13/09/2026
কয়েকদিন ধরে অনেক ছোটবেলার একটা ঘটনা বারবার মনে পড়ছে।ঘটনাটা প্রায় ষোলো সতেরো বছর আগের।এত বছর পরেও যখন মনে পড়ে,আমি অবাক হয়ে ভাবি,ছোটবেলার কিছু কষ্ট আসলে আমরা বড় হয়ে যাই বলে ছোট হয়ে যায় না।
আমার জীবনের প্রথম বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল আমার কাজিনরা।আমরা তিন চারজন কাছাকাছি বয়সী ছিলাম।এক দুই বছরের এদিক ওদিক। Mথাকতাম দুই শহরে,তাই এখনকার মতো প্রতিদিন কথা বলার সুযোগ ছিল না।তখন মোবাইল ফোনও এত সহজলভ্য ছিল না।এক দুই মাস কিংবা তিন মাস পর দেখা হতো,বিভিন্ন উৎসবে একসাথে হতাম,মাঝে মাঝে বাসার টেলিফোনে কথা হতো।কিন্তু ওই অল্প দেখার মধ্যেই আমাদের পৃথিবীটা ছিল খুব সুন্দর। আমরা একজন আরেকজনকে সব বলতাম।আমি অন্তত ওদের অসম্ভব ভালোবাসতাম এবং আমার বিশ্বাস ছিল,ওরাও আমাকে ঠিক ততটাই ভালোবাসে।
একবার ওদের দুজন আমার সাথে সেই বয়সের খুব সাধারণ একটা গোপন কথা শেয়ার করেছিল।স্কুল, কোচিং বা সমবয়সী কাউকে ভালো লাগা, ওই বয়সে যেমন হয়।ওরা আমাকে বিশ্বাস করে বলেছিল এবং কথাটা আমার কাছেই ছিল।আমাদের আরেকজন কাজিন ছিলেন,যিনি আমাদের থেকে ছয় সাত বছরের বড়।কোনো একদিন কথায় কথায়,খুব কৌশলে,কথা দিয়ে কথা নিয়ে আমার কাছ থেকে তিনি পুরো বিষয়টা জেনে নিলেন।আমি তখন খুবই সহজ সরল ছিলাম।মানুষ কথা বের করার জন্যও কথা দেয়,একটা ছোট বাচ্চার মাথায় সম্ভবত সেই হিসাব থাকে না।
তারপর ঠিক কী হয়েছিল আমি আজও শতভাগ জানি না।কিন্তু ওই ঘটনার পর আমার সেই দুই কাজিনের সাথে সম্পর্কটা বদলে গেল।যে বন্ধুত্বের মধ্যে এত বিশ্বাস ছিল,সেখানে একটা দূরত্ব চলে এলো।অনেক বড় হওয়ার পরে ঘটনাগুলো মিলিয়ে আমার মনে হয়েছে,সম্ভবত আমার বলা কথাটা এমনভাবে তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছেছিল যে ওরা ভেবেছিল আমি ওদের বিশ্বাস ভেঙে গোপন কথাটা বলে দিয়েছি।আমাদের পরিবারগুলো তখন এসব ব্যাপারে খুবই রক্ষণশীল ছিল।তাই ওদের হয়তো বকাও খেতে হয়েছিল।কিন্তু ওরা কোনোদিন এসে আমাকে জিজ্ঞেস করেনি, “তুই কেন বললি?”আমিও বুঝতে পারিনি কেন ওরা দূরে চলে যাচ্ছে। যদি সেদিন ওরা আমাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করত,হয়তো ঝগড়া হতো,কান্নাকাটি হতো,আমি আমার কথাটা বলতাম, তারপর হয়তো আবার মিটেও যেতাম।কিন্তু সেটা আর হয়নি।
এই জায়গাটাই আজও আমার কষ্ট লাগে।কারণ ওই বয়সে ওরা শুধু আমার কাজিন ছিল না।ওরাই ছিল আমার বন্ধু,আমার আনন্দ,আমার ছোট্ট পৃথিবীর খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ।আমরা বাইরে খুব বেশি মেশার সুযোগ পেতাম না, তাই ওই সম্পর্কগুলো আমার কাছে আরও বেশি মূল্যবান ছিল। একটা বড় মানুষের কয়েক মিনিটের কৌশলের ফল একটা ছোট মানুষের জীবনে কত বছর থেকে যেতে পারে, সম্ভবত সেই মানুষটাও কোনোদিন বুঝতে পারেনি।
আজ এত বছর পরে সেই মানুষটার প্রতিও আমার কোনো অমঙ্গল কামনা নেই। বরং তার জীবনে অনেক কষ্ট এসেছে দেখে আমার খারাপই লাগে। আমি চাই আল্লাহ তার জীবনটাও সুন্দর করে দিন। আমি এটাও বলব না যে তার জীবনের আজকের কোনো কষ্ট ওই ঘটনার শাস্তি। আল্লাহর হিসাব নিয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। কিন্তু এই ঘটনাটা আমাকে জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস শিখিয়েছে। কারো অসহায়ত্বকে ব্যবহার করে অন্যায় করলে, সে মানুষটা আপনার বিরুদ্ধে কিছু করতে পারল না বলেই বিষয়টা শেষ হয়ে যায় না। বিশেষ করে একটা ছোট বাচ্চা, যে নিজের সাথে কী হয়েছে সেটাই ঠিকমতো বুঝতে পারে না, নিজের হয়ে কথা বলতেও পারে না। তার কষ্টটাও আল্লাহ দেখেন।
এই কারণেই আজ ঘটনাটা শেয়ার করা। ঘটনাটা কে ঘটিয়েছিল, কে কী করেছিল, সেটা আসলে আমার লেখার মূল বিষয় না। আমার মূল কথাটা হচ্ছে, মানুষের সাথে এমন কোনো কাজ করবেন না যার ফল সে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে পারে। বিশেষ করে ছোটদের সাথে কখনো কৌশল করবেন না। তাদের বিশ্বাস, বন্ধুত্ব, ভালোবাসা, গোপন কথা এগুলোকে ছোট মনে করবেন না। আপনার কাছে যেটা খুব সামান্য একটা দুষ্টুমি, একটু মজা, একটু কথা বের করে নেওয়া কিংবা তুচ্ছ একটা ঘটনা, একটা বাচ্চার কাছে সেটাই তার পুরো পৃথিবী হতে পারে।
আর একটা কথা আমি নিজের জীবন থেকে খুব গভীরভাবে বিশ্বাস করতে শিখেছি, মানুষের মনে কষ্ট দিয়ে, কারো বিশ্বাস ভেঙে, কারো সুন্দর একটা সম্পর্ক নষ্ট করে শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনেও শান্তি পাওয়া কঠিন। কে কখন কীভাবে তার কর্মের ফল পাবে, সেটা আমরা জানি না এবং কারো বিপদ দেখেই তাকে আল্লাহর শাস্তি বলার অধিকারও আমাদের নেই। কিন্তু আল্লাহর কাছে কোনো অন্যায়, কোনো চোখের পানি, কোনো ভাঙা মন অদেখা থাকে না। যে বাচ্চাটা আপনার বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারেনি, যে মানুষটা প্রতিবাদ করতে পারেনি, যে শুধু চুপ করে কেঁদেছে, তারও একজন রব আছেন। এই কথাটা মনে থাকলে হয়তো আমরা অন্য মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার আগে অন্তত একবার ভাবব।
আমরা বড়রা অনেক সময় ভাবি, “ও তো ছোট, কয়দিন পর ভুলে যাবে।” কিন্তু সব বাচ্চা সবকিছু ভুলে যায় না। কোন কথায় তার একটা সুন্দর সম্পর্ক নষ্ট হয়ে গেল, কোন আচরণে সে প্রথমবার বিশ্বাস করতে ভয় পেল, কোন ঘটনায় তার খুব প্রিয় একজন মানুষ দূরে চলে গেল, আপনি হয়তো ভুলেই যাবেন। কিন্তু সেই ছোট মানুষটা বড় হতে হতে ঘটনাটাও তার সাথে বড় হয়ে যেতে পারে।
তাই ছোটদের সাথে খুব সাবধানে ব্যবহার করবেন। তাদের সরলতাকে কখনো নিজের বুদ্ধি দেখানোর জায়গা বানাবেন না। আর শুধু ছোটদের না, কোনো অসহায় মানুষের সাথেই এমন কিছু করবেন না এই ভেবে যে সে তো আমার কিছু করতে পারবে না।
কারণ মানুষটা হয়তো আপনার কিছু করতে পারবে না। কিন্তু তার কষ্টটা কোথাও হারিয়ে যায় না। আল্লাহ দেখেন।
এই উপলব্ধিটাই আসলে এত বছর পর ঘটনাটা মনে পড়লে আমার সবচেয়ে বেশি হয়। মানুষকে কষ্ট দিয়ে জিতে যাওয়াটা কোনো জয় না। বরং এমনভাবে জীবন কাটানো দরকার, যেন আমাদের কোনো পুরোনো কাজের কথা মনে করে বহু বছর পরেও কারো বুকটা ব্যথা না করে। 🤍