Nazim Ud Daula

Nazim Ud Daula Welcome to the official page of author, screenwriter, creative director and social activist Nazim-Ud-Daula. He likes to tell stories.

If you are a good listener and love to hear stories, follow this page and keep visiting to stay updated. Nazim Ud Daula is a Bangladeshi author and screenwriter. He has written a number of popular thriller novels. Bloodstone, Mithya Tumi Dosh Pipra, Mohazatra, Scarlet, Chompa House etc. are some of his notable works. Besides, he has written the screenplay for some of the most anticipated Bangla movies, such as: Surongo, MR-9: Do or Die, Damal, Operation Sundarban, Shaan etc.

নাজিম উদ দৌলা একজন বাংলাদেশী লেখক এবং চিত্রনাট্যকার। তিনি বেশ কিছু জনপ্রিয় থ্রিলার উপন্যাস ও গল্প গ্রন্থ লিখেছেন। ব্লাডস্টোন, মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া, মহাযাত্রা, স্কারলেট, চম্পা হাউজ ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য বই। এছাড়া তিনি সুড়ঙ্গ, দামাল, অপারেশন সুন্দরবন, শান, এমআর-৯ ইত্যাদি বহুল আলোচিত ও প্রশংসিত বাংলা সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছেন।

18/04/2026

প্রহেলিকা, কুহেলিকা ও যবনিকা সিরিজটি পাচ্ছেন রকমারিতে। সিরিজের চতুর্থ বইটি আসবে খুব তাড়াতাড়ি।

বুকের বাঁ পাশে হাত রাখলেই আমি ভীষণভাবে চমকে উঠি। ধক... ধক... ধক... ছন্দে বেজে চলা এই হৃদস্পন্দনটা আমার অচেনা লাগে খুব। ক...
13/04/2026

বুকের বাঁ পাশে হাত রাখলেই আমি ভীষণভাবে চমকে উঠি। ধক... ধক... ধক... ছন্দে বেজে চলা এই হৃদস্পন্দনটা আমার অচেনা লাগে খুব। কারণ এই হৃদয়টা আমার না, অন্য কারো।

মাস তিনেক আগেও আমার বুকের ভেতর একটা চেনা হৃদযন্ত্র ছিল। কিন্তু সেটা ছিল ত্রুটি পূর্ণ, হুট-হাট ফাংশন করা বন্ধ করে দিত। তীব্র যন্ত্রণায় আমি মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে যেতাম। অবশ্য আমার জন্মের কিছু দিন পর থেকেই যন্ত্রের এই ত্রুটিটা ধরা পড়েছিল। সেই ত্রুটি নিয়েই কাটিয়ে দিয়েছি সাতাশ বসন্ত। কিন্তু আর বুঝি যন্ত্রটা চলতে চাইছিল না। তাই, ডাক্তাররা অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একটা এক্সপায়ারি ডেট বসিয়ে দিয়েছিল। তারা বলেছিল, "সাগর সাহেব, মিরাকল ছাড়া আপনার বাঁচার উপায় নেই।"

সেই মিরাকল হচ্ছে হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট। কিন্তু কোথায় পাব একটা সুস্থ-সবল-তরতাজা হার্ট? এই জিনিস তো আর বাজারে কিনতে পয় যায় না! দেশ-বিদেশের হাসপাতালে চেষ্টা চালানো হলো অনেক। লাভের লাভ কিছুই হলো না। সবাই শুধু ওয়েটিং লিস্টে ফেলে রাখে আমার নামতা আর জিজ্ঞেস করলেই বলে- “সময় লাগবে”।

“টাকা লাগবে” বললে ম্যানেজ করে দিতে পারতাম আমি। সেই টাকার অংক যত বড়ই হোক না কেন, সমস্যা হতো না। পৈতৃক সূত্রে টাকা-পয়সা ভালই আছে আমার। কিন্তু "সময়" কীভাবে ম্যানেজ করবো? সময়ের তো বড়ই অভাব আমার!

আমি আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আমি মৃত্যুর দিন গুনছিলাম। সাদা সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে সারাক্ষণ ভাবতাম, এই বুঝি শেষ নিঃশ্বাসটা বেরিয়ে গেল! কিন্তু তার আগেই সত্যিই একটা মিরাকল ঘটল। তবে সেটা আমার জন্য মিরাকল হলেও, অন্য কারো জন্য ছিল জীবনের চুড়ান্ত ট্র্যাজেডি।

একটা সড়ক দুর্ঘটনা।

এক তরতাজা যুবক মৃত্যুসয্যায়।

সেই যুবক নাকি মরণোত্তর অঙ্গদান চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল।

আর সেই সুবাদে আমি পেয়ে গেলাম নতুন জীবন।

অপারেশন থিয়েটার থেকে জ্ঞান ফেরার পর আমার প্রথম যে অনুভূতিটা হয়েছিল, সেটা শারীরিক নয়, মানসিক। মনে হয়েছিল, আমি আর 'আমি' নেই। আমার শরীরের একটা ভাইটাল পার্ট এখন অন্য একজনের। ডাক্তাররা এটাকে বলে ‘সেলুলার মেমোরি’। অনেক বিজ্ঞানীরা মনে করেন- অঙ্গদানকারীর কিছু স্মৃতি, আবেগ বা ভালোলাগার অনুভূতি নাকি অঙ্গ-গ্রহীতার মাঝে স্থানান্তর হয়ে যায়। এই কথাটা আমার আগে বিশ্বাস হতো না, কিন্তু এখন বিশ্বাস করতে বাধ্য হচ্ছি।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর থেকেই নিজের মধ্যে অদ্ভুত সব পরিবর্তন লক্ষ্য করতে থাকলাম। আমি কফি পছন্দ করতাম না, এখন কফির গন্ধে পাগল হয়ে যাই। আমি নীল রং দুচক্ষে দেখতে পারতাম না, এখন আলমারি ভরে রেখেছি নীল শার্ট আর নীল পাঞ্জাবি দিয়ে। আর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন- কোনো এক অচেনা মানুষের প্রতি একটা অদ্ভুত টান অনুভব করতে পারছিলাম। মনে হচ্ছিলো, এই শহরের কোনো এক কোণে কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করছে! সেই মানুষটাকে সারাক্ষণ খুব করে দেখতে ইচ্ছে করছে! এমন অনুভূতি আমার আগে কারো হয়েছে কিনা জানা নাই। একজন মানুষকে আমি ভীষণ মিস করছি, অথচ আমি জানি না সে কে!

সেই অদৃশ্য টানের সূত্র ধরেই আমি খোঁজ লাগানো শুরু করলাম।

অঙ্গদানের ক্ষেত্রে ডোনারের সব তথ্য গোপন রাখাই নিয়ম। কিন্তু এই দেশে টাকার সামনে ‘নিয়ম’ শব্দটা খুব অসহায়। একজন নার্সকে কিছু টাকা খাইয়ে আমি হৃদয়-দানকারী সেই যুবকের ফাইলটা হাতে পেলাম। ডোনারের নাম ডাঃ রুমন ইসলাম। ইয়াং ছেলে, অল্প বয়সে ডাক্তারি পেশায় সুনাম কুড়িয়েছিল, ব্রিলিয়ান্ট কার্ডিয়াক সার্জন ছিল। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! যে ডাক্তার মানুষের হার্ট মেরামত করত, তার নিজের হার্টটাই আজ অন্যের বুকের ভেতর ধুকপুক করছে।

এরপর আমি ডাক্তার রুমনের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে থাকলাম। ছেলেটি ছিল বড়লোক বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। অবিবাহিত। তবে তার একটা গার্লফ্রেন্ড ছিল। মেয়েটির নাম- 'অরুণা'। নামটা শুনেই আমার মনের ভেতর কেমন একটা শিউরে ওঠার অনুভূতি খেলে গিয়েছিল। আমি যে মানুষটাকে মিস করি, সে-ই কি অরুণা?

***

অরুণাকে প্রথম যেদিন দেখলাম, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। ধানমন্ডি লেকের পাড়ে একটা বেঞ্চে একা বসে ছিল মেয়েটা। পরনে গাঢ় নীল রঙের একটা শাড়ি। চুলগুলো খোলা, হাওয়ায় উড়ছে। কিন্তু তার বসার ভঙ্গিতে এমন এক বিষাদ ছিল, যেন পৃথিবীর সমস্ত শোক পাথর হয়ে তার কাঁধে চেপে বসেছে। আমি দূর থেকে তাকে পর্যবেক্ষণ করছিলাম। আমার বুকের ভেতর সেই 'সেকেন্ড হ্যান্ড' হার্টটা তখন পাগলা ঘোড়ার মতো লাফাচ্ছিল। ধক-ধক, ধক-ধক… যেন সে খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে অরুণার কাছে ছুটে যেতে চাইছে।

আমি নিজেকে আটকাতে পারিনি। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে তার সামনে দাঁড়ালাম। "এক্সকিউজ মি, আপনি কি মিস অরুণা?"

মেয়েটা মুখ তুলে তাকাল। কী মায়াবী সেই চোখ! কিন্তু চোখের নিচে গভীর কালি। কত রাত সে রুমনের বিরহে ঘুমায়নি তা কে জানে! "জি। আপনি?" বিরক্তি আর কৌতূহল মেশানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।

আমি একটা মিথ্যা দিয়ে শুরু করলাম। বললাম, "আমি সাগর। আমি রুমনের…” শুরুতেই হার্ট ট্রান্সফারের বিষয়টা বলা ঠিক হবে না মনে হলো। তাই একটু ঘুরিয়ে বললাম, “আমি রুমনকে চিনি।"

'রুমন' শব্দটা শোনা মাত্রই মেয়েটার পাথরের মতো মুখটা ভেঙেচুরে গেল। তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল। মনে হলো সে এখনই কেঁদে ফেলবে। "আপনি... রুমনের বন্ধু ছিলেন?"

আমি তার পাশে বসলাম। সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে একটু অপরুপ সুন্দর মেয়ের পাশে বসে একটা অদ্ভুত গল্প বলতে থাকলাম আমি, “না, আমি রুমনের বন্ধু নই। তাকে কখনো বাস্তবে দেখিনি। তবে তাকে আমি চিনি। কারণ তার হৃদয়টা আমি আমার বুকের মাঝে যত্ন করে রেখে দিয়েছি। আপনি জানেন কি-না তা জানি না, রুমন অনেক আগেই মরণোত্তর অঙ্গদানের জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছিল। আর এদিকে আমি বিকল হৃদযন্ত্র নিয়ে শুয়ে ছিলাম মৃত্যুর অপেক্ষায়। রুমনের মৃত্যুর কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক্তাররা অস্ত্রোপচার করে তার হৃদয়টা বের করে আমাকে বুকে বসিয়ে দিয়েছে।”

আমার কথাগুলো শুনে অরুণা চমকে উঠল না, চিৎকারও করল না। সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে আমার বুকের দিকে তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত ক্ষুধা। যেন সে আমার শার্ট ভেদ করে ভেতরের স্পন্দনটা দেখতে পাচ্ছে।

আমি বলে চললাম, “রুমনের দেহের মৃত্যুর হয়েছে, কিন্তু তার অনুভূতির মৃত্যু হয়নি। আমার বুকের ভেতরে এক টুকরো রুমন এখনো দিব্যি বেঁচে আছে। সেই রুমন যা কিছু ভালোবাসে, তা আমিও ভালোবাসি। তাই তো জ্ঞান ফেরার পর থেকেই আমি আপনাকে পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছি…”

অরুণা একটা হাত বাড়ালো। কাঁপাকাঁপা হাতে আমার শার্টের ওপর হাত রাখল, ঠিক বুকের বাঁ পাশে, যেখানে হৃদয় থাকে। মুহূর্তের জন্য আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে এল। তার হাতের স্পর্শে আমার শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। অরুণা চোখ বন্ধ করে অনুভব করল স্পন্দনটা। ফিসফিস করে বলল, "হ্যাঁ… আমি বুঝতে পারছি। ও এখানেই আছে... ও বেঁচে আছে..."

অরুণার সেই স্পর্শই ছিল আমার ধ্বংসের শুরু।

সেই থেকে আমাদের নিয়মিত দেখা হওয়া শুরু হলো। অল্প সময়েই পরস্পরের খুব কাছে চলে এলাম আমরা। সুন্দর একটা সম্পর্ক গড়ে উঠলো। কিন্তু সেই সম্পর্কের নাম আমার জানা ছিল না। আমি শুধু জানতাম, অরুণাকে না দেখলে আমার এই ধার করা হার্টটা চলতে চায় না। দম বন্ধ হয়ে আসে। আর অরুণা? সে-ও আমাকে ছাড়া থাকতে পারত না। তবে তার আচরণ একটু অন্যরকম ছিল। সে কথা বলার সময় আমার চোখের দিকে তাকাত না, তাকাত আমার বুকের দিকে। সে আমার কথাও খুব একটা শুনত না, কান পেতে শুনত আমার হৃৎস্পন্দন।

অরুণা আমাকে রুমনের গল্প শোনাত। রুমন নাকি খুব কেয়ারিং ছিল। খুব ভালো ডাক্তার ছিল। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনাটা সব শেষ করে দিল।

"জানো সাগর," অরুণা একদিন বলেছিল, "রুমন ড্রাইভ খুব ভালো করত। সেদিন কীভাবে যে ব্রেক ফেল করল! গাড়িটা সোজা খাদে... পুলিশ বলল অ্যাক্সিডেন্ট। কিন্তু আমার বিশ্বাস হয় না। ও আমাকে ছেড়ে যেতে চায়নি।" বলার সময় অরুণার চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছিল। আমি তার হাত ধরে সান্ত্বনা দিয়েছিলাম। অরুণা আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল। আমার শক্ত বুকে অরুণা কোমল বুকের স্পর্শ পেয়ে আমার সমস্ত শরীরে যেন বিদ্যুৎ বয়ে যাচ্ছিল।

আমার হৃদয়ের ভেতর অরুণার জন্য ভালোবাসার কমতি ছিল না, যেহেতু হৃদয়টা রুমনের। কিন্তু আমার মাথার ব্রেইন তো আমারই। সেই ব্রেইন আমাকে মাঝে মাঝে দ্বিধায় ফেলে দিত। আমাকে বলতো- “অরুণার স্পর্শে এত খুশি হওয়ার কিছু নাই। কারণ অরুণার সব ভালোবাসা রুমনের জন্য, তোর জন্য না!”

একদিন রেস্টুরেন্টে খাওয়ার ফাঁকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, "অরুণা, তুমি আমাকে ভালোবাসো, নাকি আমার ভেতরের রুমনকে?"

অরুণা কফির কাপে চামচ নাড়তে নাড়তে হাসল। বিষণ্ণ হাসি। "তুমি আর রুমন কি আলাদা, সাগর? তোমরা তো এখন এক। ওর প্রাণ ভোমরাটা তোমার মধ্যে। ওকে ভালোবাসা মানেই এখন তোমাকে ভালোবাসা!

আমি অরুণার সেই উত্তরেই সন্তুষ্ট থাকলাম। প্রেম নাকি মানুষকে অন্ধ করে দেয়, আর আমার ক্ষেত্রে প্রেম আমাকে বধিরও করে দিয়েছিল। আমি অরুণার চোখের ওই অদ্ভুত দীপ্তি দেখে আপ্লুত হয়ে যেতাম। ওটা কি ভালোবাসা, নাকি তীব্র অবসেশন- আমার তা জানা ছিল না! জানতে চেষ্টাও করিনি কখনো। ‘অরুণা’ নামে ধরনীর সবচেয়ে মায়াবী মেয়েটি আমাকে ভালোবাসে- এই ভাবনাটা আমাকে ভীষণ সুখ দিতো।

***

আজ বাইরে তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। সকাল থেকেই আকাশটা মুখ কালো করে রেখেছে। ঢাকার রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে একাকার। বিকেলে অরুণা ফোন করে বলল। "সাগর, আজ আমার বাসায় আসবে? প্লিজ? বাসায় কেউ নেই, খুব একা লাগছে। বাইরে বৃষ্টি, আর ঘরের ভেতর রুমনের স্মৃতি... আমি আর নিতে পারছি না।"

ওর গলার স্বরে এমন এক হাহাকার ছিল, এমন এক মাদকতা ছিল যে আমি না করতে পারিনি। ডাক্তারের নিষেধ ছিল বৃষ্টিতে ভেজার, কিন্তু কে শোনে কার কথা! আমি রেইনকোট চাপিয়ে বাইক নিয়ে বের হয়ে পড়লাম। রাস্তায় জ্যাম, কাদা-পানি মাড়িয়ে যখন অরুণার মগবাজারের ফ্ল্যাটে পৌঁছলাম, তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। সম্ভবত লোডশেডিং।

অরুণা দরজা খুলে দিল। মোমবাতির আলোয় তাকে দেখে আমি থমকে গেলাম। আজ তাকে অন্যরকম লাগছে। প্রতিদিনের সেই বিষণ্ণ, সাধারণ অরুণা আজ নেই। আজ তার পরনে রক্তলাল রঙের একটা টপস আর কালো স্কার্ট। চুলগুলো খোলা, পিঠময় ছড়ানো। ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক। তাকে আজ সুন্দর লাগছে না, লাগছে ভয়ংকর মোহময়ী!

"এসো, ভেতরে এসো," অরুণা হাসল।

জীবনে এই প্রথম আমি তাকে প্রাণখুলে হাসতে দেখলাম। সেই হাসিতে দাঁতগুলো ঝকঝক করে উঠল।

"পুরো ভিজে গেছ তো! জ্বর আসবে। দাঁড়াও, টাওয়েল দিচ্ছি।"

সে পরম মমতায় আমার মাথা মুছিয়ে দিল। আমার ভেজা শার্টের ওপর দিয়ে হাত বুলিয়ে দিল বুকে। "ও কেমন আছে সাগর? কষ্ট হচ্ছে ওর?"

আমি হাসলাম। "না। তোমাকে দেখে ও এখন শান্ত।"

অরুণা আমাকে ড্রয়িংরুমে বসাল। ঘরটা পরিপাটি, কিন্তু অদ্ভুত একটা গন্ধ। হাসপাতালের ফিনাইল আর দামী পারফিউম মেশানো একটা গন্ধ। "তুমি বসো, আমি কফি বানিয়ে আনছি। গরম কফি খেলে শরীরটা চাঙ্গা হবে।"

আমি সোফায় হেলান দিয়ে বসলাম। বাইরে বৃষ্টির তোড় বাড়ছে। জানালার কাঁচে বৃষ্টির বাড়ি খাওয়ার শব্দ। ঠাস! ঠাস! যেন কেউ ভেতরে ঢোকার জন্য মরিয়া হয়ে আছে। অরুণা কফি নিয়ে এল। ধপধপে সাদা মগে কালো কফি। "নাও। চিনি একটু বেশি দিয়েছি। তোমার তো আবার তেতো পছন্দ না।"

আমি কফির মগে চুমুক দিলাম। স্বাদটা একটু অন্যরকম। একটু বেশিই কড়া লাগল। কিন্তু অরুণার নিজ হাতে বানানো কফি বলে কথা, আমি অমৃতের মতো গিললাম।

এরপর অরুণা আমার খুব কাছে ঘেঁষে বসল। তার শরীরের উষ্ণতা আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। আমি বললাম, "জানো অরুণা, মাঝে মাঝে মনে হয় রুমন মরে গিয়ে আসলে আমাদের মিলিয়ে দিয়ে গেছে। হয়তো আমাদের নিয়তি এক সুতোয় গাঁথা ছিল। এই হার্টটা না থাকলে তোমার সাথে আমার দেখা হতো না।"

অরুণা আমার হাত থেকে খালি মগটা নিয়ে টিপয়তে রাখল। শব্দ করে নামাল মগটা। তারপর আমার বুকে মাথা রাখল। "ঠিক বলেছ সাগর। রুমন আমাদের মিলিয়ে দিয়েছে। ও ঋণী ছিল আমার কাছে। সেই ঋণ শোধ করতেই তোমাকে পাঠিয়েছে।"

কথাটা কেমন যেন ঠেকল। ঋণ? কীসের ঋণ? জিজ্ঞেস করতে যাব, হঠাৎ আমার মাথাটা একটু ঝিমঝিম করে উঠল। মনে হলো ঘরের ছাদটা দুলছে। চোখের সামনের মোমবাতিটা দুটো-তিনটে মনে হচ্ছে। "অরুণা..." আমার জিভ জড়িয়ে আসছে। "আমার শরীরটা কেমন করছে… আমার এমন লাগছে কেন? তুমি কি কফিতে... কফিতে কিছু মিশিয়েছ? "

অরুণা উত্তর দিল না। সে আমার বুক থেকে মাথাও তুলল না। আমার হাত-পা ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে শরীরের ওপর মণকে মণ পাথর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি হাত নাড়াতে চাইছি, পারছি না। আমার পেশিগুলো অবশ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, আমার চেতনা পুরোপুরি সজাগ। আমি সব দেখতে পাচ্ছি, শুনতে পাচ্ছি, বুঝতে পারছি। শুধু নড়তে পারছি না। প্যারালাইসড হয়ে গেছি মনে হচ্ছে!

অরুণা এবার সোজা হয়ে বসল। সে আমার দিকে তাকাল। তার চোখের সেই মায়াবী দৃষ্টি আর নেই। সেখানে এখন জ্বলছে আদিম এক আক্রোশ। চোখের মণি দুটো যেন জ্বলন্ত কয়লা।

সে আমাকে সোফার মধ্যে লম্বা করে শুইয়ে দিল। তারপর আমার শার্টের বোতামগুলো খুলতে শুরু করল। একটা একটা করে। আমি বাধা দিতে চাইলাম, গলা দিয়ে গোঙানির মতো শব্দ বের হলো—"অ... অরু... ণা..."

অরুণা আমার শার্টের সবগুলো বোতাম খুলে শার্টটা দুপাশে সরিয়ে বুকটা উন্মুক্ত করে দিল। আমার বুকের মাঝখানে অপারেশনের লম্বা সেলাইয়ের দাগটা এখনো দগদগে। উঁচু হয়ে আছে চামড়া। অরুণা সেই দাগের ওপর আঙুল বুলিয়ে দিল। তার নখটা একটু দেবে গেল আমার চামড়ায়।

"সাগর, তুমি আমাকে ভালোবাসো?" অরুণা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল। তার মুখটা আমার কানের খুব কাছে।

আমি চোখের ইশারা করলাম- হ্যাঁ, খুব ভালোবাসি।

অরুণা হাসল। সেই হাসি আর আগের মতো মিষ্টি নেই। সেই হাসিতে এখন মিশে আছে এক পৈশাচিক আনন্দ।

"আমিও ভালোবাসতাম সাগর। খুব ভালোবাসতাম। তবে তোমাকে না, বা রুমনকেও না। আমি ভালোবাসতাম আমার ছোট ভাই অপুকে। আমার দশ বছরের ছোট্ট ভাইটা... ওকে আমি নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসতাম।"

অপু? হঠাৎ অপু আসছে কোথা থেকে? আমি বিভ্রান্ত হয়ে তাকালাম। অরুণা উঠে দাঁড়াল। সোফার নিচ থেকে একটা ছোট স্টিলের ট্রে বের করল। মোমবাতির আলোয় ট্রে-র ওপর রাখা বস্তুটা ঝিলিক দিয়ে উঠল। একটা সার্জিক্যাল ব্লেড। আর একটা ছোট কাঁচের জার। জারে ফরমালিন জাতীয় কোনো তরল টলটল করছে।

আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। আমার মস্তিষ্ক বিপদ সংকেত দিচ্ছে, কিন্তু আমার শরীর পাথরের মতো স্থির।

অরুণা ব্লেডটা হাতে নিয়ে আমার বুকের ওপর এসে বসল। তার ওজনটা আমার বুকে চাপ সৃষ্টি করল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সে ব্লেডের ধারালো দিকটা আমার গলার কাছে ধরল।

"তুমি জানো সাগর, অপু কেন মারা গিয়েছিল?" অরুণার গলা এখন বরফের মতো ঠান্ডা। "সামান্য জ্বর হয়েছিল ওর। সেই সাথে বুকের বা দিকে খুব ব্যথা ছিল। আমার বাবা ওকে নিয়ে গিয়েছিল শহরের সেরা কার্ডিয়াক স্পেশালিস্ট ডাঃ রুমনের কাছে। রুমনের তখন অনেক নামডাক। কিন্তু খুব অ্যারোগেন্ট আর ওভার কনফিডেন্ট ছিল সে। ও অপুকে ভালো করে দেখলও না। একটা ইনজেকশন পুশ করল। বলল সব ঠিক হয়ে যাবে।"

অরুণার চোখ দিয়ে জল পড়ছে, কিন্তু মুখে ক্রূর হাসি। "সব ঠিক হয়নি সাগর। ইনজেকশনটা ভুল ছিল। বাসায় ফিরে আমার ভাইয়ের শরীরে খিঁচুনি শুরু হলো। ভুল ইনজেকশনের রিঅ্যাকশনে আমার দশ বছরের ভাইটা আমার কোলেই নীল হয়ে মরে গিয়েছিল। ছটফট করতে করতে মরেছিল ও। আর রুমন? ও কী বলেছিল জানো? ও বলেছিল—'ইটস অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট। এমন হয়।' ও সরিও বলেনি। ওর টাকার জোরে, ক্ষমতার জোরে কেস ধামাচাপা দিয়ে দিল।"

অরুণা ব্লেডটা আমার বুকের সেলাইয়ের দাগের ওপর আলতো করে ছোঁয়াল। আমি তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভব করলাম। চামড়া কেটে এক ফোঁটা রক্ত বেরিয়ে এল। আমি চিৎকার করতে চাইলাম, কিন্তু গলার স্বর ফুটল না। ওষুধের প্রভাবে আমার ভোকাল কর্ড অবশ।

"আমি সেদিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আমি বদলা নেব," অরুণা হিসহিস করে বলল। সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করছে তার নিঃশ্বাস। "আমি ছক সাজালাম। ঘটনাচক্রে ওর সাথে পরিচিত হলাম। রুমনের সাথে প্রেমের নাটক শুরু করলাম। ছয় মাস... দীর্ঘ ছয় মাস আমি ওই খুনিটার সাথে হেসেছি, ঘুরেছি… শুয়েছি। মনের ভেতর ঘৃণার পাহাড় চাপা দিয়ে ওর স্পর্শ সহ্য করে গেছি, কিন্তু ওকে একদমই বুঝতে দেইনি। ও আমার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল। আমি যা বলতাম তাই করতো, আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝতো না। প্রেমে এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিল… ধরতেই পারেনি যে আমি ওর হাতে খুন হওয়া একজন ভিক্টিমের বড়বোন!"

বাইরে বাজ পড়ল। কড়-কড়-কড়! ঘরটা কেঁপে উঠল।

"সেদিন ও যখন লং ড্রাইভে যাচ্ছিল, আমিই ওর কফির ফ্লাস্কে হাই ডোজে সিডেটিভ মিশিয়ে দিয়েছিলাম। ঠিক যেমনটা আজ তোমাকে দিয়েছি। ওটা অ্যাক্সিডেন্ট ছিল না সাগর, ওটা ছিল ঠান্ডা মাথার খুন। আমি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ওর গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়তে দেখেছি। গাড়িটা দুমড়েমুচড়ে গিয়েছিল। আমার কী যে শান্তি লেগেছিল, জানো!"

অরুণা পাগলের মতো হাসতে থাকল।

"আমি ভেবেছিলাম ও শেষ। আমার প্রতিশোধ পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু এক সপ্তাহ পর খবর পেলাম... ওর হার্টটা নাকি দান করা হয়েছে। তারমানে ও মরে গিয়েও আসলে মরেনি! ওর শরীর পচে গেছে, কিন্তু ওর ওই পচা হার্টটা এখনো বেঁচে আছে। ওটা তোমার বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। তুমি ভেবেছো তুমিই আমাকে খুঁজে বের করেছো? না, সাগর! তুমি যেন আমাকে খুঁজে পাও- সেই ব্যবস্থা আমিই করেছিলাম!"

সে ব্লেডটা উঁচিয়ে ধরল। "তোমার হার্টের প্রতিটা বিট... ধক-ধক, ধক-ধক... আমার সমস্ত শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এটা আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে আমি ব্যর্থ হয়েছি। আমার ভাইয়ের খুনি এখনো শ্বাস নিচ্ছে, সে এখন অন্য একটা শরীরের ভেতর লুকিয়ে আছে!"

আমি আমার বুকের ভেতর সেই অভিশপ্ত হার্টটার উন্মাদ লাফালাফি টের পাচ্ছি। ওটাও হয়তো বুঝতে পারছে ওর শেষ সময় এসে গেছে। এত জোরে বিট করছে যে মনে হচ্ছে পাজর ভেঙে বেরিয়ে আসবে। আমি অরুণার চোখের দিকে তাকালাম। সেখানে আমি আমার মৃত্যুকে দেখছি। কোনো মায়া নেই, কোনো দয়া নেই।

"রুমনের হার্টটা তোমার শরীরে খুব আরামে আছে, তাই না? তোমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে? আজ আমি ওটাকে বের করব। আমি নিজের হাতে ওটাকে টেনে বের করব। তারপর কুচি কুচি করে কাটব। যতক্ষণ না ওটা পুরোপুরি থেমে যাচ্ছে, যতক্ষণ না ওটার শেষ স্পন্দনটুকু নিভে যাচ্ছে, ততক্ষণ আমার অপুর আত্মা শান্তি পাবে না।"

অরুণা ব্লেডটা চেপে ধরল আমার বুকের ঠিক মাঝখানে। "ভয় পেও না সাগর। তুমি তো শুধু একটা খোলস। একটা কন্টেইনার। আমার রাগ তোমার ওপর না, আমার রাগ ভেতরের ওটার ওপর। একটু কষ্ট হবে, তারপর সব শান্ত।"

চামড়া কেটে মাংসের গভীরে ঢুকে যাচ্ছে ধারালো ব্লেড। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছিটকে এসে লাগল অরুণার মুখে। লাল টপস আরও লাল হয়ে গেল। আমি ব্যথাটা অনুভব করছি, কিন্তু চিৎকার করতে পারছি না। আমার চোখের সামনে আমার ভালোবাসার মানুষটা আমার বুক চিরে ফেলছে! আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমার বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা ধুকপুক করছে। জীবন্ত একটা মাংসপিণ্ড।
অরুণা পৈশাচিক ভঙ্গীতে হাসতে হাসতে বলল, "পেয়েছি! এই তো তুই! আর কত লুকিয়ে থাকবি রুমন?"
অরুণা হাত বাড়িয়ে দিল আমার বুকের দিকে…

আমার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। তাকিয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে খুব।

বাইরে আবার বজ্রপাত হলো। সেই প্রচণ্ড শব্দের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল আমার নীরব আর্তনাদ। আমার সেকেন্ড হ্যান্ড হার্ট পুড়তে থাকল প্রতিশোধের আগুনে। আর আমি? এক ভুল গল্পের ভুল নায়ক হয়ে পড়ে রইলাম সোফায়।

(সমাপ্ত)

---
ছোটগল্প: সেকেন্ড হ্যান্ড হার্ট
লেখক: নাজিম উদ দৌলা
১৩/৪/২০২৬

শত্রু শত্রু খেলা (অধ্যায়-১) | পেইজ ১-৫
11/04/2026

শত্রু শত্রু খেলা (অধ্যায়-১) | পেইজ ১-৫

আমি ও তিথিয়া রহমান মিলে "শত্রু শত্রু খেলা" নামে একটি গ্রাফিক নভেল লিখতে শুরু করেছি। এটি মূলত একটি রোম্যান্টিক থ্রিলার জন...
06/04/2026

আমি ও তিথিয়া রহমান মিলে "শত্রু শত্রু খেলা" নামে একটি গ্রাফিক নভেল লিখতে শুরু করেছি। এটি মূলত একটি রোম্যান্টিক থ্রিলার জনরার গল্প। পুরো গ্রাফিক নভেলটি চ্যাপ্টার বাই চ্যাপ্টার অনলাইনে পোস্ট হবে। তারপর এটি বই আকারেও প্রকাশিত হবে। আজ সন্ধ্যা ৬টায় আসছে প্রথম চ্যাপ্টার। পড়ার আমন্ত্রণ রইলো সবার প্রতি।

নাজিম-উদ-দৌলার নতুন থ্রিলার উপন্যাস "ফাটল"-এর প্রিঅর্ডার চলছে। ৩৫% ডিসকাউন্টে বইটি অর্ডার করতে পারবেন আপনার পছন্দের যেকো...
11/03/2026

নাজিম-উদ-দৌলার নতুন থ্রিলার উপন্যাস "ফাটল"-এর প্রিঅর্ডার চলছে। ৩৫% ডিসকাউন্টে বইটি অর্ডার করতে পারবেন আপনার পছন্দের যেকোনো অনলাইন বুকশপ থেকে। প্রি-অর্ডারে পাচ্ছেন লেখকের অটোগ্রাফ।

প্রি-অর্ডার অ্যালার্ট! 🚨অবশেষে আসছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত লেখক নাজিম-উদ-দৌলা'র বহুল প্রতীক্ষিত থ্রিলার উপন্যা...
08/03/2026

প্রি-অর্ডার অ্যালার্ট! 🚨

অবশেষে আসছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত লেখক নাজিম-উদ-দৌলা'র বহুল প্রতীক্ষিত থ্রিলার উপন্যাস "ফাটল"। স্পেশাল ডিসকাউন্টে, লেখকের অটোগ্রাফ সহ বইটি পেতে প্রি-অর্ডার করুন আজই।

কাহিনী সংক্ষেপ:

কেমন হয় যদি একদিন ঘুম ভেঙে দেখেন আপনার চেনা জগতটা বদলে গেছে? বদলে গেছে নাম, পরিচয় আর সম্পর্কগুলো? চেনা মানুষগুলো হারিয়ে গেছে কোনো এক অদৃশ্য ফাটলে, আর আপনার চারপাশ ঘিরে ধরেছে একদল অচেনা মুখ?

মোহনপুরের মানুষের মুখে মুখে ফেরে এক ভয়ানক গল্প, অন্ধকূপ খালের গল্প! এই খালের অতল গভীরে নাকি লুকিয়ে আছে এক আদিম ফাটল, যা মানুষকে গিলে ফেলে। কিন্তু সেই কুসংস্কারে কান দেয় না সদ্য বিবাহিত দম্পতি জিমি ও পায়েল। তবে এক অমাবস্যার রাতে পা পিছলে সেই অভিশপ্ত খালের পানিতে পড়ে যায় জিমি।

জ্ঞান ফেরার পর জিমি আবিষ্কার করে, তার চারপাশের পৃথিবীটা বদলে গেছে, বদলে গেছে চেনা মানুষগুলো, সেই সাথে বদলে গেছে তার পরিচয়! এখানে সবার কাছে সে দুর্ধর্ষ পুলিশ অফিসার! কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার কাঁধে চেপে বসে একের পর এক কেইস। আকবর মির্জাকে খুন করেছে কে? স্বর্ণা নামের মেয়েটিকে কারা কিডন্যাপ করেছে? বর্ডার এরিয়ার স্মাগলিং গ্যাং-এর লিডার কে? শহরের ত্রাস হয়ে ওঠা ‘ইয়ুথ অর্ডার’ ক্লাবের আসল উদ্দেশ্যই বা কী?

একটা সময় কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা তা গুলিয়ে ফেলে জিমি। বাস্তব আর বিভ্রমের এই গোলকধাঁধায় জিমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছে? সে কি পারবে সত্যটা খুঁজে বের করতে? নাকি অন্য কারো পাপের বোঝা টানতে টানতে সেও হারিয়ে যাবে ফাটলের অতলে?

সব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে অন্ধকূপের গভীরে। সেই উত্তর জানতে হলে পড়ুন নাজিম-উদ-দৌলার শ্বাসরুদ্ধকর মৌলিক থ্রিলার উপন্যাস “ফাটল"।

এক নজরে:

উপন্যাস: ফাটল
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৩২
মুদ্রিত মূল্য: ৪০০ টাকা
(প্রি-অর্ডারে বুকশপভেদে ২৫%-৩৫% ডিসকাউন্টে বইটি পাবেন।)
প্রকাশনী: বই অঙ্গন

প্রি-অর্ডার করা যাবে রকমারি ডট কম সহ যেকোনো বুকশপে। রকমারি অর্ডার লিংক দেওয়া হলো কমেন্টে।

পৃথিবীর সব বর্ণমালা কালিতে লেখা হয়, আর আমাদের বর্ণমালা লেখা হয়েছে বুকের তাজা রক্তে। বায়ান্নোতে যে অকুতোভয় যোদ্ধারা মায়...
21/02/2026

পৃথিবীর সব বর্ণমালা কালিতে লেখা হয়, আর আমাদের বর্ণমালা লেখা হয়েছে বুকের তাজা রক্তে। বায়ান্নোতে যে অকুতোভয় যোদ্ধারা মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকারের জন্য জীবন দিয়েছিলেন , আজকের এই দিনে তাঁদেরকে স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। সেই সাথে বিশ্বের সকল বাংলা ভাষা-ভাষী মানুষকে জানাই শুভেচ্ছা।

17/02/2026

নাজিম উদ দৌলা'র নতুন থ্রিলার উপন্যাস "ফাটল" আসছে বই অঙ্গন প্রকাশনী থেকে।

"মাসে কয় টাকা কামাও মিয়া? আট হাজার? এই আট হাজার টাকায় তো আজকালকার দিনে ঢাকা শহরে একটা বাথরুমও ভাড়া পাওয়া যায় না। আর তুমি...
09/02/2026

"মাসে কয় টাকা কামাও মিয়া? আট হাজার? এই আট হাজার টাকায় তো আজকালকার দিনে ঢাকা শহরে একটা বাথরুমও ভাড়া পাওয়া যায় না। আর তুমি নবাবজাদার মতো আমার বাসায় একটা রুম দখল করে আছ। লজ্জাশরম কি সব ধুয়ে খেয়ে ফেলেছ?"

দুলাভাইয়ের কথাগুলো শক্ত ভাতের দলার মতো আমার গলায় আটকে গেল। আমি মাথা নিচু করে পাতে থাকা রুই মাছের কাঁটা বাছছি। কাঁটা বাছার ভান করছি আসলে। আমার থালায় মাছের পিসটা এতই ছোট যে ওতে কাঁটা বাছার কিছু নেই।

আমার নাম আহিয়ান। বয়স সাতাশ। পেশায় সেলসম্যান। পিঠের ওপর বিশাল ভারী ব্যাগ নিয়ে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে আমি ঢাকার অলিগলিতে ডিটারজেন্ট পাউডার আর সাবান ফেরি করে বেড়াই। দিনশেষে আমার শরীরটা যখন ঘামে ভেজা চটচটে এক জঞ্জালে পরিণত হয়, তখন পকেটে থাকে দুই-একশো টাকা কমিশন। আর মাসের টার্গেট পূরণ করতে পারলে ৮ হাজার টাকা মাইনে পাই। টার্গেট মিস হলে সেখান থেকেও জরিমানা কেটে রাখে! এই সামান্য ইনকামে ঢাকা শহরে থাকা অসম্ভব। তাই বড় আপা আর দুলাভাইয়ের সংসারে আমার ঠাঁই হয়েছে। ঠাঁই বললে ভুল হবে, আমি এই সংসারের এক অবাঞ্ছিত আগাছা। দুলাভাই আমাকে সহ্য করতে পারেন না, আর আপা স্বামীর ভয়ে মুখে কুলুপ এঁটে থাকে।

খাওয়া শেষ করে আমি আমার ঘরে ঢুকলাম। এই ঘরটা আসলে ঘর না, এটা ছিল স্টোররুম। বাতিল আসবাবপত্রের ভিড়ে একটা তোশক পাতা। জানালা বলতে একটা ছোট্ট ফোকর, যার ওপাশে ঝুলছে অন্ধকার বারান্দা।

আমি দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। এই চার দেয়ালের ভেতর আমি রাজা। এখানে দুলাভাইয়ের কর্কশ গলা নেই, বসের গালি নেই, রোদে পোড়া রাস্তার ক্লান্তি নেই। এখানে আছে শুধু আমার একটা গোপন জগত। আর সেই জগতের চাবিকাঠি ঝুলছে ঠিক আমার তোশকের বিপরীতে, দেয়ালের মাঝখানে।

একটা বিশাল অ্যান্টিক দেয়াল ঘড়ি। সেগুন কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো, পেণ্ডুলামওয়ালা ঘড়ি। ডায়ালের ওপর রোমান হরফে সংখ্যাগুলো লেখা। ঘড়িটা আমি কিনেছিলাম পুরান ঢাকার শাঁখারী বাজারের এক পাগলাটে বুড়োর দোকান থেকে। বুড়ো আমাকে ঘড়িটা দিতে চায়নি। বলেছিল, "বাবা, এই ঘড়ি সময়ের হিসাব রাখে না, এই ঘড়ি সময়কে গুলিয়ে দেয়। সামলাতে পারবি তো?"

আমি তখন কথাটার মানে বুঝিনি। সস্তায় পেয়ে কিনে এনেছিলাম। কিন্তু আনার পর থেকেই বুঝতে পারি, এই ঘড়ি সাধারণ কোনো যান্ত্রিক বস্তু নয়।

এখন রাত ১১টা ৫৫। আমি তোশকের ওপর গুটিসুটি মেরে বসে আছি। আমার দৃষ্টি ঘড়ির কাঁটার দিকে স্থির। বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটার শব্দ হচ্ছে। সারাদিনের অপমান, গ্লানি আর হতাশা এখন তুচ্ছ মনে হচ্ছে। কারণ আর মাত্র পাঁচ মিনিট। তারপরই আমার মুক্তি। তারপরই আমি পালাব আমার সেই মায়াবী অতীতে।

টিক... টিক... টিক... ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে। সেকেন্ডের কাঁটাটা যেন আমার হৃৎস্পন্দনের সাথে তাল মিলিয়ে চলছে। ১১টা ৫৯ মিনিট... ৫৯ সেকেন্ড...। ঠিক রাত ১২টা বাজল। ঘড়ির ভেতর থেকে প্রথমে একটা যান্ত্রিক খসখস শব্দ হলো। তারপর স্প্রিং কেটে যাওয়ার মতো একটা তীক্ষ্ণ আওয়াজ। এবং শেষে সেই গম্ভীর ঘণ্টাধ্বনি—ঢং... ঢং... ঢং...।

শব্দটা হওয়ার সাথে সাথেই আমার ঘরের বাতাস বদলে গেল। একটু আগে জানালা দিয়ে ভেসে আসছিল ঢাকার ভ্যাপসা গরম আর পাশের ডাস্টবিনের পচা গন্ধ। কিন্তু এখন? এখন জানালা দিয়ে হু হু করে ঢুকছে হিমশীতল বাতাস। সেই বাতাসে মিশে আছে হাসনাহেনার তীব্র সুবাস। রাস্তার গাড়ির হর্ন, দূর থেকে ভেসে আসা সাইরেনের শব্দ—সব নিমিষেই মিলিয়ে গেল। নেমে এল এক আদিম নিস্তব্ধতা। শুধু ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে।

আমি জানি, ম্যাজিকটা ঘটে গেছে। আমি এখন আর ২০২৬ সালের সেই জঞ্জালময় ঢাকা শহরে নেই। এই এক ঘণ্টার জন্য, ঠিক রাত ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত, আমার এই ঘরটা টাইম মেশিনের মতো আমাকে নিয়ে এসেছে ১৯৮৬ সালে।

আমি ধীর পায়ে বারান্দার দরজাটা খুললাম। ২০২৬ সালে আমার এই বারান্দার ঠিক সামনেই আছে একটা ভাঙাচোরা, পরিত্যক্ত গোডাউন। ছাদ ধসে পড়েছে, দেয়ালে শ্যাওলা আর আগাছার জঙ্গল। দিনের বেলা ওটাকে দেখলে গা ছমছম করে। কিন্তু এখন, এই ১৯৮৬ সালের রাতে, দৃশ্যটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমার বারান্দার ঠিক হাত বিশেক দূরেই দাঁড়িয়ে আছে এক দোতলা বাড়ি। সদ্য চুনকাম করা হলুদ দেয়াল। বারান্দায় নকশা করা লোহার রেলিং। আর সেই রেলিংয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নীরা।

নীরা! আমার জীবনের একমাত্র প্রশান্তি। সে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক আগের দিনের মতো। পরনে একটা সাদা সুতি শাড়ি, চুলগুলো পিঠময় ছড়ানো। চাঁদের আলোয় তার ফর্সা মুখটা দেখাচ্ছে কোনো এক বিষাদগ্রস্ত দেবীর মতো। নীরা মানুষ নয়, আমি জানি। সে একটা আত্মা। ১৯৮৬ সালের এই বাড়িতেই সে আটকে আছে। তার সময়টা থমকে আছে এখানেই। প্রথম প্রথম তাকে দেখলে আমি প্রচন্ড ভয় পেতাম, কিন্তু এখন তার দেখা পাওয়াটাই আমার জীবনের একমাত্র সুখ!

"আজ এত দেরি করলে যে?" নীরার কণ্ঠস্বর যেন বাতাসের ফিসফিসানি। খুব মোলায়েম, কিন্তু তাতে এক ধরণের হাহাকার মিশে আছে। আমি বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়ালাম। আমাদের দূরত্ব খুব সামান্য, কিন্তু সময়ের ব্যবধান প্রায় চার দশকের।

"দেরি কই করলাম? ঠিক ১২টা বাজতেই তো এলাম," আমি হাসার চেষ্টা করলাম। "তুমি কেমন আছো নীরা?"

নীরা ম্লান হাসল। "কেমন আর থাকব? আমার কি ভালো থাকা বা মন্দ থাকার কোনো উপায় আছে আহিয়ান? আমি তো আটকে আছি। এই একই রাত, একই সময়, একই কষ্ট—রোজ একই চক্রে ঘুরপাক খাচ্ছি।"

আমি জানি নীরার গল্পটা। ১৯৮৬ সালের কোনো এক রাতে এই বারান্দা থেকেই সে লাফিয়ে পড়েছিল। কারণটা ছিল প্রেম। এক বখাটে ছেলের প্রেমে পড়েছিল সে। তার পরিবার ছেলেটিকে মেনে নেয়নি। কিন্তু ছেলেটি তাকে কথা দিয়েছিল- বিয়ে করবে। দুজনে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তারা। নীরা তার মায়ের সিন্দুক ভেঙে গয়না আর টাকা নিয়ে দিয়েছিল ছেলেটিকে। ছেলেটি বলেছিলো- ঠিক রাত বারোটায় নীরাকে নিতে আসবে। নীরা ব্যাগ গুছিয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল। সারাটা রাত বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল সে। কিন্তু ছেলেটি আর আসেনি। সে নীরার সরলতার সুযোগে টাকা আর গহনা নিয়ে ভেগে গিয়েছিল। নীরা ভোরের আলো ফোটার আগেই অপমান আর অভিমানে বেছে নিয়েছিল মৃত্যু। কিন্তু তার অতৃপ্ত আত্মাটা এই সময়টুকুতেই আটকে গেছে।

"তোমার দিন কেমন কাটল আহিয়ান?" নীরা প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইল।

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। "দিন? আমার জীবনে দিন বলে কিছু নেই, আছে শুধু নরকের কালো রাত। আজ দুলাভাই যা তা অপমান করেছে। বিশ্বাস করো, আমার ইচ্ছে করছিল মরে যাই। এই জীবন আর টানা যাচ্ছে না। প্রোডাক্ট বেচতে বেচতে পায়ের তলায় ফোসকা পড়ে গেছে। নিজের বোন আমাকে বোঝা মনে করে। এর চেয়ে তোমার এই ১৯৮৬ সাল কত ভালো। কত শান্ত, কত স্নিগ্ধ।"

নীরা আমার দিকে গভীর মায়ায় তাকাল। "তুমি খুব ক্লান্ত, তাই না?"

"শুধু ক্লান্ত? আমি বিধ্বস্ত নীরা। আমার এই অর্থহীন, প্রেমহীন, সম্মানহীন জীবন আর ভালো লাগে না। আমি তোমার কাছে আসতে চাই। এই এক ঘণ্টার জন্য না, সব সময়ের জন্য।"

নীরার চোখে জল চিকচিক করে উঠল। "এসো, আহিয়ান। আমার যে বড্ড একা লাগে। গত ৪০ বছর ধরে আমি একা এই বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। কেউ আমাকে দেখে না, কেউ আমার কথা শোনে না। তুমিই প্রথম, যে আমাকে অনুভব করতে পেরেছ। আমি তোমার অপেক্ষায় থাকি সারা দিন।"

আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম। নীরাও ওপাশ থেকে হাত বাড়াল। আমাদের আঙুল ছোঁয়ার দূরত্ব, কিন্তু মাঝখানে অদৃশ্য সময়ের দেয়াল। আমি জানি, রাত ১টা বাজলেই সেই অভিশপ্ত শব্দটা হবে, আর আমি ছিটকে ফিরে আসব আমার বর্তমানের নরকে। নীরা মিলিয়ে যাবে অন্ধকারে।

"আমি উপায় খুঁজে বের করেছি নীরা," আমি ফিসফিস করে বললাম।

নীরা চমকে উঠল। "কী উপায়?"

আমি পকেট থেকে একটা চিরকুট বের করলাম। সেই অ্যান্টিক শপের পাগলাটে বুড়োর দেওয়া ঠিকানা। গতকাল আমি গিয়েছিলাম তার কাছে। বুড়ো আমার কথা শুনে প্রথমে খুব হেসেছিল। বলেছিল, "অতীতের প্রেমে পড়েছিস? বর্তমানটা সহ্য হচ্ছে না?"

আমি বলেছিলাম, "না দাদু। আমি ফিরতে চাই না। আমি ওই ১৯৮৬ সালেও মরে যেতে রাজি আছি, কিন্তু ২০২৬-এর এই জঞ্জালে আমি বাঁচতে চাই না। আমাকে উপায় বলে দিন।"

বুড়ো তখন আমার কানের কাছে মুখ এনে বলেছিল, "উপায় একটা আছে। কিন্তু খুব কঠিন। সাহসে কুলাবে?"

"বলুন।"

"সময় হলো একটা নদীর মতো। ঘড়িটা হলো সেই নদীর বাঁধ। প্রতিদিন রাত ১২টায় বাঁধটা আলগা হয়, তাই তুই অতীতে যাস। আবার ১টায় বাঁধটা বন্ধ হয়, তুই ফিরে আসিস। যদি তুই ওই পারে পার্মানেন্টলি থাকতে চাস, তবে তোকে বাঁধটা ভেঙে ফেলতে হবে।"

"মানে?"

"মানে হলো, ঠিক রাত ১২টা বাজার মুহূর্তে, যখন পেন্ডুলামটা দুলতে শুরু করবে অতীত যাত্রার জন্য, ঠিক সেই সেকেন্ডে তোকে ঘড়িটা চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতে হবে। মেকানিজমটা ভেঙে ফেলতে হবে। ঘড়ি যদি না থাকে, সময় ফিরবে কী করে? তুই আটকা পড়ে যাবি ওই সময়ে। আর কোনোদিন বর্তমানে ফিরতে পারবি না।"

নীরার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আমার পরিকল্পনা শুনে। "তুমি... তুমি সত্যি এটা করবে আহিয়ান? আমার জন্য?"

"শুধু তোমার জন্য না নীরা, আমার নিজের জন্যও। আমি এই শহরে, এই সময়ে আর শ্বাস নিতে পারছি না। আমি আসছি। কাল রাতেই।"

***

আজ সেই রাত। আমার জীবনের শেষ রাত- এই ২০২৬ সালে। সন্ধ্যা থেকেই আমার ভেতরে এক অদ্ভুত উত্তেজনা। দুলাভাই আজকেও খাওয়ার টেবিলে অপমান করেছেন। "বসে বসে আর কতদিন গিলবে? কাল থেকে ভাতের চালের টাকাটা অন্তত দিও।"

আমি মনে মনে হেসেছি। কাল? কাল তো আমি থাকবই না। তোমরা খুঁজেই পাবে না আমাকে। আমি তখন ১৯৮৬ সালের কোনো এক চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছি, অথবা নীরার হাত ধরে হাঁটছি রমনা পার্কের নির্জন রাস্তায়।

রাত ১১টা ৫০।

আমি প্রস্তুত। আমার হাতে একটা ভারী লোহার হাতুড়ি। এটা আমি আজই হার্ডওয়্যারের দোকান থেকে কিনেছি। তোশকের ওপর বসে আমি ঘামছি। রুমে এসি নেই, ফ্যানটাও আজ কেন জানি বাতাস দিচ্ছে না। গরম, অসহ্য গরম। কিন্তু এই গরম আর বেশিক্ষণ না। আর মাত্র দশ মিনিট।

আমি উঠে দাঁড়ালাম। ঘড়িটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বিশাল ঘড়ি। পেন্ডুলামটা স্থির হয়ে আছে, যেন ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা। কাঁচের ভেতর দিয়ে ডায়ালটা চকচক করছে।

"প্রস্তুত হও," আমি ঘড়িটাকে উদ্দেশ্য করে বললাম। "আজই তোমার শেষ। আর আমার শুরু।"

১১টা ৫৫। আমার হাত কাঁপছে। উত্তেজনায় গলা শুকিয়ে কাঠ। আমি বারবার বারান্দার দিকে তাকাচ্ছি। ওপাশ থেকে হাসনাহেনার গন্ধ আসার অপেক্ষায় আছি। নীরা নিশ্চয়ই সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে। আজ আমাদের মিলন হবে। আজ সময়ের দেয়াল ভেঙে যাবে।

টিক... টিক... টিক... সেকেন্ডের কাঁটা এগিয়ে চলেছে। আমার হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে। ১১টা ৫৮... ১১টা ৫৯... আমি হাতুড়িটা শক্ত করে ধরলাম। লক্ষ্য স্থির করলাম ঠিক ডায়ালের মাঝখানে।

বুড়ো বলেছিল, "ঠিক ১২টার প্রথম ঘণ্টাধ্বনির সাথে সাথে আঘাত করবি। এক সেকেন্ড আগেও না, পরেও না।"

সেকেন্ডের কাঁটা ১২-এর ঘরে পৌঁছাল। মিনিটের কাঁটাও ১২-এর ঘরে। ঘণ্টার কাঁটাও। তিনটে কাঁটা এক বিন্দুতে।

খট! ঘড়ির ভেতর সেই যান্ত্রিক শব্দটা শুরু হলো। পেন্ডুলামটা সামান্য নড়ে উঠল।

"ইয়েস!" আমি চিৎকার করে উঠলাম।

সর্বশক্তি দিয়ে হাতুড়িটা নামিয়ে আনলাম ঘড়ির কাঁচের ওপর।

ঝনঝনঝন! বিকট শব্দে কাঁচ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আমার হাতের আঘাতে ঘড়ির ভেতরের স্প্রিং, গিয়ার সব ছিটকে বেরিয়ে এল। হাতুড়ির বাড়িতে ডায়ালটা দুমড়েমুচড়ে ভেতরে ঢুকে গেছে। ঘড়িটা দেয়াল থেকে খসে ধপাস করে মেঝেতে পড়ল।

আমি হাঁপাচ্ছি। আমার সারা শরীর ঘামে ভেজা। চোখের সামনে ঘড়িটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ওটা আর নড়ছে না। কোনো শব্দ করছে না। সময় থমকে গেছে। সময় আর ফিরতে পারবে না।

এক অদ্ভুত আনন্দ গ্রাস করল আমাকে। আমি পেরেছি! আমি ভেঙে দিয়েছি সময়ের বাঁধ! "নীরা!" আমি চিৎকার করে উঠলাম। "আমি আসছি!"

হাতুড়িটা ফেলে দিয়ে আমি দৌড়ে বারান্দার দরজার দিকে গেলাম। ছিটকিনিটা খুলতে গিয়ে হাত কাঁপছে। বুকভরে শ্বাস নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম। সেই পরিচিত হাসনাহেনার গন্ধ, সেই শীতল বাতাস, সেই ১৯৮৬ সাল।

দরজাটা এক ঝটকায় খুলে ফেললাম। বাইরে পা বাড়ালাম। কিন্তু... কোথায় হাসনাহেনা? কোথায় সেই শীতল বাতাস? আমার নাকে ঝাপটা মারল সেই পুরনো, উৎকট পচা ড্রেনের গন্ধ। ভ্যাপসা গরম বাতাস আমার শরীর ঝলসে দিল। দূরে কোথাও একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠল। গাড়ির হর্ন শোনা যাচ্ছে।

আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। সামনে তাকালাম। যেখানে নীরার হলুদ রঙের দোতলা বাড়িটা থাকার কথা, সেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেই অন্ধকার, পরিত্যক্ত, শ্যাওলা ধরা গোডাউন। ভাঙা জানালার ফোকরগুলো যেন আমার দিকে তাকিয়ে বিদ্রূপের হাসি হাসছে।

"নীরা?" আমার গলা দিয়ে শুধু একটা অস্ফুট শব্দ বের হলো।

"নীরা, তুমি কোথায়?" আমি পাগলের মতো এপাশ ওপাশ তাকালাম। রেলিং ধরে ঝাঁকি দিলাম। "নীরা! আমি ঘড়ি ভেঙেছি! আমি এসেছি! তুমি কোথায়?"

কিন্তু কেউ নেই। ১৯৮৬ সাল আসেনি। আমি এখনো ২০২৬ সালের সেই নোংরা গলির উপরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি।

"কেন? কেন হলো না?" আমি মাথায় হাত দিয়ে বারান্দার মেঝেতে বসে পড়লাম। "আমি তো ঠিক ১২টাতেই ভেঙেছি! আমি তো ভুল করিনি!"

হঠাৎ আমার ঘরের দরজাটা সশব্দে খুলে গেল। আলো জ্বলে উঠল রুমে। আমি চোখ পিটপিট করে তাকালাম। বড় আপা দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। পরনে নাইটি, চুলগুলো উশকোখুশকো। চোখে ঘুমের রেশ, কিন্তু মুখে বিরক্তি।

"কিরে আহিয়ান? তুই কি পাগল হয়ে গেছিস?" আপা চিৎকার করে উঠল। "এত রাতে কিসের ধুমধাম শব্দ করছিস? দুলাভাইয়ের ঘুম ভেঙে গেছে তো! কাল অফিস আছে না মানুষটার?"

আমি ফ্যালফ্যাল করে আপার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মেঝেতে ঘড়ির ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে। কাঁচের টুকরোগুলো লাইটের আলোয় হীরের মতো জ্বলছে। আপা এগিয়ে এল। মেঝের দিকে তাকিয়ে তার চোখ কপালে উঠল। "হায় হায়! তুই এটা কী করলি? এত শখের এন্টিক ঘড়িটা ভেঙে ফেললি? হাত থেকে পড়ে গেল নাকি?"

আমি কোনোমতে উঠে দাঁড়ালাম। টলছি আমি। দেয়াল ধরে নিজেকে সামলালাম। "আপা..." আমার গলা দিয়ে স্বর বের হচ্ছে না। "এখন... এখন কয়টা বাজে?"

আপা বিরক্তি নিয়ে নিজের হাতের মোবাইলটার স্ক্রিন অন করল। উজ্জ্বল আলোয় সময়টা ভেসে উঠল। "কয়টা আর বাজবে? ১১টা ৫৫ বাজে।"

আমার মনে হলো পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। মাথার ওপরের ছাদটা যেন ধসে পড়ল আমার ওপর।

"কী বলছিস তুই?" আমি চিৎকার করে উঠলাম। "ঘড়িতে তো ১২টা বাজল! আমি নিজে দেখলাম! কাঁটায় কাঁটায় ১২টা!"

আপা হাই তুলতে তুলতে দরজার দিকে পা বাড়াল। "ও আচ্ছা!" আপা তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, "ওই ঘড়িটা তো আমি আজ সন্ধ্যায় ১০ মিনিট ফাস্ট করে দিয়েছিলাম।"

"কী?" আমার হৃৎপিণ্ডটা মনে হয় থেমে গেছে।

আপা দরজার হাতল ধরে ঘুরে দাঁড়াল। "তোর জন্যই তো করলাম। তুই প্রতিদিন সকালে উঠতে দেরি করিস। অফিসের বাস মিস করিস, তারপর বসের ঝাড়ি খাস। দুলাভাইও রাগ করে। তাই ভাবলাম ঘড়িটা ১০ মিনিট এগিয়ে দিই। যাতে ঘড়িতে ৮টা বাজলে আসলে বাজে ৭টা ৫০। তোর হাতে ১০ মিনিট সময় থাকে। তোর ভালোর জন্যই তো করলাম।"

আপা লাইটটা নিভিয়ে দিল। "ঘুমা এখন। আর শব্দ করিস না।" দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।

অন্ধকার ঘরে আমি একা। মাত্র ১০ মিনিট! আপার সেই সামান্য 'ভালো চাওয়া' আমার অস্তিত্ব শেষ করে দিল। আমি ১২টা বাজার ১০ মিনিট আগেই ঘড়িটা ভেঙে ফেলেছি। পেন্ডুলামটা অতীত যাত্রার জন্য দুলছিল না, ওটা শুধু ১০ মিনিট এগিয়ে থাকা সময়ের মিথ্যা ঘোষণা দিচ্ছিল। আমি অতীতে যাওয়ার আগেই পথটা চিরতরে বন্ধ করে দিয়েছি।

মেঝেতে ঘড়ির কাঁটাগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ওগুলো আর কোনোদিন জোড়া লাগবে না। ওগুলো আর কোনোদিন ১২টার ঘরে পৌঁছাবে না। আর নীরা? সে ১৯৮৬ সালের সেই বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে আছে। সে অপেক্ষা করছে। সে ভাবছে আমি আসছি। সে জানে না, আমি আর কোনোদিন আসব না। আমাদের মাঝখানে এখন আর ৪০ বছরের ব্যবধান নেই, আমাদের মাঝখানে এখন অনন্তকালের ব্যবধান!

আমার কানে দুলাভাইয়ের সেই কথাগুলো আবার বাজছে, "মাসে কয় টাকা কামাও মিয়া?"

আমার সামনে এখন শুধুই সেই অপমান, সেই দারিদ্র্য, আর সেই একাকীত্বের জীবন। পালানোর আর কোনো পথ নেই।

আমি বারান্দার দিকে তাকালাম। অন্ধকার গোডাউনটার দিকে তাকিয়ে আমি হু হু করে কেঁদে উঠলাম। কিন্তু এই ২০২৬ সালের যান্ত্রিক শহরে আমার কান্না শোনার মতো কেউ নেই। এমনকি নীরাও না। আমি আজীবনের জন্য ভুল সময়ে আটকা পড়ে গেলাম!

(সমাপ্ত)

গল্প: সময়ের বারান্দা
লেখক: নাজিম উদ দৌলা
৯/২/২০২৬

Address

Dhaka

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Nazim Ud Daula posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Nazim Ud Daula:

Shortcuts

Share