26/09/2026
২০১৪ সালের শেষের দিক।আর্থিক দৈন্যতার কারনে মেস ছেড়ে দিয়ে তৎকালীন তাজউদ্দীন হলের ডাইনিংয়ের গণরুমে উঠলাম। ২০-৩০ জন গাদাগাদি করে ছিলাম।
সেখানে পড়াশোনার কোন পরিবেশ নাই। শুধু রাতে থাকা যায়। তারপরও ঘুমটা ক্লিয়ার হয়না।
আগে যেখানে মেসে রাত দশটায় ঘুমিয়ে ভোর চারটা পাঁচটায় উঠতাম, গণরুমে উঠে ঘুমের প্যাটার্ন পরিবর্তন হয়ে গেল। রাত দুই তিনটায় ঘুমিয়ে সকাল আটটা নয়টায় উঠে ক্লাসে যেতাম।
ক্লাস-গণরুম-বাশেরহাট। এই তিনটা প্লেসেই সময় কাটানো শুরু হলো। কিন্তু টেবিলে আর সময় দেওয়া হয়না।
ফলস্বরূপ ১ম সেমিস্টারে থার্ড প্লেস করা আমি ২য় সেমিস্টারে এসে প্রথম ৭/৮ জনের মধ্যে নেই।
হতাশা জেঁকে বসলো।
তখন এত সুন্দর লাইব্রেরী ছিল না। লাইব্রেরিতে পড়তেও মানুষ কম যেত। ফাইনাল পরীক্ষার আগের রাতে বড় ভাইদের রুমে গিয়ে টেবিল ফাঁকা থাকলে বসে পড়তাম। কিন্তু এভাবে খুব বেশিক্ষণ পড়া সম্ভব ছিলনা।
অতঃপর যা হবার তাই হলো। পরবর্তীতে সকল সেমিস্টারেই জিপিএ কনসিসটেন্টলি পুওর হতে লাগলো। জীবনে গভীর হতাশা প্রবেশ করলো।
ভোরে ঘুম থেকে জেগে উঠার বদলে আমি ভোরে ঘুমাতে যেতে শুরু করলাম।
বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে ভেবেছিলাম, আমার এমন কিছু বন্ধু থাকবে যাদের সাথে আমি সবকিছু শেয়ার করবো। আমার খারাপ লাগা, ভালো লাগার সময়ে পাশে থাকবে। আমার দুঃখ কষ্টে সে ব্যথিত হবে। আমার দুর্বল পয়েন্ট জেনেও আঘাত করবেনা। কিন্তু এমন বন্ধুটা পাওয়া হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
হয়তবা আমার দুর্ভাগ্য এটা। কতজনের জীবন বিলিয়ে দেওয়া বন্ধুত্বের গল্প শুনি। কিন্তু আমার জীবনে সেটা আর বাস্তবে দেখা দেয়নি।
বন্ধু বান্ধব জুনিয়রদের অনেকেই দেখি গার্লফ্রেন্ড নিয়ে বেশ ঘোরাঘুরি করে, আড্ডা দেয়। সেসময় এমন একটা ট্রেন্ড ছিলো সিঙ্গেল থাকাটা যেন অনেকটা ব্যর্থতার মত। এসব দেখে হৃদয়ে এক ধরনের অপূর্ণতা কাজ করতো।
মনে হলো আমারও তো এমন একজন মানুষ থাকতে পারতো যার সাথে জীবনের সুখ দুঃখের গল্প গুলো ভাগাভাগি করে নিতাম।
কিন্তু পরক্ষণেই মনে হতো, আমি এসবের অযোগ্য। যে মানুষটা ৫ টাকা বাঁচানোর জন্য জিয়া হল থেকে বাঁশের হাট পর্যন্ত হেটে যায় সেই মানুষটার মেয়ে বন্ধু থাকাটা এক ধরনের বিলাসিতা।
পকেটের স্বাস্থ্য ভালো করতে টিউশনির জন্য বেশ কয়েকজন বড় ভাই বন্ধুকে বললাম। সবাই বলেছিলো, পাইলে তোমাকে জানাবো। কিন্তু কেউ আর জানায় নি। যার দুইটা টিউশনি করলেই হয়ে যেত। সে আরো দুইটা এক্সট্রা করায় এবং সেই টাকা দিয়ে গার্লফ্রেন্ড মেইনটেইন করে। যার দরকার সে টিউশন পায় না, যার দরকার নেই তার টিউশনের অভাব নেই।
লেভেল-২,৩ ক্লোজড। ডাইনিংয়ের গণরুমের সব বন্ধু বান্ধবই প্রায় সিট পেয়ে গেছে। রাজনীতি করে কিংবা টাকা দিয়ে। আমার রাজনীতিও নাই টাকাও নাই। তাই সিট পাইনি আমি।
কোন এক সাপ্তাহিক ছুটিতে বাসায় গিয়েছিলাম। এসে দেখি ডাইনিং(গণরুম) থেকে আমার বেড, তোষক বাহিরে বের করে রেখেছে। সেখানে নতুন জুনিয়র উঠায়েছে।রাতে আমার ঘুমানোর জায়গা নাই। শেষমেশ মশার কামড় খেয়ে রাত তিনটার দিকে টিভি রুমের ছোট ছোট চেয়ার গুলোতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। পরে ফজরের আজান দিলে কোন এক ছোট ভাইয়ের বেডে গিয়ে ঘুমিয়েছিলাম। সেদিন রাতে নিজেকে পৃথিবীর সেরা অসহায় মানুষ মনে হয়েছিলো।
পরবর্তীতে হলে ডিভিএমের এক বড় ভাইয়ের সিট পাই। অন্যদিকে জিয়া হলের চার তলায় নতুন রুমে সিটের জন্য আবেদন করি। সেখানেও সিট পেয়ে যাই। এরপর তাজউদ্দীন (তৎকালীন) হলের সিটটা এক ছোট ভাইকে দিয়ে জিয়া হলে শিফট হই।
ভালো একটা থাকার জায়গা পেলাম, পড়ার টেবিল পেলাম, কিন্তু লেভেল ওয়ান এর মত মূল ট্রাকে আর ফিরতে পারলাম না। হতাশাও আর কাটলো না।
সময়ের পরিক্রমায় গ্রাজুয়েশন শেষ করলাম। অতঃপর প্রকল্পের চাকরীতে জয়েন করে ক্যাম্পাস ত্যাগ করলাম।
একটা সময়, 'I Quit' করতে চাওয়া আমি পরবর্তীতে প্রাইমারী, বিসিএস ও ব্যাংকের সিনিয়র অফিসারের চাকরী ক্রাক করেছি আলহামদুলিল্লাহ।
এখন মাঝে মধ্যে মনে হয়, যদি আমার সে সময় একজন মেন্টর থাকতো,একজন ভালো বন্ধু থাকতো, একটা ভালো থাকার জায়গা থাকতো, একটা বা দুটো টিউশন থাকতো তাহলে হয়তে আমার রেজাল্টটা ভালো হতো। হতাশা গুলো কমে যেত। জীবনের ট্রাক লাইন থেকে ছিটকে যাওয়াটা প্রতিরোধ করা যেত। জীবনটা আরো স্মুথ হতো। আরো আগেই ভালো জব পেতাম।
এই গল্পটা শুধু আমার একার না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ৭০ ভাগ শিক্ষার্থীদের গল্প। এতসব দুঃখ কষ্টের মাঝে অনেকেই টিকে থাকে আবার কেউ কেউ আত্ম*ত্যা করে হারিয়ে যায়।
কারো অর্থকষ্ট, কারো সম্পর্কের জটিলতা, কারো থাকা খাওয়ার কষ্ট, কারো শত চেষ্টা করেও ভালো ফলাফল না করার কষ্ট। এসব কষ্টের মধ্য দিয়েই জীবন চালিয়ে যেতে হয়।
সত্যি বলতে জীবন কখনো সরলরৈখিকভাবে চলেনা। এটা কখনো মসৃণ কখনো অমসৃণ। কখনো উত্থান কখনো পতন। কখনো আলো কখনো অন্ধকার। এসব নিয়েই জীবন। এক জীবনে শুধু সুখ থাকবে, তা সম্ভব নয়। আবার সারাজীবন দুঃখ থাকবে সেটাও সম্ভব নয়।
তাই বর্তমানে যারা চরম কষ্টে আছেন, হতাশায় জর্জরিত হয়ে আছেন। বার বার মনে হচ্ছে, ' I Quit' । তারা কষ্ট করে জাস্ট বেঁচে থাকুন। আপনার জীবনের পতনের সময়টাতে জাস্ট টিকে থাকুন ভবিষ্যতে উত্থান দেখার জন্য হলেও।
Life is not a one day innings, It’s a big test match. Just play carefully, one day you will surely win Insha Allah.
জাস্ট বেঁচে থাকুন জীবনের সুন্দর সময়ের অপেক্ষায় ।
সবার জন্য নিরন্তর শুভকামনা রইলো❤️
~মো:মাসুদ রানা
লাইভস্টক ক্যাডার,৪৬তম বিসিএস
হাবিপ্রবি