18/10/2025
#অচেনা_চেনা_মুখ
#অষ্টমাংশ
Aklima Nipu
*
*
*
বাইরের ঝড়-বৃষ্টি থেমে গেলেও, আমার মনের ভেতরটা যেন এখনো অন্ধকারে ঢেকে আছে।
রাতটা প্রায় জেগে কাটালাম।
মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে শুধু দু’টো নাম — আদিয়ান আর তামিম।
---
সকালে অফিসে পৌঁছাতেই দেখি, গেইটের সামনে তামিম দাঁড়িয়ে।
চোখে ক্লান্তি, মুখে অপরাধবোধ।
আমি না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলাম, কিন্তু সে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“প্লিজ, ইরা… আজ আমার কিছু কথা তোমাকে শুনতেই হবে। তারপর বাকি সিদ্ধান্ত তোমার।”
তার এমন আচরণে ভেবেচেকা খেয়ে গেলাম।
অবশেষে অফিসের পাশের কফিশপে গিয়ে বসলাম দু’জনে।
তামিম প্রথমেই বলল —
“ইরা, আমি জানি আমি অনেক বড় ভুল করেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমার জন্য আমার অনুভূতিটা কখনো মিথ্যা ছিল না। আমি জানি না, আমি তোমাকে হারিয়েছি, না নিজেকেই।”
সে নিঃশ্বাস ফেলে চালিয়ে গেল,
“আদিয়ান ভাই সব জানত। সে-ই ছিল আমার সবচেয়ে বড় ভয়, আবার ভরসাও। আমি নিজে তাকে জানিয়েছিলাম তোমার আর আমার ব্যাপারে। ও শুধু বলেছিল তোমার খেয়াল রাখতে — কিন্তু ভালোবাসে এমন কিছু বলেনি।”
আমি চুপ করে শুনছিলাম। তামিম থেমে গিয়ে বলল,
“আর চৈতী... তুমি জানো, ও আমার শুধু বান্ধবী — আসলে ও আমার কাজিন ও। আদিয়ান ভাইয়ের ছোট বোন।”
আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।
আর ভাবতে থাকলাম আরো কি কি সত্য আমার জানা বাকি !
চোখে ঝাপসা পানি এসে গেল। আমি প্রায় দৌড়ে কফিশপ থেকে বেরিয়ে এলাম।
আর ঠিক তখনই বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল আদিয়ান।
তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই — যেন সে জানত আমি এখানে আসব।
আমি কাঁপা গলায় বললাম,
“সব মিথ্যে ছিল?”
সে ধীরে বলল,
“না, সত্যি ছিল। কিন্তু তুমি সত্যিটা অন্য জায়গায় খুঁজেছিলে।”
আমি স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম।
“তুমি ভেবেছিলে আমি হঠাৎ করে তোমার জীবনে এসেছি, কিন্তু আসলে আমি কখনোই যাইনি, ইরা। তোমার প্রতিটা পদক্ষেপ, প্রতিটা কান্না — আমি দেখেছি।”
আমার গলা শুকিয়ে এলো,
“তাহলে তামিম? সে বলেছিল আপনি আমাদের সব জানতেন…”
আদিয়ান মুখ ফিরিয়ে বলল,
“ও জানত না। কিন্তু আমি জানতাম — একদিন ওর নিজেরই তোমাকে হারাতে হবে।”
আমি চিৎকার করে উঠলাম,
“সব জানতেন, তবুও কিছু বলেননি! আমি কষ্টে ভেঙে পড়ছিলাম, আর আপনি চুপ ছিলেন!”
আদিয়ান চোখ বন্ধ করে নরম গলায় বলল,
“আমি যদি তখন আসতাম, তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে না, ইরা। তুমি ভাবতে আমি তোমার দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছি।”
চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।
“তাহলে এখন কেন এলেন?”
সে এক পা এগিয়ে এসে খুব ধীরে বলল,
“কারণ তামিম এখন তোমার কাছে আসছে, কিন্তু তার উদ্দেশ্য আর আগের মতো নেই।”
“মানে?”
“ও তোমার ওপর নজর রাখছে,” আদিয়ান বলল নিচু স্বরে।
“ওর ফোনে হ্যাকিং সফটওয়্যার ছিল। তোমার সব মেইল, মেসেজ—সব ও দেখতে পেত।”
আমার মাথা ঘুরে উঠল।
“মানে অফিসের মেইল, সেই ফটো, সেই অচেনা আইডি—সবই তামিমের কাজ?”
আদিয়ান নিঃশব্দে বলল,
“হ্যাঁ… কিন্তু এখন ও নিজের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণই হারিয়েছে। মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙে পড়েছে।”
ঠিক তখনই পেছন থেকে শোনা গেল কর্কশ কণ্ঠ —
“তুমি ভাবলে, আমায় বাদ দিয়ে তোমরা আবার শুরু করতে পারবে?”
আমরা ঘুরে তাকালাম — তামিম!
চোখ লাল, মুখে বিকৃত হাসি, হাতে ফোন।
“তুমি জানো, ইরা,” সে বলল,
“তোমার জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত আমি রেকর্ড করে রেখেছি। তুমি যতবার আমার নাম নিয়েছ, আমি শুনেছি।”
আদিয়ান এগিয়ে এলো, কিছুটা রেগে—
“তামিম, থামো।”
“না!” তামিম চিৎকার করে উঠল।
“তুমি সবসময় আমার কাছ থেকে সব কেড়ে নাও, আদিয়ান ভাই — পরিবার, সুযোগ, আর এখন ইরা!”
পরিস্থিতি কিছুটা ভয়ানক হয়ে উঠল।
আমি এক ধাপ পিছিয়ে গেলাম।
বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
আদিয়ান বলল,
“ইরা, এখান থেকে চলে যাও।”
আমি মাথা নাড়লাম,
“না, আমি যাব না। আমি সত্যিটা নিজের চোখে দেখতে চাই।”
তামিমের চোখে জল চলে এলো।
“তুমি জানো, ইরা… আমি সত্যিই তোমায় ভালোবাসতাম। কিন্তু হয়তো আমার ভালোবাসা ভুল ছিল। আর আদিয়ান ভাই আমার সাথে কি খেলা খেলল আমি নিজেই বুঝতে পারিনি।"
সে পকেট থেকে একটা পেনড্রাইভ বের করে মেঝেতে ছুঁড়ে মারল।
“এখানে সব রেকর্ড আছে — মেইল, মেসেজ, ভিডিও… সবকিছু।
তুমি জানতে চেয়েছিলে সত্যি — এই নাও, এটাই সত্যি।”
বৃষ্টি থেমে গেল।
তামিম ধীরে সামনের দিকে হাঁটল।
ঘাড় না ঘুরিয়েই বলল,
“কিছু গল্পের শেষ আমরা নিজেরাই লিখে দিই… আর আমি লিখে ফেলেছি।”
ইরা কাঁপা হাতে পেনড্রাইভটা তুলে নিল।
ভেতরে কী আছে — জানা নেই।
কিন্তু মনে হলো, আজ কিছু একটা সত্যিই শেষ হলো…
অথচ এক নতুন শুরুর দরজা খুলে গেল।
---
রাত ১২টা।
ইরা ল্যাপটপ খুলে পেনড্রাইভটা ইনর্সাট করল।
একটা ভিডিও ফাইল ওপেন হলো।
স্ক্রিনে তামিম — চোখে অনুতাপের ছাপ।
> “ইরা, যদি তুমি এটা দেখো, জেনে রেখো — সবকিছুই ছিল আমার অপরাধবোধ।
আমি শুধু চেয়েছিলাম তুমি আমাকে মনে রাখো, যেমন আমি তোমায় রেখেছি।
আদিয়ান ভাই… আপনি ছিলেন আমার ঈর্ষা, আবার অনুপ্রেরণাও।
আর চৈতী… তুমি কেন আমার সাথে এই খেলা খেললে?
নাকি সবকিছুই তোমার ভাইয়ের প্ল্যান ছিল?”
ভিডিওটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।
ইরা বোকার মতো বসে রইল…
চোখের সামনে শুধু কালো পর্দা —
আর মনে হাজারো প্রশ্ন।
---
চলবে.....