03/04/2026
ভালো করে দেখুন। মন দিয়ে দেখুন। কী মনে হচ্ছে এই লোককে দেখে! আচ্ছা থাকুক এই চিন্তা। তার আগে ভিন্ন কিছু জেনে নেই তার বিষয়ে। দুপুরে খেতে বসেছেন তিনি আমার অপোজিটে।
ভাত খাচ্ছেন শুধু পিয়াজ মরিচ ডলে। মুখে বিরক্তি। পাশে মুরগির মাংশ। কিন্তু নিচ্ছেন না সব। এক পিস নিয়ে ভাত মাখিয়েছেন। তার খারাপ লেগেছে হোটেলের কর্মচারীদের ব্যবহারে। না খেয়েই পারলে উঠে যাবেন তিনি। কারণ কেউ তার কথা সেভাবে শুনছে না। ভাত দিয়ে যায় তো তরকারি দিতে লেট করে। তরকারি দেয় তো পানি আসে না।
বললাম, থাক বাদ দিন।
বললেন, আপনিই দেখেন আমি কতবার চাইলাম। কেউ পাত্তা দিচ্ছে?
লোকটার কথা কিছুটা তোতলানো। শরীরে ক্লান্তি। এসেছেন ভোলা থেকে। ঢাকায় আসছেন ঘুরতে।
বললাম, একাই আসছেন? বললেন, স্ত্রী ছেলেকে নিয়ে আসব। কিন্তু তারা আসেনি।
দেখি আমিও চলে যাব। তাদের ছাড়া ঘুরতে ভালো লাগছে না।
কেন এলেন তাহলে। বললেন ঢাকার কথা খুব মনে হইছিল তাই আসছি। মনে হইছিল মানে?
তার কথার শব্দ বাড়ছে।
নাম বেলাল। দীর্ঘ বছর ঢাকায় থেকেছেন। ফার্মগেটে এক হোটেল কর্মচারী ছিলেন।টেবিল মুছেছেন। মেঝে মুছেছেন। পানি টানতেন।
বললেন, এমনও দিন গেছে ভাই টানা তিনদিন না ঘুমায় থাকছি। পরদিন ঘুমাইতে গিয়ে দেখি আমার জায়গায় আরেকজন ঘুমায়। কত গরম। কানছি মাঝে মধ্যে। এমন করে কত বছর যে কাজ করছি।
কষ্ট না করলে মিষ্টি মেলে না। মাসে মাসে যে বেতন পাইতাম পুরোটাই বাড়ি পাঠাইতাম। আব্বু আম্মু অনেক বলছে চলে যাইতে। যাইনি।
খেয়াল করলাম যুবকটার কথায় আঞ্চলিকতা থাকলেও পিতা মাতাকে সে দারুণভাবে আব্বু আম্মু বলছে।
লোকটা খেতে খেতে বললেন, আব্বু আম্মু আমার টাকাগুলো নষ্ট করে নাই। সব জমায় রাখছে।
আমার দাদা দাদিরাও খুব কষ্টে দিন পার করছে।
চোখ মুছে ফের বললেন, আমরা দুই ভাই খাওয়ার অভাবে নানীর বাড়িতেও গিয়ে থাকছি।
আব্বু আম্মু নিজের টাকা আর আমার টাকা দিয়ে ভালো কাজ করছে। আমাদের ছোট্ট একটা পুকুর আছে এখন। চাষ করার জমিও আছে।
এরপর ঢাকার কষ্টের কাম ছাড়ছি। একবারে বাড়ি গেছি। ঘরে শান্তিতে ঘুমাই।
খেয়াল করলাম, লোকটার শরীরের ক্লান্তি দূর হয়েছে কিছুটা। মুখে হাসি ফুটেছে।
বললেন, আমার এক ছেলে হইছে। খুব ইচ্ছা আছে তারে হাফেজ বানানো।
যদিও বেলাল নামের এই লোকটার অনেক কথা বুঝতে আমার অসুবিধা হচ্ছে তোতলানোর কারণে। এদিকে হোটেলের কর্মচারীরা তাকে ইগনোর করছে তার কথার কারণে অথবা পোশাক দেখে। ব্যাপারটা তিনিও বুঝেছেন। বললেন, এরাতো আমারে দেখে ভাবছে খাবারের বিল মনে হয় দিতে পারবো না। এজন্য ডাকলেও আসতে চায় না৷
থাক না ভাই বাদ দিন। খেয়ে নিন। তারপর বলুন আপনার জীবন কেমন চলছে। যে লোক এতক্ষণ তোতলানো কথা বলছিলেন তিনি কিনা খুব স্পষ্ট আর জোরে এবার বলে উঠলেন- আলহামদুলিল্লাহ। মনের মতোন।
তা এখন কী কাজ করেন বেলাল ভাই। বললেন, এইবার চার লাখ টাকার তরমুজ বেচছি। তরমুজের আবাদ করছিলাম।
ধার দেনা সব শোধ করছি। আমার আর কোনো কষ্ট নাই। এখন একটা ব্যবসা শুরু করবো।
কিছুদিন একটু রেস্ট নিচ্ছি। ঢাকায় আসছিলাম যেই সব জায়গায় কাম করছি একটু দেখতে। মনে পড়লোতো তাই চলে আসলাম৷
বেলাল সাহেব তার অতীত দেখতে এসেছেন। ভুলে যাননি। আমরা বড় পর্যায়ে গেলে অনেকেই সব ভুলে যাই। কিন্তু বেলাল তা করেননি। স্মৃতি হাতরাতেই আসা।
খাওয়া শেষ হলো। বেলাল সাহেব হোটেলের পিচ্চি কর্মচারীকে ডেকে কিছু বখশিস দিয়ে বললেন, শুনো কাস্টমার মেহমানের মতো। কাউরে অবহেলা কইরো না। মন দিয়া কাম করো। টাকা পয়সা নিজে খাইয়ো না সব একাই। বাবা মারেও দিও বেতন থাইকা। কিছু সঞ্চয়ও কইরো। তোমার অভাব থাকবো না। দোয়া আছে না!
কি মূল্যবান কথা!
খেয়ে উঠে এলাম। বেলাল সাহেব তার পরিবারের সাথে ফোনে কথা বলছেন।
তোমাগো জন্য কী আনবো? আরে কও কও।
আম্মুরে বইলো আমি খাইছি দুপুরে। সমস্যা নাই। সবার সাথে দেখা করেই চলে আসতেছি। ..
বন্ধুরা, ভালো করে দেখুন লোকটাকে। জীবনকে কীভাবে বদলাতে হয়। সুখে থাকতে চাইলে কষ্ট করুন। কষ্টটা আসলে কষ্ট না। সুখের ঘরে প্রবেশের রাস্তা। তো এই রাস্তা কি পাড়ি দেবেন না?
সংগ্রহিত # আলী ইমরান