12/07/2026
ইসরায়েল তার জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত ১৫ টি যুদ্ধে প্রায় ২০ হাজারবার যুদ্ধ বিরতি লঙ্ঘন করেছে, আর এই যুদ্ধ বিরতি লঙ্ঘন পরবর্তী সময়ে ১৩ হাজার মানুষ মারা গেছেন।
সামরিক কৌশলে ‘অস্ত্রবিরতি’ বা শান্তিচুক্তি মূলত স্থায়ী শান্তির প্রাথমিক ধাপ হলেও, ইসরায়েলি সামরিক ডকট্রিনে এটি কখনোই শান্তির পথ নয়; বরং এটি রসদ পুনর্বিন্যাস, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং পরবর্তী আক্রমণের জন্য শক্তি সঞ্চয় করার একটি সাময়িক ‘কৌশলগত বিরতি’ (Tactical Pause) মাত্র।
১৯৪৮ সালের নাকবা থেকে শুরু করে চলমান সংঘাত পর্যন্ত—কোনো ধরনের আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা ছাড়াই চুক্তির শর্ত ভেঙে বারবার আক্রমণ চালানো তাদের এক স্থায়ী চরিত্রে পরিণত হয়েছে।
জাতিসংঘ ও রেড ক্রিসেন্টের আট দশকের ডেটা সাক্ষী দিচ্ছে, খাতা-কলমে চুক্তি স্বাক্ষর করে ময়দানে তা লঙ্ঘন করা তাদের এক ধারাবাহিক অভ্যাস। ১৯৪৮ সালের প্রথম অস্ত্রবিরতির পর থেকে শুরু করে ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালের যুদ্ধের পরও জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের রিপোর্টে ইসরায়েল কর্তৃক বারবার স্পষ্ট চুক্তি লঙ্ঘনের প্রমাণ মেলে। আর ২০০০ সালের দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় বিভিন্ন সমঝোতা ও বিরতির আবহে ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারান ৩,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি।
ইসরায়েলের এই চুক্তি লঙ্ঘনের সবচেয়ে ঐতিহাসিক ও নির্মম ভিকটিম হলো লেবানন। ১৯৮২ সালের যুদ্ধে অস্ত্রবিরতি কার্যকরের পরও ইসরায়েলি বাহিনী চুক্তি ভেঙে সাবরা ও শাতিলা শরণার্থী শিবিরে নজিরবিহীন গণহত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। এই ভয়াবহ গণহত্যার তদন্তে ইসরায়েলের নিজের কমিশনই তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে সরাসরি দায়ী করেছিল। অথচ তার কোনো শাস্তি তো হয়নিই, বরং তিনি পরবর্তীতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হন! পরবর্তীতে ২০০৬ সালের যুদ্ধে জাতিসংঘ রেজুলেশন ১৭০১ পাশ এবং যুদ্ধবিরতি হওয়ার পরও ইসরায়েল অন্তত ৩০টিরও বেশি সরাসরি আক্রমণ চালায়, যেখানে ১,২০০-এর বেশি মানুষ নিহত হন। আজও সেই রেজুলেশনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তাদের ড্রোন ও যুদ্ধবিমান লেবাননের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে প্রতিদিন গুপ্তহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে।
অবরুদ্ধ গাজার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের এই চরিত্র আরও বেশি নিষ্ঠুর ও ভয়ংকর। ২০০৮ থেকে শুরু করে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রতিটি যুদ্ধের পরিসংখ্যানই বলছে—আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তারা যখনই অস্ত্রবিরতি মেনে নিয়েছে, ঠিক কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মাথায় একতরফাভাবে তা ভেঙে দিয়েছে।
চলমান সংঘাতেও সাময়িক মানবিক বিরতির সময় ইসরায়েল অন্তত ৬০ বার বিরতির শর্ত ভেঙে গুলি ও গোলাবর্ষণ করেছে। ‘মানবিক বিরতি’র প্রতিশ্রুতি দিয়ে ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশ করতে না দেওয়া, ক্ষুধার্ত মানুষকে ত্রাণের লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা এবং নিরাপদ অঞ্চল (Safe Zone) ঘোষণা করে সেখানে বোমা ফেলা—সবই প্রমাণ করে যে, গাজায় তাদের ঘোষিত যেকোনো বিরতি মূলত সাধারণ মানুষের জন্য একটি সুপরিকল্পিত ফাঁদ।
দশকের পর দশক ধরে কোনো আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা বা শাস্তি ছাড়াই এই অপরাধ চালিয়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে পশ্চিমা পরাশক্তির কূটনৈতিক বর্ম। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যখনই ইসরায়েলের এই লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বারবার ‘ভেটো’ দিয়ে তাদের সুরক্ষা দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের সুস্পষ্ট মানদণ্ড কিংবা পশ্চিমা বিশ্বশক্তির মধ্যস্থতা—এতসব ভারী শব্দের পরও আট দশকের পরিসংখ্যান কেবল একটি রূঢ় সত্যই তুলে ধরে। ইসরায়েলের অভিধানে ‘অস্ত্রবিরতি’ বলে কোনো স্থায়ী শব্দ নেই; এটি তাদের কাছে কেবল যুদ্ধপ্রস্তুতির একটি সাময়িক কৌশলমাত্র। অতএব, ইতিহাস ও বর্তমানের বাস্তব ডেটা এই সাক্ষ্যই দেয় যে—এই শক্তির সাথে যেকোনো ধরনের চুক্তি বা সমঝোতা কোনো শান্তির পথ নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক ধোঁকা এবং নিরীহ মানুষের জন্য এক অনিবার্য মৃত্যুফাঁদ।
তথ্যসূত্র:
1. UN OCHA & UNICEF - Humanitarian Situation Reports
2. United Nations Interim Force in Lebanon (UNIFIL) Data
3. United Nations Archives & Historical Records (1948–1973)
4. Palestinian & Lebanese Ministries of Health (Official Reports)
5. Palestine & Lebanese Red Crescent Societies
6. International Human Rights Watch (HRW) & Amnesty International Reports