16/08/2020
▌বিপদ বা কঠিন অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ছোট কিন্তু অত্যন্ত কার্যকরী কয়েকটি দুয়া:
_______________________________________
(১) যেকোন প্রয়োজনে দুয়া ইউনুসঃ
لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
উচ্চারণঃ লা ইলা-হা ইল্লা-আংতা সুবহা’-নাক, ইন্নি কুংতু মিনায-যোয়ালিমিন।
অর্থঃ “(হে আল্লাহ) তুমি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নাই, তুমি পবিত্র ও মহান! নিশ্চয় আমি জালেমদের অন্তর্ভুক্ত।” সুরা আল-আম্বিয়াঃ ৮৭।
দুয়া ইউনুসের ফযীলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যেকোনো প্রয়োজনে কোনো মুসলিম ব্যক্তি যদি দুয়া ইউনুস পড়ে, তাহলে আল্লাহ তার দুয়া কবুল করবেন।” তিরমিযী, শায়খ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, সহীহুল জামিঃ ৩৩৮৩।
অন্য হাদীস অনুযায়ী, “দুয়া ইউনুস পড়লে আল্লাহ তার দুঃশ্চিন্তা দূর করে দেবেন।”
(২) অধিক পরিমাণে দুয়া করা, এমনকি নিজের সম্পূর্ণ দুয়া শুধুমাত্র রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি দুরুদ পড়ার জন্য নির্ধারিত করার ফযীলতঃ
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আরজ করল, “হে আল্লাহর রাসুল! আমি নিজের জন্য দুয়া করার পরিবর্তে শুধু আপনার উপর দুরুদ পাঠ করতে চাই, এ ব্যাপারে আপনার কী অভিমত?” রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেন, “তাহলে তো দুনিয়া ও আখিরাতে তোমার চিন্তাসমূহের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট হবেন।” আল-মুসনাদঃ ৫/১৩৬, হাফেজ মুনযিরী এই হাদীসের সনদকে জাইয়িদ বলেছেন। আত-তারগীব ওয়াত-তারহীবঃ ২/৫০১।
ইমাম তায়বী রাহি’মাহুল্লাহ এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “এর অর্থ হলো দুনিয়া ও আখিরাতের যে বিষয় তোমার চিন্তার কারণ হতে পারে, আল্লাহ তাআ’লা তোমার জন্য সে ক্ষেত্রে যথেষ্ট হবেন। দুরুদ পড়ার এতো বেশি ফযীলতের কারণ হলো, রাসুলুল্লাহর উপর দরুদ পড়াতে আল্লাহর যিকির রয়েছে এবং রাসুলের সম্মান মর্যাদা এবং তাঁর অধিকার আদায় করার উদ্দেশ্যে স্বীয় স্বার্থ উপেক্ষা এবং নিজের জন্য দুয়ার পরিবর্তে তাঁর জন্য দুয়াকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়।” শারহু আত-তায়বীঃ ৩/১০৪৬।
সুতরাং, যেকোন বিপদ-আপদ, দুঃশ্চিন্তা কিংবা হতাশা থেকে মুক্তির জন্য অধিক পরিমাণে দুরুদ পড়া উচিত। এমনকি এই হাদীসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে আল্লাহ তাআ’লার পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, কোন ব্যক্তি যদি তার নিজের জন্য মুনাজাতের সবটুকু অংশ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য দুরুদ পড়ার অভ্যাসে পরিণত করে, তাহলে তার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করা হবে এবং দুনিয়া ও আখেরাতের সমস্ত চিন্তা বা পেরেশানির জন্য যথেষ্ঠ হবে।
(৩) ‘তাওয়াক্কুল’ বা আল্লাহর উপর ভরসা করলে আল্লাহ তাআ’লা মুমিনদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেনঃ
আল্লাহ তাআ’লা এরশাদ করেছেন, “তোমরা যদি (সত্যিকার অর্থে) ঈমানদার হয়ে থাকো, তাহলে শুধুমাত্র আল্লাহর উপরে ভরসা করো।” সুরা আল-মায়ি’দাঃ ২৩।
আল্লাহ তাআ’লা আরো বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহ তাআ’লা-ই যথেষ্ট (হয়ে যান)।” সুরা ত্বালাক্বঃ ৩।
মানব জাতির জন্য আদর্শ, আমাদের নবী-রাসুলেরা (আল্লাহ তাঁদের সকলের প্রতি শান্তি অবতীর্ণ করুন), তাঁরা আমাদেরকে বিপদের সময় শুধুমাত্র আল্লাহর উপরে ভরসা করার অনুপম শিক্ষা দিয়ে গেছেন।
আমাদের জাতির পিতা ইব্রাহীম আ’লাইহিস সালামকে যখন কাফির বাদশাহ নমরুদ বিশাল বড় অগ্নিকুন্ড জ্বালিয়ে তাতে নিক্ষেপের আদেশ দিয়েছিলো, তখন ইব্রাহীম আ’লাইহিস সালাম সাহায্যের জন্য একমাত্র আল্লাহর মুখাপেক্ষী হন এবং এই কথা বলে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেনঃ
«حَسْبُنا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ».
উচ্চারণঃ হা’সবুনাল্লা-হু ওয়া নি’মাল ওয়াকীল।
অর্থঃ আল্লাহ-ই আমাদের জন্য যথেষ্ট, আর তিনি কতই না উত্তম ওয়াকীল (কর্মবিধায়ক)।
ইব্রাহীম আ’লাইহিস সালামের একমাত্র আল্লাহ তাআ’লার উপর ভরসা করার ঘটনার দ্বারা আল্লাহ তাআ’লা অত্যন্ত খুশি হন, এবং তিনি সেই বিশাল অগ্নিকুন্ডকে আদেশ করেন, “হে আগুন! তুমি ইব্রাহীমের জন্য শীতল ও আরামদায়ক হয়ে যাও।”
অনুরূপভাবে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীরা যখন ওহুদের ময়দানে কাফিরদের আক্রমনে কোনঠাসা হয়ে পড়ছিলেন, তখন কাফির ও মুনাফিকরা তাঁদেরকে এই বলে ভয় দেখাচ্ছিলো যে, “লোকেরা আপনাদের বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী বাহিনী জড়ো করেছে। অতএব তাদেরকে ভয় করুন। তখন তাঁদের ঈমান আরো বৃদ্ধি গেলো।” সুরা আলে-ইমরানঃ ১৭৩।
মুনাফিকদের এই হুশিয়ারী শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীদের ঈমান আরো বেড়ে যায় এবং নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেনঃ
«حَسْبُنا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ».
উচ্চারণঃ হা’সবুনাল্লা-হু ওয়া নি’মাল ওয়াকীল।
অর্থঃ আল্লাহ-ই আমাদের জন্য যথেষ্ট, আর তিনি কতই না উত্তম ওয়াকীল (কর্মবিধায়ক)।
ফলে, আল্লাহ তাআ’লা নবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে কাফিরদের বিরুদ্ধে সাহায্য করেন।
শায়খুল ইসলাম মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওহহাব রাহি’মাহুল্লাহ এই অধ্যায়ের শিক্ষাগুলো নিয়ে আলোচনাতে বলেন, “আল্লাহর উপর ভরসা ফরজ, আল্লাহর উপর ভরসা করা ঈমানের শর্ত। ইবরাহীম আ’লাইহিস সালাম ও মুহা’ম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সালামের জীবনী থেকে বিপদের সময় “হা’সবুনাল্লা-হু ওয়া নি’মাল ওয়াকীল” বলার কারণে এই দুয়ার গুরুত্ব ও মর্যাদা প্রমানিত হয়।”
উৎসঃ কিতাবুত তাওহীদ, ৩৩-তম অধ্যায়ঃ- “তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর উপর ভরসা”, সহীহ বুখারী ৫/১৭২, হাদীস নং ৪৫৬৩।
আল্লামাহ সালিহ আল-ফাউজান হা’ফিজাহুল্লাহকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, “হা’সবুনাল্লা-হু ওয়া নি’মাল ওয়াকীল – এই দুয়া কি কঠিন সময়ে পড়ার জন্য নির্ধারিত?”
উত্তর শায়খ ফাউজান বলেন, “এই দুয়াটা আল্লাহর দুইজন খলিল (নৈকট্যশীল বন্ধু) ইব্রাহীম আ’লাইহিস সালাম ও মুহা’ম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামের (জীবনীর) সাথে জড়িত। যদি কোন ব্যক্তি কঠিন অবস্থার সময় দৃঢ় বিশ্বাস ও আন্তরিকতার সাথে এই দুয়া পড়ে (আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে), তাহলে আল্লাহ তাকে কঠিন অবস্থা থেকে মুক্তি দেবেন এবং তাকে তার কাজে সাহায্য করবেন।” শায়খের “কিতাব আত-তাওহীদ” এর ব্যাখ্যা লেকচার থেকে সংগৃহীত।
(৪) যেকোন বিপদ-আপদ, দুঃখ-কষ্ট বা কঠিন সময়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এই দুয়া পড়তেনঃ
«اللَّهُ اللَّهُ رَبِّي لاَ أُشْرِكُ بِهِ شَيْئاً».
উচ্চারণঃ আল্লাহু আল্লাহু, রাব্বী, লা উশরিকু বিহী শাই’আ।
অর্থঃ আল্লাহ! আল্লাহ! (তিনি) আমার রব্ব! আমি তাঁর সাথে কোনো কিছু শরীক করি না।
আবু দাউদঃ ১৫২৫, ইবন মাজাহঃ ৩৮৮২, সহীহ, সহীহ ইবন মাজাহঃ ২/৩৩৫।
এই দুয়ার ফযীলত সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কোন ব্যক্তি যদি দুঃখ-কষ্ট, নিরাশা, অসুস্থতা বা কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হয়ে এই দুয়া পড়েঃ
“আল্লাহু রাব্বি, লা- শরীকা-লাহ” (আল্লাহ আমার পালনকর্তা, তাঁর কোন অংশীদার নেই)
তখন তার থেকে সেটা দূর করে দেওয়া হবে।” সহীহ আল জামিঃ ৬০৪০।
(৫) শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উষাইমিন রাহি’মাহুল্লাহ বলেছেন, “যখন কোন বিষয় তোমার জন্য কঠিন বা ভারী মনে হয় তখন বলোঃ “লা হা’উলা ওয়ালা ক্বুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ”, তাহলে আল্লাহ তোমার কাজ সহজ করে দিবেন।” শারহ রিয়াদুস সলিহীনঃ ৫/২২৫।
________________________________________
সংগৃহীত: তোমরা তোমাদের পালনকর্তার অভিমূখী হও এবং তাঁর আজ্ঞাবহ হও।
____________________
#জান্নাহ্