11/05/2026
দৈনিক এইদিন ফেসবুকে একটা ভিডিও দেখলাম। শিরোনাম: “আর্মিরা ড্রোন না বানিয়ে মিষ্টি বানিয়ে বিক্রি করে” — দিলারা চৌধুরী।
ভিডিওতে যা যা বলা হয়েছে, তা মূলত একজন শিক্ষিত মানুষের কাছ থেকে অত্যন্ত অগভীর, আবেগীয় ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সমালোচনা। ওনার সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে এত সীমিত জ্ঞান বিস্ময়কর। তিনি কী উদ্দেশ্যে, কার এজেন্ডা বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীকে টার্গেট করেছেন জানি না।
এ ধরনের বক্তব্য না জেনে, না বুঝে একটা পুরো প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করা খুব নিকৃষ্ট একটি কাজ।
দিলারা চৌধুরী যে বিষয়গুলো না বুঝে মন্তব্য করেছেন, তা তুলে ধরছি—
১। প্রতিরক্ষা বাজেট সিক্রেট নয় — প্রতি বছর জাতীয় বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে কত টাকা বরাদ্দ হয়, তার বিস্তারিত তথ্য সংসদে উপস্থাপন করা হয় এবং সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। এটা কোনো গোপন বিষয় নয়। উনি স্টাডি করলেই জানতে পারবেন, কোন বছর কত শতাংশ বাজেট ডিফেন্সের জন্য বরাদ্দ ছিল।
২। ডিফেন্স পলিসি আছে, নাকি নাই?
প্রকৃতপক্ষে ডিফেন্স পলিসি আমাদের দেশে বিদ্যমান। আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনের ওয়েবসাইটেই ডিফেন্স পলিসি হোয়াইট পেপার রয়েছে। একজন শিক্ষক মানুষ মিডিয়ার সামনে এমন অজ্ঞতার পরিচয় দেবেন, ভাবতে পারিনি।
বিস্তারিত দেখুন:
https://afd.gov.bd/sites/default/files/2025-07/DEFENCE%20POLICY_2.pdf
৩। ক্লিয়ার শত্রু ঘোষণা না করা — কোনো দেশই প্রকাশ্যে বলে না “অমুক আমার শত্রু”। এটা কূটনৈতিক অপরিপক্বতা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হলো “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে শত্রুতা নয়”। আর একটি দেশের সশস্ত্র বাহিনী গঠিত হয় নানা দিক বিবেচনা করে, ক্লিয়ার শত্রু ডিক্লেয়ার করে নয়। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, আশপাশের দেশের সামরিক সক্ষমতা, রিস্ক পর্যালোচনা, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে সশস্ত্র বাহিনীর গঠন, সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা করা হয়। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীও সেভাবেই সংগঠিত হয়েছে এবং আধুনিকায়ন হচ্ছে।
৪। মিষ্টি বানানোর অভিযোগ — এ বিষয়ে তার বক্তব্যেই মিথ্যাচার রয়েছে। কেউ বলবে না সেনাবাহিনীর জওয়ান মিষ্টি বানিয়েছে। বলবে, অমুক ক্যান্টিন থেকে বা দোকান থেকে কিনেছে। আর প্রকৃত সত্য হলো, সেনাবাহিনীর কোনো জওয়ান কখনো মিষ্টি বানায় না। কোনো ক্যান্টিনে মিষ্টি বানানো হলে তা সিভিল কোনো মিষ্টির কারিগর বানায়। আর একথাও জেনে রাখা ভালো যে, সেনাকল্যাণ কিংবা আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের অধীনে যে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো চলে, সেখানে কাজ করেন সিভিলিয়ান কর্মী, টেকনিশিয়ান ও ব্যবস্থাপকরা। সেনাবাহিনী শুধু ম্যানেজমেন্ট, ডিসিপ্লিন, লজিস্টিকস ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই সামরিক বাহিনীর ওয়েলফেয়ার ফান্ড থাকে ভেটেরান্স ও তাদের পরিবারের জন্য। এটা কোনো অপরাধ নয়।
৫। আর্মি কেন দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিভিন্ন কাজ করে — কারণ বেসামরিক প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতি, অদক্ষতা ও সময়মতো কাজ করতে ব্যর্থ হয়। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, কোভিড, সেতু-রাস্তা নির্মাণ — এসব ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীকে ডাকা হয় তাদের দ্রুততা, সততা ও সাংগঠনিক দক্ষতার জন্য। পৃথিবীর প্রায় সব দেশের আর্মিই কমবেশি এ ধরনের কাজে নিয়োজিত থাকে।
দিলারা চৌধুরীর মতো শিক্ষিত ব্যক্তির কাছ থেকে এমন অগভীর, আবেগীয় ও একপেশে বক্তব্য আশা করা যায় না। সমালোচনা করার অধিকার সবার আছে, কিন্তু তথ্য ও বাস্তবতা ছাড়া পুরো সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়ে উপহাস করা শিক্ষিত মানুষের জন্য মানায় না। এই সশস্ত্র বাহিনী তো আপনারই, আপনাদের, দেশের। অপমান করলে তো আপনিও অপমানিত হবেন। আপনার অনেক বয়স হয়েছে। আপনার শুভবুদ্ধির উদয় হোক।