26/08/2026
হাসপাতালে গেলে বোঝা যায়, বেঁচে থাকা কতটা জরুরি, জীবন কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
বাইরে থেকে আমরা জীবনকে খুব সহজভাবে নিই। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠি, কাজে যাই, মানুষের সঙ্গে কথা বলি, অভিমান করি, রাগ করি, ভালোবাসি, কষ্ট পাই, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করি। কখনো টাকা নেই বলে মন খারাপ করি, কখনো কারও আচরণে ভেঙে পড়ি, কখনো নিজের না পাওয়া নিয়ে আফসোস করি। মনে হয়, জীবন বুঝি শুধু পাওয়া আর না পাওয়ার হিসাব। অথচ হাসপাতালের করিডোরে কয়েক ঘণ্টা দাঁড়ালেই জীবনের সব হিসাব বদলে যায়।
সেখানে গিয়ে বোঝা যায়, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ আসলে সুস্থ শরীর আর স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারা।
হাসপাতালের একটি বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটির কাছে হয়তো কোটি টাকা কোনো অর্থ বহন করে না। তার কাছে তখন সবচেয়ে বড় চাওয়া, আরেকটু ভালোভাবে শ্বাস নেওয়া। আরেকটু ব্যথামুক্ত থাকা। প্রিয় মানুষগুলোর মুখ আরেকবার দেখা। বাড়ির দরজাটা আরেকবার পার হওয়া। সন্তানের মাথায় হাত রাখা। মায়ের কণ্ঠটা আরেকবার শোনা। বাবাকে আরেকবার জড়িয়ে ধরা। প্রিয় মানুষটাকে আরেকবার বলা, 'ভালো থেকো।'
তখন বোঝা যায়, আমরা কত অপ্রয়োজনীয় জিনিসকে প্রয়োজনীয় ভেবে সারাজীবন ছুটে বেড়াই।
যে টাকা নিয়ে এত দুশ্চিন্তা, যে সম্পত্তি নিয়ে এত অহংকার, যে সম্পর্ক নিয়ে এত অভিমান, যে কথাটাকে আমরা নিজের সম্মানের প্রশ্ন বানিয়ে ফেলি, সেসবের কোনোটাই তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ থাকে না। তখন শুধু জীবনটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি নিঃশ্বাস, একটি হৃদস্পন্দন, একটি স্বাভাবিক সকাল, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে হাঁটতে পারা, নিজের হাতে খাবার তুলে খেতে পারা, নিজের মানুষগুলোর পাশে বসে থাকতে পারা, এগুলোই তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে হয়।
হাসপাতাল মানুষকে খুব নির্মমভাবে সত্য শেখায়।
শেখায়, সুস্থ থাকা কোনো সাধারণ বিষয় নয়। প্রতিদিন কোনো ব্যথা ছাড়াই ঘুম থেকে ওঠা, নিজের মতো করে হাঁটা, হাসা, কথা বলা, খাওয়া, কাজ করা, বাইরে বের হওয়া, আকাশ দেখা, বৃষ্টিতে ভেজা, সন্ধ্যার বাতাস অনুভব করা, প্রিয় কারও সঙ্গে গল্প করা, এসবই আসলে জীবনের বিশাল আশীর্বাদ।
আমরা সুস্থ থাকলে এসবের মূল্য বুঝি না। মনে হয়, এগুলো তো প্রতিদিনই হচ্ছে। অথচ একদিন শরীর একটু অসুস্থ হলেই বুঝতে পারি, স্বাভাবিক একটি দিন কত বড় পাওয়া।
হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা স্বজনদের চোখেও জীবনের মূল্য দেখা যায়। কেউ দুশ্চিন্তায় এদিক-ওদিক হাঁটছে, কেউ নীরবে দোয়া করছে, কেউ ফোনে খবর দিচ্ছে, কেউ চোখের পানি লুকিয়ে শক্ত থাকার চেষ্টা করছে। কারও কাছে প্রিয় মানুষটির জীবনই তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিষয়। টাকা-পয়সা, মান-অভিমান, ঝগড়া, পুরোনো অভিযোগ, কে কাকে কী বলেছে, কে কাকে কষ্ট দিয়েছে, এসবের কোনো মূল্য থাকে না।
শুধু মনে হয়, মানুষটা যেন বেঁচে থাকে।
শুধু এই একটি চাওয়াই তখন সব চাওয়ার ওপরে উঠে যায়।
হাসপাতালে গেলে আরও বোঝা যায়, জীবন কতটা অনিশ্চিত। সকালে যে মানুষটি স্বাভাবিকভাবে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল, বিকেলে তাকে হয়তো হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকতে হচ্ছে। যে মানুষটি গতকাল পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করছিল, আজ তার পরিবার শুধু তার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছে।
তাই জীবনের ওপর এত অহংকার করার কিছু নেই।
আমরা কেউ জানি না, আমাদের হাতে আসলে কতটা সময় আছে। আমরা ধরে নিই, আগামীকালও থাকবে। পরে কথা বলব, পরে দেখা করব, পরে ক্ষমা চাইব, পরে ভালোবাসা প্রকাশ করব, পরে বাবা-মায়ের পাশে বসব, পরে নিজের যত্ন নেব। অথচ সেই পরে সবসময় আসে না।
কখনো কখনো জীবন হঠাৎ থেমে যায়।
তাই যতদিন বেঁচে আছি, জীবনটাকে অবহেলা করা উচিত নয়। নিজের শরীরের যত্ন নেওয়া উচিত। নিজের মানুষগুলোর যত্ন নেওয়া উচিত। ভালোবাসার মানুষকে ভালোবাসি বলতে ভয় পাওয়া উচিত নয়। কারও ওপর রাগ থাকলে সম্ভব হলে মিটিয়ে নেওয়া উচিত। যাকে কষ্ট দিয়েছি, সুযোগ থাকলে ক্ষমা চাওয়া উচিত। যাকে ভালোবাসি, তাকে সময় দেওয়া উচিত।
কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষ বুঝতে পারে, জীবনে সবচেয়ে বেশি আফসোস হয় না যে কত টাকা আয় করতে পারিনি, কত বড় বাড়ি বানাতে পারিনি, কত সম্পদ রেখে যেতে পারিনি। অনেক সময় সবচেয়ে বড় আফসোস হয়, যাদের ভালোবাসতাম তাদের যথেষ্ট সময় দিতে পারিনি। যাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া দরকার ছিল, তাদের কাছে অহংকার করে নীরব থেকেছি। যে মুহূর্তগুলো উপভোগ করার কথা ছিল, সেগুলো ভবিষ্যতের চিন্তায় নষ্ট করেছি।
হাসপাতাল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবন খুব ছোট।
আজ যে মানুষটি আমাদের পাশে আছে, কাল সে থাকবে কি না আমরা জানি না। আজ যে শরীর আমাদের এত কিছু করার সুযোগ দিচ্ছে, কাল সেই শরীর আমাদের সহযোগিতা করবে কি না আমরা জানি না।
তাই জীবনকে ছোট করে দেখো না।
সবকিছু তোমার মনের মতো হবে না। সব মানুষ তোমাকে বুঝবে না। সব সম্পর্ক টিকে থাকবে না। সব স্বপ্ন পূরণ হবে না। জীবনে কষ্ট থাকবে, ব্যর্থতা থাকবে, বিচ্ছেদ থাকবে, অপূর্ণতা থাকবে। তবুও বেঁচে থাকার মধ্যে এক ধরনের অসীম সৌন্দর্য আছে।
কারণ বেঁচে থাকলে আবার শুরু করা যায়। হারিয়ে গেলে আবার খুঁজে পাওয়া যায়। ভেঙে গেলে আবার গড়ে ওঠা যায়। ব্যর্থ হলে আবার চেষ্টা করা যায়। কেউ ছেড়ে গেলে নিজের জন্য নতুন করে বাঁচা যায়। কোনো স্বপ্ন ভেঙে গেলে নতুন স্বপ্ন দেখা যায়। কিন্তু জীবনটাই যদি না থাকে, তাহলে আর কোনো সম্ভাবনাই থাকে না।
হাসপাতালের দেয়াল তাই শুধু অসুস্থতার গল্প বলে না। হাসপাতাল জীবনের মূল্য শেখায়। শেখায়, বেঁচে থাকাটাই প্রথম সাফল্য। সুস্থভাবে ঘুম থেকে ওঠাটাই বড় পাওয়া। প্রিয় মানুষদের পাশে পাওয়াটাই বড় সম্পদ। আর একটি নতুন সকাল পাওয়া মানেই সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে পাওয়া আরেকটি সুযোগ।
তাই জীবন যত কঠিনই হোক, বেঁচে থাকার জন্য কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত।
সবকিছু না পাওয়ার দুঃখের মাঝেও ভাবা উচিত, অন্তত আমি বেঁচে আছি। এখনও আমার চোখে আলো আছে, এখনও আমি প্রিয় মানুষদের দেখতে পারি, এখনও আমি কথা বলতে পারি, এখনও আমি হাঁটতে পারি, এখনও আমার হাতে কিছু করার সুযোগ আছে।
হয়তো জীবন নিখুঁত নয়। হয়তো অনেক কিছুই আমাদের মনের মতো হয়নি। হয়তো অনেক মানুষ আমাদের ছেড়ে গেছে। হয়তো অনেক স্বপ্ন মাঝপথে ভেঙে গেছে। তবুও জীবনকে ভালোবাসতে হয়।
কারণ হাসপাতালের কোনো এক নীরব রাতে, কোনো এক বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটি হয়তো পৃথিবীর সবকিছুর বিনিময়ে শুধু আরেকটি স্বাভাবিক সকাল চায়।
আর আমরা সেই স্বাভাবিক সকাল প্রতিদিন বিনা মূল্যে পেয়ে যাই।
তাই সকালে ঘুম ভাঙলে একটু কৃতজ্ঞ হও। প্রিয় মানুষটির মুখ দেখলে একটু বেশি ভালোবাসো। মা-বাবা পাশে থাকলে একটু বেশি সময় দাও। নিজের শরীরটাকে অবহেলা কোরো না। অকারণে সম্পর্ক নষ্ট কোরো না।
অহংকার করে ভালোবাসা আটকে রেখো না। কারণ জীবন খুব অল্প সময়ের। হাসপাতালে গেলে সত্যিই বোঝা যায়, পৃথিবীতে সবচেয়ে দামি জিনিস টাকা নয়, সম্পদ নয়, ক্ষমতা নয়, খ্যাতি নয়।
সবচেয়ে দামি জিনিস হলো একটি সুস্থ শরীর, একটি সচল হৃদয়, একটি স্বাভাবিক শ্বাস এবং আরেকটি সকাল দেখার সুযোগ।
অর্থাৎ, বেঁচে থাকা।
জীবন যতদিন আছে, ততদিন জীবনকে ভালোবাসো। কারণ একদিন যখন জীবন সত্যিই ফুরিয়ে যাবে, তখন পৃথিবীর কোনো সম্পদ, কোনো অহংকার, কোনো অভিমান, কোনো অপূর্ণ স্বপ্নই আর তোমাকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না।
আজ তুমি বেঁচে আছো। এই মুহূর্তটুকুই তোমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।
~ আরিফ খন্দকার Rj Arif Khandaker
#আরিফ_খন্দকারের_লেখা