13/04/2026
বুকের বাঁ পাশে হাত রাখলেই আমি ভীষণভাবে চমকে উঠি। ধক... ধক... ধক... ছন্দে বেজে চলা এই হৃদস্পন্দনটা আমার অচেনা লাগে খুব। কারণ এই হৃদয়টা আমার না, অন্য কারো।
মাস তিনেক আগেও আমার বুকের ভেতর একটা চেনা হৃদযন্ত্র ছিল। কিন্তু সেটা ছিল ত্রুটি পূর্ণ, হুট-হাট ফাংশন করা বন্ধ করে দিত। তীব্র যন্ত্রণায় আমি মাঝে মাঝে অজ্ঞান হয়ে যেতাম। অবশ্য আমার জন্মের কিছু দিন পর থেকেই যন্ত্রের এই ত্রুটিটা ধরা পড়েছিল। সেই ত্রুটি নিয়েই কাটিয়ে দিয়েছি সাতাশ বসন্ত। কিন্তু আর বুঝি যন্ত্রটা চলতে চাইছিল না। তাই, ডাক্তাররা অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে একটা এক্সপায়ারি ডেট বসিয়ে দিয়েছিল। তারা বলেছিল, "সাগর সাহেব, মিরাকল ছাড়া আপনার বাঁচার উপায় নেই।"
সেই মিরাকল হচ্ছে হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট। কিন্তু কোথায় পাব একটা সুস্থ-সবল-তরতাজা হার্ট? এই জিনিস তো আর বাজারে কিনতে পয় যায় না! দেশ-বিদেশের হাসপাতালে চেষ্টা চালানো হলো অনেক। লাভের লাভ কিছুই হলো না। সবাই শুধু ওয়েটিং লিস্টে ফেলে রাখে আমার নামতা আর জিজ্ঞেস করলেই বলে- “সময় লাগবে”।
“টাকা লাগবে” বললে ম্যানেজ করে দিতে পারতাম আমি। সেই টাকার অংক যত বড়ই হোক না কেন, সমস্যা হতো না। পৈতৃক সূত্রে টাকা-পয়সা ভালই আছে আমার। কিন্তু "সময়" কীভাবে ম্যানেজ করবো? সময়ের তো বড়ই অভাব আমার!
আমি আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আমি মৃত্যুর দিন গুনছিলাম। সাদা সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে সারাক্ষণ ভাবতাম, এই বুঝি শেষ নিঃশ্বাসটা বেরিয়ে গেল! কিন্তু তার আগেই সত্যিই একটা মিরাকল ঘটল। তবে সেটা আমার জন্য মিরাকল হলেও, অন্য কারো জন্য ছিল জীবনের চুড়ান্ত ট্র্যাজেডি।
একটা সড়ক দুর্ঘটনা।
এক তরতাজা যুবক মৃত্যুসয্যায়।
সেই যুবক নাকি মরণোত্তর অঙ্গদান চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল।
আর সেই সুবাদে আমি পেয়ে গেলাম নতুন জীবন।
অপারেশন থিয়েটার থেকে জ্ঞান ফেরার পর আমার প্রথম যে অনুভূতিটা হয়েছিল, সেটা শারীরিক নয়, মানসিক। মনে হয়েছিল, আমি আর 'আমি' নেই। আমার শরীরের একটা ভাইটাল পার্ট এখন অন্য একজনের। ডাক্তাররা এটাকে বলে ‘সেলুলার মেমোরি’। অনেক বিজ্ঞানীরা মনে করেন- অঙ্গদানকারীর কিছু স্মৃতি, আবেগ বা ভালোলাগার অনুভূতি নাকি অঙ্গ-গ্রহীতার মাঝে স্থানান্তর হয়ে যায়। এই কথাটা আমার আগে বিশ্বাস হতো না, কিন্তু এখন বিশ্বাস করতে বাধ্য হচ্ছি।
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর থেকেই নিজের মধ্যে অদ্ভুত সব পরিবর্তন লক্ষ্য করতে থাকলাম। আমি কফি পছন্দ করতাম না, এখন কফির গন্ধে পাগল হয়ে যাই। আমি নীল রং দুচক্ষে দেখতে পারতাম না, এখন আলমারি ভরে রেখেছি নীল শার্ট আর নীল পাঞ্জাবি দিয়ে। আর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন- কোনো এক অচেনা মানুষের প্রতি একটা অদ্ভুত টান অনুভব করতে পারছিলাম। মনে হচ্ছিলো, এই শহরের কোনো এক কোণে কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করছে! সেই মানুষটাকে সারাক্ষণ খুব করে দেখতে ইচ্ছে করছে! এমন অনুভূতি আমার আগে কারো হয়েছে কিনা জানা নাই। একজন মানুষকে আমি ভীষণ মিস করছি, অথচ আমি জানি না সে কে!
সেই অদৃশ্য টানের সূত্র ধরেই আমি খোঁজ লাগানো শুরু করলাম।
অঙ্গদানের ক্ষেত্রে ডোনারের সব তথ্য গোপন রাখাই নিয়ম। কিন্তু এই দেশে টাকার সামনে ‘নিয়ম’ শব্দটা খুব অসহায়। একজন নার্সকে কিছু টাকা খাইয়ে আমি হৃদয়-দানকারী সেই যুবকের ফাইলটা হাতে পেলাম। ডোনারের নাম ডাঃ রুমন ইসলাম। ইয়াং ছেলে, অল্প বয়সে ডাক্তারি পেশায় সুনাম কুড়িয়েছিল, ব্রিলিয়ান্ট কার্ডিয়াক সার্জন ছিল। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! যে ডাক্তার মানুষের হার্ট মেরামত করত, তার নিজের হার্টটাই আজ অন্যের বুকের ভেতর ধুকপুক করছে।
এরপর আমি ডাক্তার রুমনের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে থাকলাম। ছেলেটি ছিল বড়লোক বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। অবিবাহিত। তবে তার একটা গার্লফ্রেন্ড ছিল। মেয়েটির নাম- 'অরুণা'। নামটা শুনেই আমার মনের ভেতর কেমন একটা শিউরে ওঠার অনুভূতি খেলে গিয়েছিল। আমি যে মানুষটাকে মিস করি, সে-ই কি অরুণা?
***
অরুণাকে প্রথম যেদিন দেখলাম, বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। ধানমন্ডি লেকের পাড়ে একটা বেঞ্চে একা বসে ছিল মেয়েটা। পরনে গাঢ় নীল রঙের একটা শাড়ি। চুলগুলো খোলা, হাওয়ায় উড়ছে। কিন্তু তার বসার ভঙ্গিতে এমন এক বিষাদ ছিল, যেন পৃথিবীর সমস্ত শোক পাথর হয়ে তার কাঁধে চেপে বসেছে। আমি দূর থেকে তাকে পর্যবেক্ষণ করছিলাম। আমার বুকের ভেতর সেই 'সেকেন্ড হ্যান্ড' হার্টটা তখন পাগলা ঘোড়ার মতো লাফাচ্ছিল। ধক-ধক, ধক-ধক… যেন সে খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে অরুণার কাছে ছুটে যেতে চাইছে।
আমি নিজেকে আটকাতে পারিনি। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে তার সামনে দাঁড়ালাম। "এক্সকিউজ মি, আপনি কি মিস অরুণা?"
মেয়েটা মুখ তুলে তাকাল। কী মায়াবী সেই চোখ! কিন্তু চোখের নিচে গভীর কালি। কত রাত সে রুমনের বিরহে ঘুমায়নি তা কে জানে! "জি। আপনি?" বিরক্তি আর কৌতূহল মেশানো কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।
আমি একটা মিথ্যা দিয়ে শুরু করলাম। বললাম, "আমি সাগর। আমি রুমনের…” শুরুতেই হার্ট ট্রান্সফারের বিষয়টা বলা ঠিক হবে না মনে হলো। তাই একটু ঘুরিয়ে বললাম, “আমি রুমনকে চিনি।"
'রুমন' শব্দটা শোনা মাত্রই মেয়েটার পাথরের মতো মুখটা ভেঙেচুরে গেল। তার ঠোঁট কাঁপতে লাগল। মনে হলো সে এখনই কেঁদে ফেলবে। "আপনি... রুমনের বন্ধু ছিলেন?"
আমি তার পাশে বসলাম। সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে একটু অপরুপ সুন্দর মেয়ের পাশে বসে একটা অদ্ভুত গল্প বলতে থাকলাম আমি, “না, আমি রুমনের বন্ধু নই। তাকে কখনো বাস্তবে দেখিনি। তবে তাকে আমি চিনি। কারণ তার হৃদয়টা আমি আমার বুকের মাঝে যত্ন করে রেখে দিয়েছি। আপনি জানেন কি-না তা জানি না, রুমন অনেক আগেই মরণোত্তর অঙ্গদানের জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছিল। আর এদিকে আমি বিকল হৃদযন্ত্র নিয়ে শুয়ে ছিলাম মৃত্যুর অপেক্ষায়। রুমনের মৃত্যুর কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক্তাররা অস্ত্রোপচার করে তার হৃদয়টা বের করে আমাকে বুকে বসিয়ে দিয়েছে।”
আমার কথাগুলো শুনে অরুণা চমকে উঠল না, চিৎকারও করল না। সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে আমার বুকের দিকে তাকিয়ে রইল। তার দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত ক্ষুধা। যেন সে আমার শার্ট ভেদ করে ভেতরের স্পন্দনটা দেখতে পাচ্ছে।
আমি বলে চললাম, “রুমনের দেহের মৃত্যুর হয়েছে, কিন্তু তার অনুভূতির মৃত্যু হয়নি। আমার বুকের ভেতরে এক টুকরো রুমন এখনো দিব্যি বেঁচে আছে। সেই রুমন যা কিছু ভালোবাসে, তা আমিও ভালোবাসি। তাই তো জ্ঞান ফেরার পর থেকেই আমি আপনাকে পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছি…”
অরুণা একটা হাত বাড়ালো। কাঁপাকাঁপা হাতে আমার শার্টের ওপর হাত রাখল, ঠিক বুকের বাঁ পাশে, যেখানে হৃদয় থাকে। মুহূর্তের জন্য আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে এল। তার হাতের স্পর্শে আমার শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। অরুণা চোখ বন্ধ করে অনুভব করল স্পন্দনটা। ফিসফিস করে বলল, "হ্যাঁ… আমি বুঝতে পারছি। ও এখানেই আছে... ও বেঁচে আছে..."
অরুণার সেই স্পর্শই ছিল আমার ধ্বংসের শুরু।
সেই থেকে আমাদের নিয়মিত দেখা হওয়া শুরু হলো। অল্প সময়েই পরস্পরের খুব কাছে চলে এলাম আমরা। সুন্দর একটা সম্পর্ক গড়ে উঠলো। কিন্তু সেই সম্পর্কের নাম আমার জানা ছিল না। আমি শুধু জানতাম, অরুণাকে না দেখলে আমার এই ধার করা হার্টটা চলতে চায় না। দম বন্ধ হয়ে আসে। আর অরুণা? সে-ও আমাকে ছাড়া থাকতে পারত না। তবে তার আচরণ একটু অন্যরকম ছিল। সে কথা বলার সময় আমার চোখের দিকে তাকাত না, তাকাত আমার বুকের দিকে। সে আমার কথাও খুব একটা শুনত না, কান পেতে শুনত আমার হৃৎস্পন্দন।
অরুণা আমাকে রুমনের গল্প শোনাত। রুমন নাকি খুব কেয়ারিং ছিল। খুব ভালো ডাক্তার ছিল। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনাটা সব শেষ করে দিল।
"জানো সাগর," অরুণা একদিন বলেছিল, "রুমন ড্রাইভ খুব ভালো করত। সেদিন কীভাবে যে ব্রেক ফেল করল! গাড়িটা সোজা খাদে... পুলিশ বলল অ্যাক্সিডেন্ট। কিন্তু আমার বিশ্বাস হয় না। ও আমাকে ছেড়ে যেতে চায়নি।" বলার সময় অরুণার চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছিল। আমি তার হাত ধরে সান্ত্বনা দিয়েছিলাম। অরুণা আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিল। আমার শক্ত বুকে অরুণা কোমল বুকের স্পর্শ পেয়ে আমার সমস্ত শরীরে যেন বিদ্যুৎ বয়ে যাচ্ছিল।
আমার হৃদয়ের ভেতর অরুণার জন্য ভালোবাসার কমতি ছিল না, যেহেতু হৃদয়টা রুমনের। কিন্তু আমার মাথার ব্রেইন তো আমারই। সেই ব্রেইন আমাকে মাঝে মাঝে দ্বিধায় ফেলে দিত। আমাকে বলতো- “অরুণার স্পর্শে এত খুশি হওয়ার কিছু নাই। কারণ অরুণার সব ভালোবাসা রুমনের জন্য, তোর জন্য না!”
একদিন রেস্টুরেন্টে খাওয়ার ফাঁকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, "অরুণা, তুমি আমাকে ভালোবাসো, নাকি আমার ভেতরের রুমনকে?"
অরুণা কফির কাপে চামচ নাড়তে নাড়তে হাসল। বিষণ্ণ হাসি। "তুমি আর রুমন কি আলাদা, সাগর? তোমরা তো এখন এক। ওর প্রাণ ভোমরাটা তোমার মধ্যে। ওকে ভালোবাসা মানেই এখন তোমাকে ভালোবাসা!
আমি অরুণার সেই উত্তরেই সন্তুষ্ট থাকলাম। প্রেম নাকি মানুষকে অন্ধ করে দেয়, আর আমার ক্ষেত্রে প্রেম আমাকে বধিরও করে দিয়েছিল। আমি অরুণার চোখের ওই অদ্ভুত দীপ্তি দেখে আপ্লুত হয়ে যেতাম। ওটা কি ভালোবাসা, নাকি তীব্র অবসেশন- আমার তা জানা ছিল না! জানতে চেষ্টাও করিনি কখনো। ‘অরুণা’ নামে ধরনীর সবচেয়ে মায়াবী মেয়েটি আমাকে ভালোবাসে- এই ভাবনাটা আমাকে ভীষণ সুখ দিতো।
***
আজ বাইরে তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। সকাল থেকেই আকাশটা মুখ কালো করে রেখেছে। ঢাকার রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে একাকার। বিকেলে অরুণা ফোন করে বলল। "সাগর, আজ আমার বাসায় আসবে? প্লিজ? বাসায় কেউ নেই, খুব একা লাগছে। বাইরে বৃষ্টি, আর ঘরের ভেতর রুমনের স্মৃতি... আমি আর নিতে পারছি না।"
ওর গলার স্বরে এমন এক হাহাকার ছিল, এমন এক মাদকতা ছিল যে আমি না করতে পারিনি। ডাক্তারের নিষেধ ছিল বৃষ্টিতে ভেজার, কিন্তু কে শোনে কার কথা! আমি রেইনকোট চাপিয়ে বাইক নিয়ে বের হয়ে পড়লাম। রাস্তায় জ্যাম, কাদা-পানি মাড়িয়ে যখন অরুণার মগবাজারের ফ্ল্যাটে পৌঁছলাম, তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত। চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। সম্ভবত লোডশেডিং।
অরুণা দরজা খুলে দিল। মোমবাতির আলোয় তাকে দেখে আমি থমকে গেলাম। আজ তাকে অন্যরকম লাগছে। প্রতিদিনের সেই বিষণ্ণ, সাধারণ অরুণা আজ নেই। আজ তার পরনে রক্তলাল রঙের একটা টপস আর কালো স্কার্ট। চুলগুলো খোলা, পিঠময় ছড়ানো। ঠোঁটে গাঢ় লাল লিপস্টিক। তাকে আজ সুন্দর লাগছে না, লাগছে ভয়ংকর মোহময়ী!
"এসো, ভেতরে এসো," অরুণা হাসল।
জীবনে এই প্রথম আমি তাকে প্রাণখুলে হাসতে দেখলাম। সেই হাসিতে দাঁতগুলো ঝকঝক করে উঠল।
"পুরো ভিজে গেছ তো! জ্বর আসবে। দাঁড়াও, টাওয়েল দিচ্ছি।"
সে পরম মমতায় আমার মাথা মুছিয়ে দিল। আমার ভেজা শার্টের ওপর দিয়ে হাত বুলিয়ে দিল বুকে। "ও কেমন আছে সাগর? কষ্ট হচ্ছে ওর?"
আমি হাসলাম। "না। তোমাকে দেখে ও এখন শান্ত।"
অরুণা আমাকে ড্রয়িংরুমে বসাল। ঘরটা পরিপাটি, কিন্তু অদ্ভুত একটা গন্ধ। হাসপাতালের ফিনাইল আর দামী পারফিউম মেশানো একটা গন্ধ। "তুমি বসো, আমি কফি বানিয়ে আনছি। গরম কফি খেলে শরীরটা চাঙ্গা হবে।"
আমি সোফায় হেলান দিয়ে বসলাম। বাইরে বৃষ্টির তোড় বাড়ছে। জানালার কাঁচে বৃষ্টির বাড়ি খাওয়ার শব্দ। ঠাস! ঠাস! যেন কেউ ভেতরে ঢোকার জন্য মরিয়া হয়ে আছে। অরুণা কফি নিয়ে এল। ধপধপে সাদা মগে কালো কফি। "নাও। চিনি একটু বেশি দিয়েছি। তোমার তো আবার তেতো পছন্দ না।"
আমি কফির মগে চুমুক দিলাম। স্বাদটা একটু অন্যরকম। একটু বেশিই কড়া লাগল। কিন্তু অরুণার নিজ হাতে বানানো কফি বলে কথা, আমি অমৃতের মতো গিললাম।
এরপর অরুণা আমার খুব কাছে ঘেঁষে বসল। তার শরীরের উষ্ণতা আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। আমি বললাম, "জানো অরুণা, মাঝে মাঝে মনে হয় রুমন মরে গিয়ে আসলে আমাদের মিলিয়ে দিয়ে গেছে। হয়তো আমাদের নিয়তি এক সুতোয় গাঁথা ছিল। এই হার্টটা না থাকলে তোমার সাথে আমার দেখা হতো না।"
অরুণা আমার হাত থেকে খালি মগটা নিয়ে টিপয়তে রাখল। শব্দ করে নামাল মগটা। তারপর আমার বুকে মাথা রাখল। "ঠিক বলেছ সাগর। রুমন আমাদের মিলিয়ে দিয়েছে। ও ঋণী ছিল আমার কাছে। সেই ঋণ শোধ করতেই তোমাকে পাঠিয়েছে।"
কথাটা কেমন যেন ঠেকল। ঋণ? কীসের ঋণ? জিজ্ঞেস করতে যাব, হঠাৎ আমার মাথাটা একটু ঝিমঝিম করে উঠল। মনে হলো ঘরের ছাদটা দুলছে। চোখের সামনের মোমবাতিটা দুটো-তিনটে মনে হচ্ছে। "অরুণা..." আমার জিভ জড়িয়ে আসছে। "আমার শরীরটা কেমন করছে… আমার এমন লাগছে কেন? তুমি কি কফিতে... কফিতে কিছু মিশিয়েছ? "
অরুণা উত্তর দিল না। সে আমার বুক থেকে মাথাও তুলল না। আমার হাত-পা ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে শরীরের ওপর মণকে মণ পাথর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি হাত নাড়াতে চাইছি, পারছি না। আমার পেশিগুলো অবশ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, আমার চেতনা পুরোপুরি সজাগ। আমি সব দেখতে পাচ্ছি, শুনতে পাচ্ছি, বুঝতে পারছি। শুধু নড়তে পারছি না। প্যারালাইসড হয়ে গেছি মনে হচ্ছে!
অরুণা এবার সোজা হয়ে বসল। সে আমার দিকে তাকাল। তার চোখের সেই মায়াবী দৃষ্টি আর নেই। সেখানে এখন জ্বলছে আদিম এক আক্রোশ। চোখের মণি দুটো যেন জ্বলন্ত কয়লা।
সে আমাকে সোফার মধ্যে লম্বা করে শুইয়ে দিল। তারপর আমার শার্টের বোতামগুলো খুলতে শুরু করল। একটা একটা করে। আমি বাধা দিতে চাইলাম, গলা দিয়ে গোঙানির মতো শব্দ বের হলো—"অ... অরু... ণা..."
অরুণা আমার শার্টের সবগুলো বোতাম খুলে শার্টটা দুপাশে সরিয়ে বুকটা উন্মুক্ত করে দিল। আমার বুকের মাঝখানে অপারেশনের লম্বা সেলাইয়ের দাগটা এখনো দগদগে। উঁচু হয়ে আছে চামড়া। অরুণা সেই দাগের ওপর আঙুল বুলিয়ে দিল। তার নখটা একটু দেবে গেল আমার চামড়ায়।
"সাগর, তুমি আমাকে ভালোবাসো?" অরুণা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল। তার মুখটা আমার কানের খুব কাছে।
আমি চোখের ইশারা করলাম- হ্যাঁ, খুব ভালোবাসি।
অরুণা হাসল। সেই হাসি আর আগের মতো মিষ্টি নেই। সেই হাসিতে এখন মিশে আছে এক পৈশাচিক আনন্দ।
"আমিও ভালোবাসতাম সাগর। খুব ভালোবাসতাম। তবে তোমাকে না, বা রুমনকেও না। আমি ভালোবাসতাম আমার ছোট ভাই অপুকে। আমার দশ বছরের ছোট্ট ভাইটা... ওকে আমি নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসতাম।"
অপু? হঠাৎ অপু আসছে কোথা থেকে? আমি বিভ্রান্ত হয়ে তাকালাম। অরুণা উঠে দাঁড়াল। সোফার নিচ থেকে একটা ছোট স্টিলের ট্রে বের করল। মোমবাতির আলোয় ট্রে-র ওপর রাখা বস্তুটা ঝিলিক দিয়ে উঠল। একটা সার্জিক্যাল ব্লেড। আর একটা ছোট কাঁচের জার। জারে ফরমালিন জাতীয় কোনো তরল টলটল করছে।
আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। আমার মস্তিষ্ক বিপদ সংকেত দিচ্ছে, কিন্তু আমার শরীর পাথরের মতো স্থির।
অরুণা ব্লেডটা হাতে নিয়ে আমার বুকের ওপর এসে বসল। তার ওজনটা আমার বুকে চাপ সৃষ্টি করল। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। সে ব্লেডের ধারালো দিকটা আমার গলার কাছে ধরল।
"তুমি জানো সাগর, অপু কেন মারা গিয়েছিল?" অরুণার গলা এখন বরফের মতো ঠান্ডা। "সামান্য জ্বর হয়েছিল ওর। সেই সাথে বুকের বা দিকে খুব ব্যথা ছিল। আমার বাবা ওকে নিয়ে গিয়েছিল শহরের সেরা কার্ডিয়াক স্পেশালিস্ট ডাঃ রুমনের কাছে। রুমনের তখন অনেক নামডাক। কিন্তু খুব অ্যারোগেন্ট আর ওভার কনফিডেন্ট ছিল সে। ও অপুকে ভালো করে দেখলও না। একটা ইনজেকশন পুশ করল। বলল সব ঠিক হয়ে যাবে।"
অরুণার চোখ দিয়ে জল পড়ছে, কিন্তু মুখে ক্রূর হাসি। "সব ঠিক হয়নি সাগর। ইনজেকশনটা ভুল ছিল। বাসায় ফিরে আমার ভাইয়ের শরীরে খিঁচুনি শুরু হলো। ভুল ইনজেকশনের রিঅ্যাকশনে আমার দশ বছরের ভাইটা আমার কোলেই নীল হয়ে মরে গিয়েছিল। ছটফট করতে করতে মরেছিল ও। আর রুমন? ও কী বলেছিল জানো? ও বলেছিল—'ইটস অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট। এমন হয়।' ও সরিও বলেনি। ওর টাকার জোরে, ক্ষমতার জোরে কেস ধামাচাপা দিয়ে দিল।"
অরুণা ব্লেডটা আমার বুকের সেলাইয়ের দাগের ওপর আলতো করে ছোঁয়াল। আমি তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভব করলাম। চামড়া কেটে এক ফোঁটা রক্ত বেরিয়ে এল। আমি চিৎকার করতে চাইলাম, কিন্তু গলার স্বর ফুটল না। ওষুধের প্রভাবে আমার ভোকাল কর্ড অবশ।
"আমি সেদিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আমি বদলা নেব," অরুণা হিসহিস করে বলল। সাপের মতো ফোঁস ফোঁস করছে তার নিঃশ্বাস। "আমি ছক সাজালাম। ঘটনাচক্রে ওর সাথে পরিচিত হলাম। রুমনের সাথে প্রেমের নাটক শুরু করলাম। ছয় মাস... দীর্ঘ ছয় মাস আমি ওই খুনিটার সাথে হেসেছি, ঘুরেছি… শুয়েছি। মনের ভেতর ঘৃণার পাহাড় চাপা দিয়ে ওর স্পর্শ সহ্য করে গেছি, কিন্তু ওকে একদমই বুঝতে দেইনি। ও আমার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল। আমি যা বলতাম তাই করতো, আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝতো না। প্রেমে এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিল… ধরতেই পারেনি যে আমি ওর হাতে খুন হওয়া একজন ভিক্টিমের বড়বোন!"
বাইরে বাজ পড়ল। কড়-কড়-কড়! ঘরটা কেঁপে উঠল।
"সেদিন ও যখন লং ড্রাইভে যাচ্ছিল, আমিই ওর কফির ফ্লাস্কে হাই ডোজে সিডেটিভ মিশিয়ে দিয়েছিলাম। ঠিক যেমনটা আজ তোমাকে দিয়েছি। ওটা অ্যাক্সিডেন্ট ছিল না সাগর, ওটা ছিল ঠান্ডা মাথার খুন। আমি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ওর গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়তে দেখেছি। গাড়িটা দুমড়েমুচড়ে গিয়েছিল। আমার কী যে শান্তি লেগেছিল, জানো!"
অরুণা পাগলের মতো হাসতে থাকল।
"আমি ভেবেছিলাম ও শেষ। আমার প্রতিশোধ পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু এক সপ্তাহ পর খবর পেলাম... ওর হার্টটা নাকি দান করা হয়েছে। তারমানে ও মরে গিয়েও আসলে মরেনি! ওর শরীর পচে গেছে, কিন্তু ওর ওই পচা হার্টটা এখনো বেঁচে আছে। ওটা তোমার বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। তুমি ভেবেছো তুমিই আমাকে খুঁজে বের করেছো? না, সাগর! তুমি যেন আমাকে খুঁজে পাও- সেই ব্যবস্থা আমিই করেছিলাম!"
সে ব্লেডটা উঁচিয়ে ধরল। "তোমার হার্টের প্রতিটা বিট... ধক-ধক, ধক-ধক... আমার সমস্ত শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। এটা আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে আমি ব্যর্থ হয়েছি। আমার ভাইয়ের খুনি এখনো শ্বাস নিচ্ছে, সে এখন অন্য একটা শরীরের ভেতর লুকিয়ে আছে!"
আমি আমার বুকের ভেতর সেই অভিশপ্ত হার্টটার উন্মাদ লাফালাফি টের পাচ্ছি। ওটাও হয়তো বুঝতে পারছে ওর শেষ সময় এসে গেছে। এত জোরে বিট করছে যে মনে হচ্ছে পাজর ভেঙে বেরিয়ে আসবে। আমি অরুণার চোখের দিকে তাকালাম। সেখানে আমি আমার মৃত্যুকে দেখছি। কোনো মায়া নেই, কোনো দয়া নেই।
"রুমনের হার্টটা তোমার শরীরে খুব আরামে আছে, তাই না? তোমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে? আজ আমি ওটাকে বের করব। আমি নিজের হাতে ওটাকে টেনে বের করব। তারপর কুচি কুচি করে কাটব। যতক্ষণ না ওটা পুরোপুরি থেমে যাচ্ছে, যতক্ষণ না ওটার শেষ স্পন্দনটুকু নিভে যাচ্ছে, ততক্ষণ আমার অপুর আত্মা শান্তি পাবে না।"
অরুণা ব্লেডটা চেপে ধরল আমার বুকের ঠিক মাঝখানে। "ভয় পেও না সাগর। তুমি তো শুধু একটা খোলস। একটা কন্টেইনার। আমার রাগ তোমার ওপর না, আমার রাগ ভেতরের ওটার ওপর। একটু কষ্ট হবে, তারপর সব শান্ত।"
চামড়া কেটে মাংসের গভীরে ঢুকে যাচ্ছে ধারালো ব্লেড। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছিটকে এসে লাগল অরুণার মুখে। লাল টপস আরও লাল হয়ে গেল। আমি ব্যথাটা অনুভব করছি, কিন্তু চিৎকার করতে পারছি না। আমার চোখের সামনে আমার ভালোবাসার মানুষটা আমার বুক চিরে ফেলছে! আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমার বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা ধুকপুক করছে। জীবন্ত একটা মাংসপিণ্ড।
অরুণা পৈশাচিক ভঙ্গীতে হাসতে হাসতে বলল, "পেয়েছি! এই তো তুই! আর কত লুকিয়ে থাকবি রুমন?"
অরুণা হাত বাড়িয়ে দিল আমার বুকের দিকে…
আমার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। তাকিয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে খুব।
বাইরে আবার বজ্রপাত হলো। সেই প্রচণ্ড শব্দের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল আমার নীরব আর্তনাদ। আমার সেকেন্ড হ্যান্ড হার্ট পুড়তে থাকল প্রতিশোধের আগুনে। আর আমি? এক ভুল গল্পের ভুল নায়ক হয়ে পড়ে রইলাম সোফায়।
(সমাপ্ত)
---
ছোটগল্প: সেকেন্ড হ্যান্ড হার্ট
লেখক: নাজিম উদ দৌলা
১৩/৪/২০২৬