17/10/2025
সামান্য ঝগড়ার জের ধরে যেদিন স্বামী বলল, 'আমার বাসা থেকে বের হয়ে যাও।'
নাজমা সেদিন চলে যেতে পারেনি। কারণ এভাবে বললেই মেয়েরা বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে পারেনা। তাছাড়া তার যাওয়ারও তো জায়গা নেই। নাজমা জানে, এভাবে অনেক স্বামীরাই বউদেরকে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে বলে। তাই বলে বের হয়ে যেতে হয় না।
থেকে গেলেও নাজমার মন থেকে মঈনুলের ওপর সম্মানটা আর আগের মতো রইলো না। সবসময় তার ওই কথাটাই মনে পড়ে, 'আমার বাসা থেকে বের হয়ে যাও।' যেন মঈনুল তাকে আশ্রয় দিয়েছে। যেন এই সংসারে সে সামান্য দাসী, কিংবা বিনে পয়সায় ভাত কাপড় পাওয়া এক আশ্রিতা মাত্র। যাকে চাইলেই বলা যায়, বের হয়ে যাও।
নাজমার অন্তরে এক সুক্ষ্ম ক্ষত তৈরি হয়ে গেছে। মাঝেমাঝে ভাবে সে, পুরুষদের এত দাপট কেন? তার বাড়িতে মেয়েরা বউ হয়ে আসে বলে? নাকি বাড়িভাড়া সে দেয় বলে?
এই জেদ থেকেই নাজমা একটা চাকরিতে ঢুকলো। সারাদিন অফিস করে বাসায় ফিরে ক্লান্ত শরীরে রান্না করে। ঘরদোর পরিষ্কার করে, থালাবাসন ধোয়। আর মঈনুল অফিস থেকে এসে গোসল সেরে হাত ধুয়ে ভাত খায়। তারপর শুয়ে শুয়ে মোবাইলে রিলস দেখে। ওদিকে নাজমা তখনো রান্নাঘরে, সকালের নাস্তার জন্য কিছু একটা রেডি করছে নয়তো রান্নাঘর পরিষ্কার করছে। নাজমা তো চেয়েছিলো শুধু সংসারী হতে। তাতে তো স্বামী একবিন্দু দাম দেয় না। দুটো পয়সা ইনকাম করলে যদি স্বামীর কাছে একটু মূল্য পাওয়া যায়! সেই আশাতেই চাকরিতে ঢুকেছে সে। বড় আফসোস হয় নাজমার, তার নিজের জন্য।
এত পড়াশোনা করেও শেষমেশ এতটুকু সম্মান নেই সংসারে। অথচ তার সমান পড়াশোনা করে মঈনুল এই সংসারের কর্তা। আত্মীয়রা সবাই কত দাম দেয় ওকে! শ্বশুরশাশুড়ী সবাই মাথায় করে রাখে। নাজমার নিজের বাবা মাও জামাই বলতে পাগল। জামাইয়ের জন্য টেবিল সাজিয়ে রান্না করে। অথচ নাজমার শাশুড়ী কোনোদিন ভালোমতো যত্ন করে নাজমাকে একবেলা খাওয়ায়নি। শুধু পুরুষ বলেই সবখানে কত সম্মানিত তারা! কত আদর, সম্মান, আপ্যায়ন!
চাকরি করে বাসার খরচের অর্ধেক টানলেও নাজমার জীবনে সম্মানটুকু ফিরলো না। কয়েকদিন পরপর স্বামী বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় যায়। গাজা খেয়ে বাসায় ফেরে আর জগতের সব পুরনো বিষয় টেনে এনে ঝগড়া লাগায়। ঝগড়া হলেই অপবাদ, ফ্যামিলি নিয়ে কথা শোনানো। এসব তবুও সহ্য করা যায়। কিন্তু ওই বিশ্রি কথাটা, যা নাজমার সহ্য হয় না- আবারও একদিন ঝগড়ার জের ধরে মঈনুল বলল, 'আমার বাসা থেকে বের হয়ে যা।' তুই আমার মন থেকে উঠে গেছোস৷ তুই তোকারি ভাষায় সবসময় পান থেকে চুন ঘষলেই কথা বলে।
নাজমার এবার সামান্য সাহস হয়েছে। উত্তর দেবে না ভেবেও বলে বসলো, 'তোমার একার বাসা না। বাসার ভাড়া আমিও দেই।'
কিন্তু এখানেও তাকে শুনতে হলো, 'দুইদিন হলো চাকরিতে ঢুকেছো। এরমধ্যেই এত তেজ হয়ে গেছে? পাখনা গজাইছে না?'
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নাজমা ভাবে, 'তাও যদি একটু দাম দিতা!'
দশ বছরের সংসার জীবনে গুণে গুণে বারো বার শুনতে হয়েছে এই কথা, 'আমার বাসা থেকে বের হয়ে যাও।' প্রত্যেকবারই নাজমার ইচ্ছে হয়েছে বের হয়ে যেতে। যেদিকে দুচোখ যায়, চলে যেতে। কিন্তু পারেনি। চাকরি করতে গিয়ে বাইরের দুনিয়া দেখেছে নাজমা। বাইরের দুনিয়াটা মেয়েমানুষকে বেশ্যা ছাড়া আর কিছুই মনে করেনা। ঘরে অন্তত তাকে একটু হলেও ভালোভাবে বাঁচতে দেয়া হয়। বাইরে তো তাও কঠিন। সংসার ছেড়ে বের হয়ে গেলে দুইটা ছেলেমেয়ে বাবার আদর থেকে বঞ্চিত হবে। হয়তো তার জীবনে দুঃখ আছে, কিন্তু ছেলেমেয়েরা তো ভালো আছে! দিনশেষে ছেলেমেয়ে দুইটা নিরাপদ আশ্রয়ে বড় হচ্ছে। বাবার পরিচয় তো আছে! বেরিয়ে গেলে তো বাবার পরিচয়টাও থাকবে না। ওরা কি আর বুঝবে এই ঘরে তার মাকে দাসীর মতো ট্রিট করা হয়? ওরা শুধু ভাববে, 'আমার মায়ের খুব দেমাগ তাই বাবাকে ছেড়ে দিয়েছে। মা খারাপ, খুব খারাপ।'
এরকম কত কিছু ভেবে নাজমার কোনোদিন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া হয় না। গালি খেয়ে, অপমানিত হয়ে, সকাল সন্ধ্যা মনোমালিন্য নিয়েই সংসারে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে সে। সংসার ছেড়ে দেয়া মেয়েদেরকে সমাজ 'খারাপ' ভাবে। অথচ কি কঠিন কষ্ট সইতে সইতে বাধ্য হয়ে কেউ সংসার ছাড়ে, তা সমাজ জানেনা।
আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এরকম লাখো নাজমা। পর্দার আড়ালে। যাদের ধারালো হাসির অন্তরালে লুকিয়ে আছে বছরের পর বছর ধরে চেপে রাখা বেদনাবিধুর যন্ত্রণা। মেয়েরা আবার খুব শক্ত। মরণ পর্যন্ত মুখ বুজে সহ্য করে যায়, তবু কাউকে বুঝতে দেয় না কোন গহীন শিখার জ্বলন্ত আগুনে পুড়ে পুড়ে কবেই মরে গিয়েছে সে!
মিশু মনি
কেউ কেউ তো এমন অত্যাচার -জুলুম করে ঘরের বউকে ঘর ছাড়া করেই ছাড়ে! অনেক মেয়েরাই আছে হাত-পা ধরে, ধৈর্য্য সবর করে থেকেও আর থাকতে পারেনাহ এতো অত্যাচারের কারণে, কারণ বাঁচতে কে না চায়, সুখ শান্তির জীবন সবাই চায়। 💔 তাদের বুলি এবং তাদের চাওয়া পাওয়া সত্য করে ফেলে, সুখে থাকুক তারা সুখী হোক পরনারী আসক্ত হয়ে যার জন্য এতোকিছু..........