23/08/2026
সালটা ২০০৬। পরিবারের সাথে সিঙ্গাপুরে বেড়াইতে গেসি।
একটা গার্ডেনে একটা ছেলেকে কাজ করতে দেখসিলাম। কিশোর। মুখে গোঁফের রেখা তখনো ঠিকমতো গজায় নাই। হাতে একটা কাঁচি, মাথা নিচু, রোদের মধ্যে ঝুঁইকা কাজ করতেসিল।
আমরা বেড়াইতে গেসিলাম। সে কাজ করতেসিল। একই বাগানে, একই রোদে, দুইটা আলাদা পৃথিবী।আমরা পাশে দাঁড়ায়ে বাংলায় কথা বলতেসিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম ছেলেটা কাজ থামায়ে দাঁড়ায়ে আছে। কিছু কয় না, নড়েও না। খালি তাকায়ে আছে।
জিগাইলাম, বাংলাদেশি?
সে কোনো কথা কয় নাই। খালি মাথা নাড়ায়ে হ্যাঁ বলল। আর দুই চোখ দিয়া পানি গড়ায়ে পড়ল।
ছেলেটা ওই বাগানে পৌঁছানোর আগেই তার একটা জীবন শেষ হইয়া গেছে।
কারণ বাংলাদেশ থাইকা বিদেশে যাইতে হইলে আগে দেশের ভিতরে একটা যুদ্ধ জিততে হয়। দালাল ধরতে হয়। দালালের উপরে সাব-এজেন্ট, তার উপরে রিক্রুটিং এজেন্সি, তার উপরে আরও কেউ, যার নাম গ্রামের কেউ জানে না।
আর টাকাটা আসে কোথা থাইকা?
জমি বন্ধক। বাপের ভিটার এক কোনা বেচা। এনজিওর কিস্তি। গ্রামের মহাজনের সুদ। মায়ের কানের দুল। আত্মীয়স্বজনের কাছে হাওলাত।
মা গয়নাটা বাক্স থাইকা বাইর করেন। বহু বছর পরেন নাই, তাও রাইখা দিসিলেন। মেয়ের বিয়ায় দিবেন বইলা রাইখা দিসিলেন। ওইটা তিনি ছেলের হাতে তুইলা দেন, আর কোনো কথা কন না। এইভাবে বাংলাদেশের একটা দরিদ্র পরিবার তার ভবিষ্যৎটা ভাইঙা একটা টিকিট বানায়।
একজন বাংলাদেশি শ্রমিকের বিদেশ যাইতে গড়ে লাগে চার থাইকা ছয় লাখ টাকা, যেইটা সরকারের নিজের বাঁধা রেটের চেয়ে অনেক বেশি।
এই টাকাটা তুলতে তার কত সময় লাগে?
২০১৫ থাইকা ২০১৮ সালের মধ্যে যাওয়া কম-দক্ষ শ্রমিকদের হিসাবে, খরচ তুলতে গড়ে সতেরো মাসের বেশি কামাইতে হয়। সৌদি আরবে যারা যায়, তাদের লাগে প্রায় বিশ মাস। আর একই কাজে ভিয়েতনামের একটা ছেলের কত লাগে?
আড়াই থাইকা সাড়ে চার মাসের বেতন। সতেরো মাস বনাম সাড়ে চার মাস। মানে বাংলাদেশি ছেলেটা প্লেনে ওঠার দিনই দেড় বছরের জন্য বিক্রি হইয়া গেছে।
প্রথম দেড় বছর সে নিজের জন্য কাজ করে না। সে কম ঘুমায়, আধা পেটা খায়, ওভারটাইম করে। সেই সবটুকু যায় দালালের পেটে, এজেন্সির পেটে, সুদের পেটে।
আর সে যখন প্রথম মাসের ফোনটা দেয়, তখন কী বলে? বলে, ভালো আছি মা। সে মিথ্যা বলে। কারণ সত্যটা বললে মা সারা রাত জাইগা থাকবেন, আর করার কিছু নাই।
নেপাল থাইকা একজন শ্রমিক পাঠাইতে যা লাগে, বাংলাদেশে লাগে তার তিন গুণ।
ওই বাড়তি দুই গুণ বাতাসে মিলায়ে যায় না। ওই দুই গুণ কারও পকেটে যায়।
ধরেন সব ঠিক হইল। ভিসা হইল, মেডিকেল হইল। এখন খালি উড়তে হবে।
এগারোটা আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স, তাদের জিএসএ আর অন্তত ত্রিশটা ট্রাভেল এজেন্সি মিলা মধ্যপ্রাচ্যের রুটে টিকিটের দাম বাড়ায় পঞ্চাশ থাইকা দুইশ শতাংশ পর্যন্ত।
নাম ছাড়া গ্রুপ বুকিং দিয়া টিকিট আটকায়ে রাখে, কৃত্রিম সংকট বানায়ে, তারপর দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে বেচত। ঢাকা-সৌদি রুটের টিকিট বিক্রি হইসে এক লাখ নব্বই হাজার টাকা পর্যন্ত। যেই টিকিটের আসল দাম হওয়ার কথা পঞ্চাশ হাজারের মতো। দেড় লাখ টাকা। বাতাস থাইকা।
একজন ভারতীয় শ্রমিক রিয়াদে পৌঁছাইতে খরচ করে পনেরো হাজার টাকার মতো। নেপালি পঁয়ত্রিশ হাজার। শ্রীলঙ্কান চল্লিশ হাজার।
ঢাকা থাইকা আমেরিকার বিশ ঘণ্টার টিকিট শুরু হয় ষাট হাজারে, ওইদিকে সৌদির পাঁচ ঘণ্টার ফ্লাইটে নেওয়া হয় প্রায় এক লাখ।
বিশ ঘণ্টা উড়লে ষাট হাজার। পাঁচ ঘণ্টা উড়লে এক লাখ। এইটা তেলের দাম না। এইটা দূরত্বের দাম না।এইটা অসহায়ত্বের দাম।
কারণ ওই লোকটা জানে, টিকিটটা আজ না কাটলে ভিসার মেয়াদ শেষ হইয়া যাবে। আর ভিসা শেষ হইলে জমিটা যাবে। জমি গেলে ভাইয়ের বিয়া যাবে, বাপের কবরের জায়গা যাবে, বাড়ির নামটা যাবে।
সে দরদাম করে না। সে দরদাম করার অবস্থায় নাই।আর ওরা ঠিক এইটাই জানে।
কিন্তু তারা বেতনটা কি ঠিকমতো পায়?
কুয়েতে পাঁচ মাসের বকেয়া বেতনের জন্য থানায় গিয়া অভিযোগ করতে গেসিল কিছু বাংলাদেশি শ্রমিক।
সাহায্য পাওয়ার বদলে তাদের আটক কইরা দেশে ফেরত পাঠানো হইল। একশ ত্রিশজনের মতো। পাঁচ মাস বেতন পায় নাই, সেইটা অপরাধ না। বিচার চাইতে গেসিল। আর বিচার চাওয়াটাই হইয়া গেল অপরাধ।
তারা দেশে ফিরল খালি হাতে। পাঁচ মাসের টাকা তো গেলই, চাকরিটাও গেল, ভিসাটাও গেল। আর জমিটা তখনো বন্ধক।
মালয়েশিয়ায় বছরের পর বছর বেতন দেরিতে দেওয়া, হুমকি দেওয়া, পাসপোর্ট কাইড়া রাখা, এইগুলা এখন সাধারণ ঘটনা।
দূতাবাস কই ছিল?
একজন নারী গৃহকর্মী লজ্জা আর ভয় ভাইঙা বলসিলেন, মালিক বেতন দিত না, বেতন চাইলে মারত। তিনি জেদ্দায় দূতাবাসের শ্রম দপ্তরে ফোন করসিলেন।
কেউ ফোনটা ধরে নাই।
একটা অসহায় মেয়ে, দেশ থাইকা হাজার মাইল দূরে, একটা তালাবদ্ধ ঘরে, মার খায়ে, নিজের দেশের দূতাবাসে ফোন দিল। আর ওইপাশে ফোনটা বাজতেই থাকল। ওই ঘরে যে বইসা ছিল, তার বেতন হয় এই মেয়েটার পাঠানো ডলার দিয়া।
ধরেন সব ভালোভাবে শেষ হইল। সে বাইচ্যা আছে, কিছু টাকা জমসে, সে দেশে ফিরতেসে।
ব্যাগে কী থাকে?
মায়ের জন্য একটা শাড়ি, যেইটা কিনতে সে দোকানে তিনবার গেছে। বউয়ের জন্য একটা মোবাইল। ছেলের জন্য একটা খেলনা, যেই ছেলেটা তার কোলে ওঠে নাই কোনোদিন। কিছু খেজুর। কিছু আতর। আর টুকটাক জিনিস, যেইগুলা ওইখানে সস্তা।
ওই ব্যাগটার ওজন বিশ কেজি।
কিন্তু ওই ব্যাগটাই তার আট বছর। ওই ব্যাগটার ভিতরেই তার সব ঈদ, সব জন্মদিন, সব অনুপস্থিতি।
সে বছরের পর বছর নিজের জন্য কিছু কিনে নাই, যাতে ওই ব্যাগটা ভরা থাকে। যাতে বিমানবন্দরে বাইর হওয়ার সময় তার হাতে কিছু একটা থাকে। যাতে সে খালি হাতে বাড়ি না ফেরে।
ইমিগ্রেশনের দুর্ব্যবহারের পর্ব শেষ কইরা ব্যাগ নিতে গিয়া সে দেখে ব্যাগ কাটা। ভিতরের অনেক জিনিস নাই। সে সৌদির মরুভূমিতে আট বছর কাটাইসে, তার কিছু হারায় নাই, কিন্তু তার ব্যাগ কাটল ঢাকায়।
নিজের দেশে। নিজের বিমানবন্দরে। নিজের দেশের লোকের হাতে। আর সে কার কাছে নালিশ করবে? কে শুনবে? সে দাঁড়ায়ে থাকে কাটা ব্যাগটা হাতে নিয়া, তারপর ব্যাগটা টাইনা নিয়া বাইর হইয়া যায়।
কারণ তার তাড়া আছে। বাড়িতে লোক অপেক্ষা করতেসে।
২০২৫ সালে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে পাঠাইসেন রেকর্ড বত্রিশ দশমিক আট বিলিয়ন ডলার।
এই টাকা দিয়া রিজার্ভ বাঁচে। এই টাকা দিয়া আমদানির বিল মেটে। এই টাকা দিয়া গাড়ি আসে, ফ্ল্যাট ওঠে, প্রকল্প হয়, ফিতা কাটা হয়। সরকারি কর্মচারীদের বেতন হয়। সব ফুটানি হয়। আর আমরা আদর কইরা তাদের ডাকি রেমিট্যান্স যোদ্ধা।
রেমিট্যান্স এর এই টাকার একটা টাকাও কোনো মন্ত্রী আনে নাই। কোনো সচিব আনে নাই। কোনো অর্থনীতিবিদ আনে নাই। এই টাকা আনসে ওই ছেলেটা, যে বাগানে দাঁড়ায়ে কানতেসিল।
আর যদি কপাল খারাপ হয়?
শাহজালাল বিমানবন্দরের হিসাবে গড়ে প্রতিদিন আট থাইকা দশটা কফিন নামে। এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের।
প্রতিদিন।
আপনি এই লেখাটা যত সময়ে পড়তেসেন, ওই সময়ের মধ্যে দেশের কোনো একটা গ্রামে কারও ফোন বাজতেসে। তাদের সন্তানের কফিন আসছে প্রবাস থিকা।
কফিনটা কোন গেট দিয়া ঢোকে?
কার্গো গেট।
যেইখানে অপেক্ষা করা পরিবারগুলার জন্য বসার জায়গা নাই, টয়লেট নাই। কফিনকে মালামালের মতো ধরা হইত, আর পরিবারগুলা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়ায়ে থাকত।
একটা বুড়া বাপ, সারা রাত বাসে কইরা গ্রাম থাইকা আসছে, কার্গো গেটের বাইরে দাঁড়ায়ে আছে। বসার জায়গা নাই বইলা দাঁড়ায়ে আছে।
যেই লোকটার পাঠানো টাকায় রিজার্ভ টিকে থাকে, সে ফেরে মালামাল হিসাবে।
আর আমরা এইটা মাইনা নিসি। বছরের পর বছর মাইনা নিসি। অথচ আমাদের একটা আস্ত মন্ত্রণালয় আছে, যার নামেই লেখা আছে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
দাফন আর পরিবহন বাবদ পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার একটা চেক, পরিবারের হাতে ধরায়ে দেওয়া।
যেই লোকটা যাইতে চার লাখ টাকা খরচ করসিল, তার ফিরা আসার দাম পঁয়ত্রিশ হাজার।
আর সে মরল কীভাবে, সেইটাও কেউ জানে না।
মৃত প্রবাসীদের প্রায় অর্ধেক পরিবার মৃত্যুসনদে লেখা কারণটা বিশ্বাস করে না। কারণ তারা শরীরে আঘাতের দাগ দেখসে। কারণ তারা আগে ফোনে নির্যাতনের কথা শুনসিল। গবেষণা বলতেসে, ফেরত আসা লাশের একত্রিশ শতাংশের মৃত্যু হইসে দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা বা সন্দেহজনক হত্যাকাণ্ডে।
দাফনের সময় এক পরিবার লাশের গায়ে অস্ত্রোপচারের গভীর কাটা দাগ দেখে। পরে ময়নাতদন্তে দেখা যায়, কিডনি দুইটা নাই। পত্রিকায় আসছে।
সে বিদেশে গেসিল শরীরটা বেচতে। শরীরটাই ছিল তার একমাত্র পুঁজি।
শেষে ওই শরীরটাও তারা আস্ত ফেরত দেয় নাই।
ইউনূস সরকার শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রবাসী কর্মীদের জন্য একটা প্রবাসী লাউঞ্জ উদ্বোধন করসে। বলা হইসে, প্রবাসীরা যেন বিমানবন্দরে অতিথির মতো সম্মান পান।
কিন্তু প্রবাসীরা কি লাউঞ্জ চাইসিল? এইটা কি তাদের প্রধান সমস্যা? ইউনুস সরকার কি জানতো ওই ছেলেটা বাগানে ক্যান দাড়ায়ে কান্দে?
সে চাইসিল টিকিটটা এক লাখ নব্বই হাজার না হইয়া পঞ্চাশ হাজার হোক।
সে চাইসিল দালালকে ছয় লাখ টাকা না দিয়া যাওয়ার একটা রাস্তা থাকুক।
সে চাইসিল জেদ্দায় ফোন করলে কেউ যেন ফোনটা ধরে।
সে চাইসিল ব্যাগটা যেন কাটা না থাকে।
সে চাইসিল মরলে যেন তার বাপ কার্গো গেটে দাঁড়ায়ে না থাকে।
সে বিমানবন্দরে সোফা চায় নাই। সে বিমানবন্দর থাইকা বাইর হইতে চাইসিল, ইজ্জত নিয়া।
আমি এখন জানি ছেলেটা কেন কানতেসিল।
সে কানতেসিল এই কারণে না যে তার কষ্ট হইতেসিল। কষ্টে মানুষ এইভাবে কান্দে না। কষ্টে মানুষ শব্দ করে। সে কানতেসিল কারণ অনেক দিন পর কেউ তার ভাষায় কথা বলতেসিল।
মাসের পর মাস সে এমন একটা জায়গায় আছে যেইখানে সে খালি একটা হাত। তার নাম নাই, তার গল্প নাই, তার মা নাই, স্বজন নাই। সে একটা কর্মী নম্বর।
তারপর হঠাৎ কয়েকটা মানুষ পাশ দিয়া হাঁইটা যায়, আর তাদের মুখে সেই শব্দগুলা, যেই শব্দ দিয়া তার মা তারে ডাকত।
ওই মুহূর্তে ভিতরে যা জমা ছিল, সেইটা আর ধরে রাখা যায় নাই।
সে আমাদের দিকে তাকায়ে ছিল, আর আমরা তার দিকে তাকায়ে ছিলাম। মাঝখানে কোনো দূতাবাস ছিল না, কোনো এজেন্সি ছিল না, কোনো লাউঞ্জ ছিল না।
খালি অব্যক্ত একটা ভাষা ছিল। তারপর আমরা হাঁইটা চইলা গেসি। আর সে আবার মাথা নিচু কইরা কাজে ফিরা গেছে।
বিশ বছর হইয়া গেছে। ছেলেটার এখন চল্লিশের কাছাকাছি বয়স হওয়ার কথা। সে বাইচ্যা আছে কি না আমি জানি না। সে দেশে ফিরসে কি না আমি জানি না। ফিরলে সে কোন গেট দিয়া ফিরসে, সেইটাও আমি জানি না।
কারণ আমি তার নামটা জিগাই নাই।
এইটাই আমরা। আমরা তাদের টাকাটা নিসি। ভাতটা নিসি, রিজার্ভটা নিসি, ঈদটা নিসি।
নামটা জিগাই নাই। জিগানোর প্রয়োজন মনে করি নাই।
আমরা সবাই ওই বাগানটা চিনি। আমাদের ঘরে ঘরে একটা ছেলে ওইখানে দাঁড়ায়ে আছে, চোখ দিয়া পানি পড়ে মাঝে মাঝে, আর তাদের কেউ কেউ ফিরা আসে মালামালের মতো, কার্গো গেট দিয়া।
C: Pinaki Bhattacharya - পিনাকী ভট্টাচার্য