10/07/2025
হ্যারি পটারের গল্পটা পড়েছেন? পড়ে থাকলে এখন যা বলবো, বুঝতে পারবেন। না পড়ে থাকলে সাড়ে তিন হাজার পৃষ্ঠার গল্প এক স্ট্যাটাসে লিখে বুঝানো কঠিন।
কৈশোরে বলা যায়, আমি হ্যারি পটার নিয়ে এক প্রকার অবসেসড ছিলাম। সাতটা বইয়ের সাতটাই পড়েছি। তা-ও ইংরেজিতে। বেশ কয়েকবার। মুভিগুলো তো অসংখ্যবার দেখেছি।
যে জন্যে হ্যারি পটার নিয়ে এতো বকবক করবো, সেটার কথা বলি এখন। হ্যারি পটারের জগতে খুব খারাপ একটা জাদুকর ছিলো। নাম তার টম রিডল। নিজেকে সে অবশ্য ডাকে ‘লর্ড ভোল্ডেমর্ট’ নামে। প্রত্যেক নার্সিস্টেরই নিজের বাপ-মায়ের দেয়া নাম পছন্দ হয় না। তার দরকার অন্য নাম। অন্য টাইটেল। যেমনঃ বঙ্গবন্ধু, দেশরত্ন, সুপ্রিম লিডার, গণতন্ত্রের মানস-কন্যা— ইত্যাদি, ইত্যাদি।
নিজেকে ভোল্ডেমর্ট নাম দিলেও মানুষ তাকে সে নামে ডাকতে ভয় পেতো। ভাবতো, এ নাম প্রকাশ্যে নিলে অকল্যাণ আসবে। ফুডপান্ডার ডেলিভারি আসবে। তাই তারা তাকে ডাকতো ‘ইউ-নো-হু’ নামে।
তো ভোল্ডেমর্ট একবার জানতে পারে, জুলাইয়ের শেষে এক শিশু জন্ম নেবে। যে শিশু তার পতনের কারণ হতে পারে। তাই সে চলে যায় তাকে হত্যা করতে। সেই শিশুটার নামই হ্যারি পটার। হ্যারি পটারের মা তাকে বাঁচাতে খুব প্রাচীন একটি জাদুর আশ্রয় নেন।
জাদুটা এভাবে কাজ করে— কেউ যখন কাউকে হত্যা করতে চাইবে, তখন অন্য আরেকজন যদি যাকে হত্যা করা হচ্ছে তাকে বাঁচানোর জন্যে কোনো জাদুর প্রয়োগ না করে হত্যাকারীর সামনে দাঁড়িয়ে যান, তাহলে যে হত্যা করতে চাচ্ছে, সে আর তাকে হত্যা করতে পারবে না। জাদুটা অনেকটা আবু সাইদের মতো কাজ করে। ফ্যাসিস্টের হাত থেকে জাতিকে বাঁচাতে গুলির সামনে বুক পেতে কোনো অস্ত্র ছাড়াই দাঁড়িয়ে যেতে হবে।
হ্যারির মা সেটাই করেন। ভোল্ডেমর্ট, হ্যারি পটারকে হত্যা করার জন্যে কিলিং কার্স প্রয়োগ করলেও সে কার্স ব্যাকফায়ার করে ভোল্ডেমর্টের দিকেই ফিরে আসে। নিজের কিলিং কার্স নিজের দিকে ফিরে আসলেও ভোল্ডেমর্ট মারা যায় না। কেন জানেন?
কারণ, বহু আগেই সে তার আত্মাকে কয়েকটা ভাগে ভাগ করে ফেলেছিলো। হ্যারি পটারের দুনিয়ায় এগুলোকে বলে ‘হরক্রক্স’। হরক্রক্স বানাতে হলে প্রথমে কাউকে খুন করতে হয়। আইরনি হচ্ছে, ভোল্ডেমর্ট নিজের প্রথম হরক্রক্স বানিয়েছিলো নিজের বাবাকে হত্যা করে। নিজের আত্মার টুকরো টুকরো অংশগুলোকে সে বিভিন্ন জায়গায় রেখে দিয়েছিলো। কোথাও আংটিতে, কোথাও লকেটে, কোথাও ডাইরিতে। এই সবগুলো হরক্রক্স ধ্বংস না হলে ভোল্ডেমর্ট ধ্বংস হবে না। সহজ কথায়, সে মারা যাবে না।
ভোল্ডেমর্ট এ কাজ কেন করেছিলো? অমরত্বের জন্যে। সে মৃত্যুকে, ক্ষমতা হারানোকে খুব ভয় পেতো। হ্যারি পটারকে মারতে গিয়ে ব্যর্থ হলেও যেহেতু সে তার আত্মাকে হরক্রক্স বানিয়ে রেখেছিলো, চৌদ্দ বছর পর সে আবার ফেরত আসে তার অনুগত অনুসারীদের (ডেথ ইটারদের) সহযোগিতায় পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে। পুরো জাদুর দুনিয়ায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা শুরু করে— পিওর ব্লাড আর মাড ব্লাডের নামে। বাংলায় তর্জমা করলে— মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, বিপক্ষের শক্তির নামে।
ভোল্ডেমর্টের মতোই শেখ হাসিনা বাংলাদেশে বেশ কয়েকটা হরক্রক্স রেখে গেছে। তার বানানো পুলিশ, র্যাব, ডিজিএফআই, বিচার-ব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র— এগুলো সব একেকটা হরক্রক্স। এগুলো সব শেখ হাসিনার আত্মার একেকটা অংশ। এগুলোকে ধ্বংস করে নতুন করে তৈরি না করা হলে শেখ হাসিনা আবার ফিরে আসবে। আসবেই। তাকে ধ্বংস করা সম্ভব হবে না।
হ্যারি পটারের দুনিয়ায় হরক্রক্স ধ্বংসের আরেকটা উপায় অবশ্য আছে। সেটা হচ্ছে অনুশোচনা। ভোল্ডেমর্ট, হ্যারি পটারের বাবা-মাকে হত্যা করেছিলো। কাছের প্রায় সব মানুষকে মেরে ফেলেছিলো। তাও শেষ বইয়ের একেবারে শেষ যুদ্ধে (ব্যাটল অফ হগওয়ার্টসে) হ্যারি, ভোল্ডেমর্টকে পরামর্শ দিয়েছিলো অনুশোচনা করতে। নিজেকে রক্ষা করতে।
কিন্তু অনুশোচনা যে রাস্তা দিয়ে হাঁটে, জালেম সবসময় তার উল্টো দিকেই হাঁটে। তাই সর্বকালের অন্যতম ভয়ঙ্কর জাদুকর লর্ড ভোল্ডেমর্টের পতন হয়েছিলো মাত্র সতেরো বছরের এক কিশোর হ্যারি পটারের হাতে। অনেকটা শেখ হাসিনার মতোই। বাচ্চাদের লাত্থি খেয়ে এখন ভারতে যেয়ে পালিয়েছে।
ভোল্ডেমর্ট অনুশোচনা করে নি। শেখ হাসিনা কিংবা আওয়ামীলীগ অনুশোচনা করে রাজনীতিতে ফিরে আসবে— যারা শেখ হাসিনাকে চেনেন, তারা সম্ভবত কেউ এটা বিশ্বাস করেন না। যারা করেন তারা কল্পনার জগতে বাস করেন। তার কিছু নেতাকর্মী হয়তো অনুশোচনার ভান করতে পারে, কিন্তু জুলাইয়ে দেড় হাজার মানুষকে হত্যা করা নিয়ে তারা একটুও অনুতপ্ত নন।
আমি মাঠ পর্যায়ে বেশ কয়েকজন আওয়ামীলীগ নেতাদের সাথে কথা বলেছি। গুটিকয়েক ছাড়া কারো মাঝে বিন্দুমাত্র অনুতাপ দেখি নি। তারা এখনো মনে করে বাচ্চাদের ভুল বুঝিয়ে রাস্তায় নামানো হয়েছিলো। আমরা আগেই ভালো ছিলাম। তখন পিওর ব্লাডরা (মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিরা) দেশ চালাতো। এখন রাজাকাররা (হাফ-ব্লাড আর মাড ব্লাডরা) দেশটাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। ক'দিন পর হয়তো রিটা স্কিটাররা শেখ হাসিনার স্বর্ণযুগের কথা মনে করিয়ে দিতে পত্রিকায় বিশাল বিশাল কলাম ছাপা শুরু করবে।
তাই যারা হাসিনার রেখে যাওয়া হরক্রক্সগুলোকে বাঁচিয়ে রেখে, তার প্রশাসনে নামমাত্র সংস্কার করে এই স্বপ্ন দেখছেন যে, একদিন শেখ হাসিনা সত্যিই মাসুদের মতো ভালো হয়ে যেয়ে ক্ষমা চেয়ে সবকিছু ঠিক করে দেবেন কিংবা যারা বিশ্বাস করেন তার রেখে যাওয়া ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে শেখ হাসিনাকে সত্যিই ধ্বংস করা সম্ভব, তাদের জন্যে সমবেদনা ছাড়া দেয়ার মতো আমার আর কিছুই নেই।
এখনো সময় ফুরিয়ে যায় নি হরক্রক্সগুলো ধ্বংস করার। জুলাইয়ের সবচে' সুন্দর মেমোরিটা ব্যবহার করে সবচে' শক্তিশালী পেট্রোনাস সৃষ্টি করে দেশের আনাচে-কানাচে লুকিয়ে থাকা ডেমেন্টরদের ধ্বংস করার।
তা না হলে আমাদের সকল হ্যাপি মেমোরি ওরা কেড়ে নিবে।
তা না হলে একদিন ডেমেন্টররা আযকাবান (জেল) ভেঙ্গে শেখ হাসিনার অনুগত নেতাদের (ডেথ ইটারদের) ঠিকই মুক্ত করবে। বন্দী করবে আমাদের। তাই যতো দ্রুত সম্ভব ডেথ ইটারদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দিতে হবে।
তা না হলে দেখা যাবে দশ-পনেরো বছর পর ঠিকই শেখ হাসিনা কিংবা শেখ হাসিনার মতো কেউ আবার ফিরে এসেছে এই বাংলাদেশে।
রাতের বেলা সরল বিশ্বাসে ফুডপান্ডার ডেলিভারি নিতে গিয়ে দরজা খুলতেই আমরা শুনবো কেউ শীতল গলায় বলছে, ‘আভাদা কেদাভ্রা’।
লিখনী: শিহাব আহমেদ শাহিন