছোট শ্যালিকাও বড়ো হচ্ছে। চোখে লাগছে। ভালো লাগছে। অতএব এখানেও পূর্বের নাটক মঞ্চস্থ করলেন। এবং ভাবতে পারেন রেজাল্ট?
মৃত্যু।
তবে এবার শ্বশুরবাড়ির লোক নাটক ধরতে পেরে সরে যায়। আইন পর্যন্ত গিয়েছিল কিনা জানা নেই।
বিশ্বাস হয় না। হোতো না। কিন্তু সমস্ত অবিশ্বাসের মাঝে আমি তীব্রভাবে বিশ্বাস করি- মানুষ তার সুন্দর চেহারার ভেতরে একটা বিভৎস জন্তুর হৃদয় পুষে রাখে।
কোনো কারণে সেই জন্তুর কোনো শিকারী আকাঙ্খা পূরণ না হলে সেটা বিভৎসতা দেখাতে পিছপা হয় না।
পৃথিবীতে মানুষের থেকে বিশ্রী কোনো প্রাণী আদৌ আছে কি?
চারপাশের সমস্ত প্রজাপতি আমাদেরকে বারবার এটাই বলতে আসে-
"মানুষের কাছে কোনো চাওয়া রেখো না, প্রত্যাশা রেখো না, চাইলে বাসতে পারো ভালো তবে ফিরতি ভালোবাসা আশা কোরো না, মানুষকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হতেই পারে তবে বিশ্বাস করে বাঁশ খেয়ো না। বিশ্বাস নয়, অবিশ্বাসও নয়- মানুষকে মানুষের মতো ছেড়ে দাও। এই মানুষে তোমার কীসের প্রয়োজন? "
🖊Nusrat Tazri