01/06/2026
আয়করের হার ২০২৬-২৭: মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকটের মাঝে কর বোঝা — কতটুকু সহনীয়?
করবর্ষ ২০২৬-২৭ | আয়বর্ষ ২০২৫-২৬ | বিস্তারিত তুলনামূলক পর্যালোচনা | SME Mindset
সরকার প্রতি বছর আয়করের হার ঘোষণা করে। কিন্তু এই ঘোষণার পাশাপাশি একটি "অদৃশ্য করে"র গল্প থেকে যায়, যার নাম মুদ্রাস্ফীতি। বাংলাদেশে বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির হার ৯% এর উপরে। অর্থাৎ, কেউ যদি গত বছর যা আয় করতেন, এ বছরও ঠিক তাই আয় করেন — তাহলে তাঁর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ৯%+ কমে গেছে। এটাই হলো "লুকানো কর" (Hidden Tax)।
"একই আয়ে অবস্থান করা মানে প্রতি বছর ৯%+ আয় কমা — কিন্তু সরকার তাতে করের ছাড় দেয় না।"
এই প্রতিবেদনে করবর্ষ ২০২৬-২৭ এর নতুন কর কাঠামো, আগের বছরের সাথে তুলনা এবং সাধারণ মানুষের উপর এর প্রকৃত প্রভাব কী হতে পারে তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে ।
সাধারণ করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে, যা প্রায় ৭.১৪ শতাংশ বৃদ্ধি। একইভাবে নারী করদাতা ও ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য করমুক্ত সীমা ৪ লাখ টাকা থেকে ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তৃতীয় লিঙ্গের করদাতাদের জন্য এই সীমা ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৫ লাখ টাকা হয়েছে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই যোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা থেকে ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তন হলো ৫ শতাংশ কর স্তরের বিলুপ্তি। পূর্বে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের করদাতারা এই স্তরের সুবিধা ভোগ করতেন। নতুন কাঠামোয় এই স্তর তুলে দেওয়ায় অনেক মধ্যবিত্ত করদাতার করের বোঝা বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে করমুক্ত সীমা বাড়লেও বাস্তবে কর প্রদানের পরিমাণ কিছু ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে সর্বোচ্চ কর হার ৩০ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ উচ্চ আয়ের করদাতাদের জন্য করের সর্বোচ্চ হার আগের মতোই বহাল থাকবে।
ন্যূনতম করের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। পূর্বে বিভিন্ন অঞ্চলের ভিত্তি ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত ন্যূনতম কর প্রযোজ্য ছিল। নতুন প্রস্তাবে এটি একীভূত করে ৫,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অনেক করদাতার জন্য করের পরিমাণ বৃদ্ধি করবে। তবে ইতিবাচক দিক হলো নতুন করদাতাদের উৎসাহিত করতে ১,০০০ টাকার একটি বিশেষ ন্যূনতম কর সুবিধা চালু করা হয়েছে, যা প্রথমবারের করদাতাদের জন্য স্বস্তির বার্তা বহন করে।
সার্বিকভাবে নতুন আয়কর কাঠামোতে ৫ শতাংশ কর স্তর বিলুপ্তি এবং ন্যূনতম কর বৃদ্ধির কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত করদাতাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিতে পারে। ফলে এই পরিবর্তনের প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে করদাতার আয়, করযোগ্য আয়ের পরিমাণ এবং কর পরিকল্পনার ওপর। সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে কর আদায়ের পরিধি বৃদ্ধি করা এবং একই সঙ্গে করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করা।
উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ "Bracket Creep" বা "করের স্তরে দীর্ঘমেয়াদে আটকা পড়ে আছে ।" যখন মজুরি মুদ্রাস্ফীতির সাথে বাড়ে, কিন্তু কর-স্তর সমন্বয় হয় না, তখন মানুষ উচ্চতর কর স্তরে ঢুকে পড়ে — প্রকৃত আয় না বাড়লেও।
বিশ্বের বহু দেশ যেমন অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি প্রতি বছর কর-স্তর মুদ্রাস্ফীতির সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় করে। বাংলাদেশ সেই পথে হাঁটছে না।
• নিম্নমধ্যবিত্ত চাকরিজীবীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত — যাদের মাসিক বেতন ৪৫,০০০ থেকে ৭০,০০০ টাকা।
• ফ্রিল্যান্সার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং নতুন উদ্যোক্তারাও এই পরিবর্তনে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত।
• উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের (১০ লক্ষ+ আয়) উপর এই পরিবর্তনের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা: কর নীতির বাইরের যে সংকট
শুধু কর কাঠামো বিশ্লেষণ করলেই হবে না — কর নির্ধারণের সময় বিবেচনা করতে হবে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। বর্তমান বাংলাদেশের চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক:
উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি (৯%+): নিত্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া। মধ্যবিত্তের রান্নাঘর থেকে শুরু করে শিক্ষা খরচ — সবকিছুতেই চাপ।
কর্মসংস্থান সংকট: শিল্প-কারখানা বন্ধ, নতুন বিনিয়োগ স্থবির। হাজার হাজার তরুণ বেকারত্বের মুখোমুখি।
ব্যবসায়িক লোকসান: ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা (SME) টিকে থাকার সংগ্রামে আছেন। রপ্তানি কমছে, অর্ডার নেই।
পোশাক শিল্পে সংকট: কারখানা বন্ধের খবর নিয়মিত। শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
পুঁজিবাজার বিপর্যয়: শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীরা সম্পদ হারাচ্ছেন। আস্থার সংকট তীব্র।
ব্যাংকিং সংকট: খেলাপি ঋণের বোঝা, তারল্য সংকট এবং আমানতকারীদের উদ্বেগ চরমে।
রপ্তানি হ্রাস: বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়া এবং প্রতিযোগিতা বাড়ায় রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
উচ্চ করের দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি: কী ঘটতে পারে?
অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে যদি কর-বোঝা সহনীয় না হয়, তাহলে এর পরিণতি হবে বিপজ্জনক:
১)দরিদ্র আরো দরিদ্র: যে পরিবার কোনোরকমে বছরে ৫-৬ লক্ষ টাকা উপার্জন করছেন, বাড়তি কর তাদের সঞ্চয়ের শেষ সম্বলটুকুও নিয়ে নেবে। সম্পদ বিক্রি, ঋণ গ্রহণ এবং দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দেওয়া হবে।
২)ব্যবসা পালিয়ে যাবে: বড় উদ্যোক্তারা ও বিনিয়োগকারীরা কম করের গন্তব্যের দিকে মনোযোগ দেবেন — সিঙ্গাপুর, দুবাই বা মরিশাস। দেশে পুঁজির নিষ্প্রবাহ (Capital Flight) বাড়বে।
৩)অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বাড়বে: কর ফাঁকি এবং কালো বাজারের প্রসার হবে। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই কর এড়ানোর পথ খুঁজবে — এতে সরকারের রাজস্ব বাড়বে না, বরং কমবে।
৪)মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিলুপ্তি: মধ্যবিত্ত একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এই শ্রেণিটিকে ধারাবাহিকভাবে চাপে রাখলে, তারা নিম্নবিত্তে পরিণত হবে এবং ভোক্তা চাহিদা শূন্যের কোঠায় নামবে।
৫)উদ্যোক্তা মনোভাব ধ্বংস: নতুন উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে নিরুৎসাহিত হবেন। স্টার্টআপ বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের মতো উদ্যোগগুলো মার খাবে।
ন্যায্য কর নীতির দাবি কী হওয়া উচিত ছিল?
আমি মনে করি, কর নীতিকে এই মুহূর্তে অর্থনীতির "চাপমোচনকারী" হতে হবে, "চাপ সৃষ্টিকারী" নয়। নিচে কিছু যৌক্তিক দাবি উপস্থাপন করছি:
ক) মুদ্রাস্ফীতি-সংযুক্ত করমুক্ত সীমা: প্রতি বছর করমুক্ত সীমা কমপক্ষে মুদ্রাস্ফীতির হারে বাড়ানো বাধ্যতামূলক করতে হবে। এই কর বছর (২০২৬-২০২৭) ন্যূনতম সীমা হওয়া উচিত ছিল ৪১০,০০০ টাকা (৩,৭৫,০০০ × ১.০৯+)।
খ) ৫% স্তর পুনরুদ্ধার: নিম্নমধ্যবিত্তের জন্য ৫% কর স্তর অবিলম্বে ফিরিয়ে আনতে হবে। এই স্তরটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতীক ছিল।
গ) SME ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ে বিশেষ ছাড়: ৫ বছরের কম বয়সী উদ্যোগ এবং বার্ষিক টার্নওভার ৫০ লক্ষের নিচে এমন ব্যবসায়ে বিশেষ কর ছাড় হওয়া উচিত ।
ঘ) ডিজিটাল ফ্রিল্যান্সারদের সুরক্ষা: তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আয়করের বিশেষ ছাড় এবং সরলীকৃত পদ্ধতি চালু রাখতে হবে।
ঙ) কর আদায়ে সুশাসন: নতুন কর আরোপের আগে বিদ্যমান কর ফাঁকি বন্ধ করতে হবে। কর জাল বিস্তৃত করুন, কিন্তু ইতোমধ্যে করজালে আটকা করদাতাদের শ্বাসরোধ করবেন না।
করবর্ষ ২০২৬-২৭ এর কর কাঠামো কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে —নতুন করদাতাদের জন্য নূন্যতম কর কমেছে। কিন্তু এই পরিবর্তনগুলো মুদ্রাস্ফীতি এবং বাস্তব অর্থনৈতিক সংকটের তুলনায় অপ্রতুল। ৫% কর স্তর বাতিল করা হয়েছে, যা মধ্যবিত্ত শ্রেণির উপর সরাসরি আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। মুদ্রাস্ফীতি-সমন্বিত করমুক্ত সীমা না থাকায় "লুকানো কর" এর ভার মানুষকে নীরবে বহন করতে হচ্ছে। কর্মসংস্থান সংকট, ব্যবসায়িক মন্দা এবং পুঁজিবাজার বিপর্যয়ের সময় উচ্চ করের বোঝা একটি ভঙ্গুর অর্থনীতিকে আরো দুর্বল করে দিতে পারে।
পরিশেষে, কর নীতিকে মানুষের জীবনের বাস্তবতার সাথে মেলাতে হবে। একটি ন্যায্য, স্বচ্ছ এবং মুদ্রাস্ফীতি-সংবেদনশীল কর কাঠামোর দাবিতে নীতিনির্ধারকদের আহ্বান জানাচ্ছি ।